আন্তর্জাতিক

মার্কিন অবরোধে ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ইরানি মুদ্রার রেকর্ড পতন

যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ-অবরোধের প্রভাব মোকাবিলায় তেহরান নানা পদক্ষেপ নিলেও ইরানের জাতীয় মুদ্রা ‘রিয়াল’-এর মান সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে খোলা বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে বিয়ালের মান ১৮ লাখ ১০ হাজার (১.৮১ মিলিয়ন) ছাড়িয়ে যায়, যা ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। খবর আল-জাজিরার। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রিয়ালের মান অর্ধেকের বেশি কমেছে। গত বছর এই সময়ে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮ লাখ ১১ হাজার রিয়াল। চলতি সপ্তাহের শুরুতে এটি ১.৫৪ মিলিয়ন থাকলেও বুধবার তা রেকর্ড ভেঙে ১.৮১ মিলিয়নে পৌঁছায়। যদিও দিনের শেষভাগে তা সামান্য পুনরুদ্ধার হয়েছে।

ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন বাহিনী মোতায়েনের সময় মুদ্রার মানে বড় পতন ঘটেছিল। তবে গত দুই মাস রিয়ালের মান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল।

বর্তমান এই দরপতনের পেছনে রয়েছে লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি, যা অব্যবস্থাপনা ও নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতিকে দীর্ঘসময় ধরে জর্জরিত করছে। ওয়াশিংটন বর্তমানে এই অঞ্চলে তিনটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছে এবং আরো সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে আসছে। এদিকে, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার তিন সপ্তাহ পার হতে না হতেই ইসরায়েল পুনরায় যুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতি ঘোষণা করেছে।

ইরান সরকার এই সপ্তাহে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং দক্ষিণ জলসীমায় মার্কিন নৌ-অবরোধ মোকাবিলা করার ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, এই অবরোধের ফলে ইরানের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির মুখে ইরান সরকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য তাদের সীমান্ত প্রদেশগুলোকে ক্ষমতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া, খাদ্য কেনার জন্য সার্বভৌম সম্পদ তহবিল থেকে ১ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। দুর্নীতির উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও, দ্রব্যমূল্য কমানোর লক্ষ্যে ইরান সরকার একটি আংশিক নীতি পরিবর্তন করে পুনরায় ভর্তুকি মূল্যে ডলার সরবরাহ শুরু করেছে।

তেল-বহির্ভূত বাণিজ্যে আঘাত

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কাস্টমস তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বোমা হামলার ফলে ইরানের তেল-বহির্ভূত বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০ মার্চ শেষ হওয়া ইরানি ক্যালেন্ডার বছরে তেল-বহির্ভূত বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ কম।

যুদ্ধের কারণে বিশেষ করে শেষ মাসে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) বাণিজ্যের পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং বন্দর, নৌ-ঘাঁটি, বিমানবন্দর ও রেলপথ লক্ষ্য করে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এছাড়া ইরানের ইস্পাত, পেট্রোকেমিক্যাল এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতেও ব্যাপক বোমা হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েল হুমকি দিয়েছে যে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতে পদ্ধতিগত বোমা হামলার মাধ্যমে তারা ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।

পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বজায় রাখতে ইরানি কর্তৃপক্ষ ইস্পাত, পেট্রোকেমিক্যাল, পলিমার এবং অন্যান্য রাসায়নিক রপ্তানির ওপর সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

তেল রপ্তানি হুমকির ‍মুখে

যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক চাপ ব্যবহার করে ইরানের তেল রপ্তানি কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে, যা তারা গত কয়েক বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে করে আসছিল।

এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের নিকটবর্তী জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো পরিদর্শন বা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সৈন্য মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহনের জন্য ইরান যে ‘ছায়া ট্যাঙ্কার বহর’ ব্যবহার করে, সেগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

যুদ্ধজাহাজ এবং হাজার হাজার সৈন্য ব্যবহার করে খাগ আইল্যান্ডসহ ইরানের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপে স্থল আক্রমণ বা ধ্বংসাত্মক আকাশ হামলার আশঙ্কা এখনো কাটেনি। ট্রাম্প প্রশাসন আশা করছে, রপ্তানি রুটগুলো বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং সুপারট্যাঙ্কারগুলোতে তেল আটকে থাকায় ইরানের তেল খাতের ওপর চাপ আরো বাড়বে।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইতিমধ্যে চীনা শোধনাগারগুলোকে (যারা ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা) কালো তালিকাভুক্ত করছে। একই সাথে তেহরানের তেল বাণিজ্যে সহায়তাকারী ব্যাংক এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে- যাদের সাথে আইআরজিসির যোগসূত্র রয়েছে বলে ওয়াশিংটন দাবি করে।

মার্কিন ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, তারা ইরানের প্রতিটি আর্থিক লেনদেন এবং আর্থিক লাইফলাইনগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছেন।

ভর্তেক্সা অ্যানালিটিকসের তথ্য অনুযায়ী, চীনা শোধনাগারগুলো ইরানের তেল চালানের প্রায় ৯০ শতাংশ কিনে থাকে এবং মার্চ মাসে তারা দৈনিক রেকর্ড ১.৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করেছে। তবে রয়টার্স জানিয়েছে যে, অভ্যন্তরীণ পরিশোধন মার্জিন কমে যাওয়ায় এই কেনাকাটা ধীর হয়ে যেতে পারে।

চীনের কাস্টমস তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ইরানের সঙ্গে চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১.৫৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ কম। যুদ্ধের প্রথম মাস মার্চে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৮৪ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ এবং আগের মাসের চেয়ে ৬৪ শতাংশ কম।

এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের একটি বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ছিল। কিন্তু ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ড চুক্তির প্রভাবে আমিরাতের সরে যাওয়া ইরানের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর ফলে ইরান এখন তুরস্ক, ইরাক এবং পাকিস্তানের মতো স্থলপথের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

গত দুই মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের দেশ থেকে বহু ইরানি প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক লেনদেনকারী সংস্থা বন্ধ করে দিয়েছে এবং ইরানি নাগরিকদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। আমিরাত জানিয়েছে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে আরো অনেক বছর সময় লাগবে।