আন্তর্জাতিক

হরমুজ প্রণালিতে বিশৃঙ্খলার দায় যুক্তরাষ্ট্রের: ইরান

ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ও এর আশেপাশের জলসীমায় জাহাজ চলাচলে যেকোনো ধরনের ‍বিঘ্ন বা বাধার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দায়ী। তাদের বেপরোয়া ও অবৈধ কর্মকাণ্ড এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথটিকে উত্তেজনা এবং বিপদের কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, সোমবার (২৭) সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বিষয়ক জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় ইরানের রাষ্ট্রদূত এবং স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানি সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকির জন্য ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের অভিযুক্ত করেন।

ইরাভানি বলেন, “পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক পরিবহনে যেকোনো বাধা, বিঘ্ন বা হস্তক্ষেপের দায় সরাসরি আগ্রাসীদের, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও তার সমর্থকদের ওপর বর্তায়। তাদের অবৈধ ও অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ড উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে এবং নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করেছে।”

ইরানি দূত জোর দিয়ে বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সব সময় পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি এবং ওমান সাগরে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা বজায় রেখেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ইরান কয়েক দশক ধরে উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তার কর্তব্য পালন করে আসছে এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নির্বিঘ্ন প্রবাহ নিশ্চিত করেছে।

ইরাভানি উল্লেখ করেন, বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ব্যাপক এবং অযৌক্তিক আগ্রাসন। তিনি বলেন, “২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে একটি অন্যায্য এবং বড় আকারের আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করেছে।”

তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের (বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ২(৪)) চরম লঙ্ঘন, যা সরাসরি সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে খর্ব করছে এবং আঞ্চলিক ও বিশ্বশান্তিকে হুমকির মুখে ফেলছে।

ইরাভানি আরো জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজ অবৈধভাবে জব্দ এবং ক্রুদের আটকে রাখার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ অব্যাহত রেখেছে। তিনি একে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তার মতে, এসব কর্মকাণ্ড জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন, যা ১৯৭৪ সালের সাধারণ পরিষদের রেজোলিউশন ৩৩১৪-এর অনুচ্ছেদ ৩(গ) অনুযায়ী ‘আগ্রাসন’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত।

ইরান এই অবৈধ পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং নিরাপত্তা পরিষদকে আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি জব্দকৃত জাহাজ ও ক্রুদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়েছে।

ইরাভানি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে ইরান আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যাতে এই জলপথটি কোনো প্রতিকূল সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত না হয়।

তিনি উল্লেখ করেন, ইরান ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশন-এর পক্ষভুক্ত নয়। তাই ইরান এই চুক্তির বিধান দ্বারা বাধ্য নয়, তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রথাগত আইনগুলো ইরান মেনে চলে।

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “পারস্য উপসাগর এবং বিস্তৃত অঞ্চলে স্থায়ী স্থিতিশীলতা কেবল তখনই সম্ভব যখন ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে এবং ইরানের সার্বভৌম অধিকার ও স্বার্থের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করা হবে।”

ইরাভানি ইরানের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে নৌ-চলাচলের অধিকার রক্ষার কথা বলে, অন্যদিকে ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজে সন্ত্রাসী হামলা চালায়- যা তাদের দ্বিমুখী নীতিকেই প্রকাশ করে।

ইরানি দূতের মতে, তেহরানের ওপর দোষ চাপানোর যেকোনো প্রচেষ্টা ভিত্তিহীন ও অসার। পারস্য উপসাগর বা হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা, যাদের অস্থিতিশীল নীতি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে ফেলছে।