আন্তর্জাতিক

‘ভেতরে যাও, সে তোমাদের মেরে ফেলবে’

‘ভেতরে যাও, সে তোমাদের মেরে ফেলবে’

ইসরায়েলের রিজার্ভ বাহিনীর এক সেনা মুঘাইয়ির মাধ্যমিক বালক বিদ্যালয়ের পশ্চিম গেটের ঠিক বাইরে ১৪ বছর বয়সী আওস আল-নাসানকে মাথায় গুলি করে। সে ওই বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ত। আওস সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তার শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকে। আরো গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আওসের বন্ধুরা তার পাশে ছুটে গিয়ে তার নিথর দেহটি তুলে নিয়ে দ্রুত গুলির আওতার বাইরে নিয়ে যায়। স্কুলের দেয়াল ঘেঁষে তাদের চলার পথে সহপাঠীর রক্তের ধারা বয়ে যায়।

ভবনটির ভেতর থেকে পাওয়া ফুটেজে দেখা যায়, আতঙ্কিত ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা সিঁড়ির ফাঁকে উবু হয়ে বসে অন্যদের নিচে নেমে যেতে চিৎকার করছে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, আংশিক সামরিক পোশাকে থাকা রিজার্ভিস্ট হামলাকারী ওপরের পাহাড়ের ঢাল থেকে স্কুলটিকে লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে।

কয়েক মিনিট পর একই সেনা ইংরেজি শিক্ষক ওয়াহিদ আবু নাইমের ছোট ভাইকে হত্যা করে। ওয়াহিদ আবু নাইমের পরিবার স্কুলটির পাশেই বাস করত। জিহাদ আবু নাইমের বয়স ছিল ৩৬ বছর; তার স্ত্রী গর্ভবতী এবং চলতি মাসেই তাদের প্রথম সন্তান পৃথিবীতে আসার কথা।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধির মধ্যে ২১ এপ্রিল আওস ও আবু নাইমকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

রামাল্লার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ঢেউ খেলানো পাহাড়ের কোলে প্রায় তিন হাজার মানুষের গ্রাম মুঘাইয়ির বহু বছর ধরে আক্রমণের শিকার হয়ে আসছে। আওসের বাবা, হামদি আল-নাআসান ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এক আহত প্রতিবেশীকে উদ্ধারের চেষ্টা করার সময় এক বসতি স্থাপনকারীর গুলি পিঠে বিদ্ধ হলে তিনি নিহত হন। সেই সময় আওস মাত্র তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত এবং পরবর্তী বছরগুলোতে তার শিক্ষকরা এই ছোট ছেলেটির প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন। 

ওয়াহিদ আবু নাইম বলেন, “আমরা আওসকে নিরাপদ বোধ করানোর চেষ্টা করেছিলাম এবং তার জীবনে কিছু নিয়মকানুন নিশ্চিত করেছিলাম, যাতে সে তার বাবাকে হারানোর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকে। তারপর আমরা তাকে হারালাম।”

এই হত্যাকাণ্ডের পর মুঘাইয়িরে এক সপ্তাহের জন্য ক্লাস স্থগিত রাখা হয়েছিল। কারণ অভিভাবক ও শিক্ষকরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের আশা এবং তাদের জীবনের তাৎক্ষণিক ভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছিলেন। 

অধিকৃত ফিলিস্তিনজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থা ইসরায়েলি আক্রমণের শিকার। গাজায় পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুতর, যেখানে ছয় লাখেরও বেশি স্কুলগামী শিশু সশরীরে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তৃতীয় বছর শেষ করতে চলেছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, সেখানে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭৯২ জন শিক্ষক এবং ১৮ হাজার ৬৩৯ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে এবং প্রতি ১০টি স্কুল ভবনের মধ্যে ৯টিই ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

কিন্তু অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ক্রমবর্ধমান ইসরায়েলি সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে শিক্ষার্থী ও স্কুলগুলো। সেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার ক্ষেত্রে প্রায় সম্পূর্ণ দায়মুক্তির পরিবেশ বিরাজ করছে।

আওস তার স্কুলের বাইরে নিহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর, বসতি স্থাপনকারীরা ২৫ মাইল উত্তরে একটি গ্রামে ফিলিস্তিনি শিশুদের জন্য ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় অর্থায়নে নির্মিত একটি স্কুলে হামলা চালিয়ে তা ভেঙে দেয়। ফরাসি সরকার, যারা স্কুলটির জন্য কিছু অর্থায়ন করেছিল, এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য ইসরায়েলি সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।

চলতি  বসন্তে অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি প্রাণঘাতী হামলার বৃদ্ধি শিক্ষকদেরও তাদের ছাত্রদের জন্য নতুন হুমকির বিষয়ে সতর্ক করে তুলেছে।

তাই ২১ এপ্রিল দুপুরে যখন দুজন বসতি স্থাপনকারী এবং চারজন মুখোশধারী সেনাকে যখন স্কুলের দিকে হেঁটে আসতে দেখা গেল, তখন শিক্ষকেরা ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের চত্বরে জড়ো করলেন, প্রধান ফটকটি বন্ধ করে দিলেন এবং অভিভাবক ও প্রতিবেশীদের কাছে এই বার্তা পাঠালেন: সশস্ত্র ইসরায়েলিরা স্কুলের কাছে আছে, তারা যেন এসে তাদের সন্তানদের নিয়ে যান।

ওয়াহিদ আবু নাইম ইসরায়েলিদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করতে গেলেন এবং ইংরেজি ও আরবিতে তাদের জিজ্ঞাসা করলেন তারা কেন এসেছে। কেবল একজনই আরবিতে ‘ফিরে যাও’ বলে তার বন্দুক তুলে ধরে উত্তর দিল। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট। 

তিনি বলেন, “তখন আমি বুঝলাম তারা ঝামেলা করতে এসেছে, তাই আমি বাচ্চাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে স্কুলে ফিরে গেলাম।”

শিক্ষকরা যখন সেনাদের আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন বন্দুকধারী পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এমন একটি জায়গায় উঠে গেল যেখান থেকে স্কুলের পশ্চিম দিকটা পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছিল।

তখনও কয়েকজন ছাত্র রাস্তায় ছিল এবং রিজার্ভিস্ট সেনাটি যখন ছেলেদের দিকে তার অস্ত্র তাক করে রেখেছিল, আবু নাইম তাদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। 

“আমি তাদের চিৎকার করে বলছিলাম, ভেতরে যাও, সে তোমাদের মেরে ফেলবে।”

মুহূর্ত পরেই গুলির শব্দ শোনা গেল এবং আওস মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।