আন্তর্জাতিক

ইসলামাবাদে আলোচনার মঞ্চ প্রস্তুত

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিতীয় দফা আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে পাকিস্তান। ধারণা করা হচ্ছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বুধবার শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এই আলোচনা শুরু হবে।

মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত না করায় ‘ইসলামাবাদ রাউন্ড ২’ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি মার্কিন প্রতিনিধি দল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

ভ্যান্সের অবস্থান নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা ছিল। গতকাল সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউইয়র্ক পোস্টকে জানান যে, ভ্যান্স ইতিমধ্যে ইসলামাবাদের পথে রয়েছেন। তবে হোয়াইট হাউজ কর্মকর্তাদের মতে, ভাইস প্রেসিডেন্ট মঙ্গলবার রওনা দেবেন এবং বুধবার আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মার্কিন প্রতিনিধি দলের আগমনের বিষয়টি নিশ্চিত হলেও ইরান তাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে এখনো রহস্য বজায় রেখেছে। তবে ইসলামাবাদের বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। এমনকি ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তেহরানের অংশগ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানানোর কয়েক ঘণ্টা পরেও, মার্কিন সামরিক বিমানকে নূর খান বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করতে দেখা গেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আনুষ্ঠানিক অবস্থানের বাইরে পর্দার আড়ালে প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে।

ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে না চলার অভিযোগ করেছে এবং আলোচনার টেবিলে বসার আগে ওয়াশিংটনকে ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, “প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাই হলো অর্থপূর্ণ সংলাপের ভিত্তি। মার্কিন সরকারের আচরণের প্রতি ইরানিদের গভীর ঐতিহাসিক অবিশ্বাস রয়ে গেছে। মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন একটি বার্তাই দিচ্ছে যে, তারা ইরানের আত্মসমর্পণ চায়। কিন্তু ইরানিরা শক্তির কাছে মাথা নত করবে না।”

এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে নীরব থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন যে, আলোচনার আগে উভয় পক্ষের ‘ভঙ্গিমা’ থেকেই এই অনিশ্চয়তার বেশিরভাগটা তৈরি হয়েছে। এক্সপ্রেস ট্রিবিউনকে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গোপন যোগাযোগ সক্রিয় রয়েছে।

একটি ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইরানের ওপর নৌ অবরোধ কূটনৈতিক অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে।

তবে, ট্রাম্প এই অবরোধ অব্যাহত রাখার ব্যাপারে জোর দিচ্ছেন। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, “এই অবরোধ, যা আমরা কোনো ‘চুক্তি’ না হওয়া পর্যন্ত তুলব না, ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। তারা দিনে ৫০০ মিলিয়ন ডলার হারাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তো দূরে থাক, স্বল্প মেয়াদেও বহন করা অসম্ভব।”

তিনি একটি পৃথক পোস্টে লেখেন, “ইরানের নেতৃত্ব তাদের সরবরাহের জন্য শত শত জাহাজ টেক্সাস, লুইজিয়ানা এবং আলাস্কার মতো মার্কিন অঞ্চলগুলোর দিকে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে।”

ট্রাম্প মার্কিন বাহিনীর প্রশংসা করে বলেন, “আমাদের সামরিক বাহিনী অসাধারণ কাজ করেছে।” একইসঙ্গে তিনি দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলোর সমালোচনা করে বলেন, তারা এমনভাবে খবর প্রচার করছে যেন যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাচ্ছে।

তিনি দাবি করেন, প্রতিপক্ষ ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং তাদের সাবেক নেতাদের অধিকাংশই এখন নেই। তিনি এই পরিস্থিতিকে ইরানের ‘শাসন পরিবর্তন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি আরো বলেন, “ভুয়া সংবাদমাধ্যমগুলো চায় ইরান জিতুক, কিন্তু এই ধরনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে কারণ আমিই দায়িত্বে আছি!”

ইসলামাবাদের কর্মকর্তারা এক্সপ্রেস ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখনও পরিবর্তনশীল। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ত্যাগ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় দফার এই আলোচনা বুধবার হওয়ার কথা থাকলেও হোয়াইট হাউজ এখনও নির্দিষ্ট সময় নিশ্চিত করেনি।

এদিকে, ‍নিরাপত্তা ব্যবস্থা চূড়ান্ত করতে ইরানি ও মার্কিন প্রতিনিধিরা পৃথকভাবে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভী এবং ইসলামাবাদ পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

ইসলামাবাদের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আলোচনার প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং আনুষ্ঠানিক আলোচনার আগেই মার্কিন অগ্রবর্তী দলগুলো আসতে শুরু করেছে। রবিবার থেকে সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত কর্মী, যানবাহন এবং সরঞ্জাম নিয়ে ১১টি মার্কিন বিমান পাকিস্তানে অবতরণ করেছে।

সূত্রের বরাতে এক্সপ্রেস ট্রিবিউন আরো জানিয়েছে, অগ্রবর্তী দলগুলোর আগমন মূলত সম্পন্ন হয়েছে এবং মূল প্রতিনিধিদলগুলো মঙ্গলবার নাগাদ পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সূত্রমতে, ইরানি প্রতিনিধিদলগুলোও মঙ্গলবার রাতের মধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছাতে পারে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডিতে পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রায় ১৮ হাজার কর্মী মোতায়েন করেছে পাকিস্তান। ৭ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি আগামীকাল বুধবার (২১ এপ্রিল) শেষ হতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধান আসে নাকি নতুন কোনো সংঘাতের সূচনা হয়, সেদিকে নজর পুরো বিশ্বের।