আন্তর্জাতিক

‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে’, প্রশ্ন হলো কীভাবে?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তার ৪৬ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে জয়লাভ করেছে, যাকে ২০১৪ সালে মোদির প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজয় হিসেবে ধরা যেতে পারে।

এপ্রিলের কয়েক তারিখে ধাপে ধাপে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, আসাম ও কেরালা রাজ্যে এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সোমবার (৫ মে) গণনা ও ফলাফল ঘোষণা করা হয়।

বিজেপি টানা তৃতীয় মেয়াদের জন্য আসামে ক্ষমতা ধরে রেখেছে। জোট করে পুদুচেরিতে আবার ক্ষমতায় ফিরেছে দলটি। দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ুতে আবার একজন চলচ্চিত্র তারকার উত্থান দেখা গেছে, যা ওই রাজ্যের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ; যেখানে সিনেমার তারকারা গণনেতা হয়ে ওঠেন। অভিনেতা বিজয় থালাপাতি দীর্ঘদিনের দুই প্রধান রাজ্যভিত্তিক দলের আধিপত্য ভেঙে একটি নতুন রাজনৈতিক দল নিয়ে উঠে এসেছেন এবং নতুন মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথে রয়েছেন।

প্রতিবেশী কেরালায় একটি কমিউনিস্ট সরকার তার ঐতিহ্যবাহী প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে পরাজিত হয়েছে; যা রাজ্যের পরিচিত নির্বাচনি চক্রেরই অংশ এবং এর ফলে গত ৫০ বছরে প্রথমবারের মতো বামপন্থিরা ভারতের কোনো রাজ্যে আর ক্ষমতায় রইল না।

এই প্রতিটি নির্বাচনই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সোমবার (৪ মে) পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলই সবচেয়ে বড় বার্তা হিসেবে উঠে এসেছে।

যে ইতিহাস ভারতকে সংজ্ঞায়িত করেছে বঙ্গ সেই স্থান, যেখানে ১৮০০ শতকের মাঝামাঝি পলাশি যুদ্ধের পর ভারতের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সূচনা হয়, যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার নবাবকে পরাজিত করে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অস্ত্রধারী শক্তিতে পরিণত হয়।

প্রায় ১৫০ বছর পরে ১৯০৫ সালে ব্রিটিশরা বাংলাকে ভাগ করে; যা আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভাজনের প্রথম বড় উদাহরণ। প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলকে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমাঞ্চল থেকে আলাদা করে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন এমন একটি কাঠামো তৈরি করেন, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়কে ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা যায়।

যদিও ১৯১১ সালে এই বিভাজন বাতিল করা হয়, তবু এটি এই অঞ্চলে নতুন রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেয়; যা ঔপনিবেশিকবিরোধী আন্দোলনের সময় বিভিন্ন রূপ ধারণ করে এবং নানা ধরনের জাতীয় নেতার উত্থান ঘটায়। যাদের মধ্যে ছিলেন কয়েকজন হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদও। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি, বিজেপির পূর্বসূরি ‘ভারতীয় জনসংঘ’-এর প্রতিষ্ঠাতা।

শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি ১৯৫৩ সালে তার মৃত্যুর দুই বছর আগে জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন সাংস্কৃতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ অখণ্ড ভারতের পক্ষে কাজ করার লক্ষ্যে। তিনি ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর ভারত-শাসিত কাশ্মীরকে দেওয়া বিশেষ মর্যাদার বিরোধিতা করেছিলেন। মোদি ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে সেই বিতর্কিত অঞ্চলের আংশিক স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে মুখার্জির স্বপ্ন পূরণ করেন।

সোমবার রাতে দলের কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মোদি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের এই জয় তার (মুখার্জির) আত্মাকে শান্তি দেবে।

তবে ধর্মীয় বিভাজনের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পথচলা বেশ জটিল ছিল। ১৯৭৭ সালে এখানে একটি কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতায় আসে, যারা ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল। তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি); যার নেতৃত্বে রয়েছেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার তার পতনে সরকার গঠনের পথে এখন মোদির বিজেপি।

অবশ্য আধুনিক ভারতের সবচেয়ে অশান্ত বছরগুলোতেও এই পশ্চিমবঙ্গ তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল।

১৯৮৪ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে তার শিখ দেহরক্ষীরা হত্যা করার পর অনেক রাজ্যে শিখবিরোধী দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রায় ৩ হাজার শিখ নিহত হন। পশ্চিমবঙ্গ তখন শান্ত ছিল বলা যায়। আট বছর পর ১৯৯২ সালে উত্তর প্রদেশে মোদির দলের নেতৃত্বাধীন হিন্দু কট্টরপন্থিদের হাতে মুঘল আমলের বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার পর সারা দেশে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে, সেসময়েও এই রাজ্য নিরাপদ ছিল বলা যায়।

পশ্চিমবঙ্গকে দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত করে আসা এই সাম্প্রদায়িক স্বাতন্ত্র্যবোধ এবং আপেক্ষিক সম্প্রীতি কি বিজেপি সরকারের অধীনে বজায় থাকবে? নির্বাচনের ফলাফল থেকে উঠে আসা বড় প্রশ্নগুলোর এটি একটি।

‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে’, প্রশ্ন হলো কীভাবে? পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১০ কোটি মানুষের বাস, যার ২৭ শতাংশ মুসলিম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষ এবং মুসলিমবিরোধী বক্তব্যকে সমন্বিতভাবে ভরকেন্দ্র বানিয়ে বিজেপি চমকপ্রদভাবে ২০৭টি আসন জিতেছে। ২৯৪ সদস্যের বিধানসভায় টিএমসিকে নামিয়ে এনেছে ৮০ জন বিধায়কে। যে বিজেপি এক দশক আগেও মাত্র তিনটি আসন পেয়েছিল, তাদের জন্য এটি এক উল্লেখযোগ্য উত্থান।

“পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে!”—সোমবার বিকেলে বিজেপির নির্বাচনি প্রতীক পদ্মের নাম ধরে এক্স-এ পোস্টটি করেন মোদি। অবশ্য তখনো ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) কর্মকর্তারা ভোট গণনা করছিলেন। তিনি এটিকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ বলেন তুলে ধরেন এবং লেখেন এটি ‘অম্লান থাকবে’। রাজ্যে ‘সুশাসনের রাজনীতি’র প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

ইসিআই ভারত সরকারের নিযুক্ত করা আমলাদের মাধ্যমে পরিচালিত একটি স্বশাসিত সাংবিধানিক সংস্থা। ২০১৪ সাল থেকে তীব্র নজরদারি ও সমালোচনার মুখে রয়েছে এই কমিশন। বিরোধী দল ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা এই কমিশনের বিরুদ্ধে ভোট চুরি, জালিয়াতি, কারচুপি করা এবং সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে প্রায় ২৭ লাখ মানুষকে পশ্চিমবঙ্গে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ এনেছে।

ইসিআই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে কলকাতাভিত্তিক স্বাধীন গবেষণা সংস্থা সাবার ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঘটনায় মুসলিমরা অসমভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে সেই জেলাগুলোতে যেখানে মুসলিম জনসংখ্যার হার বেশি এবং তারা নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করতে পারত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদবের মতে, ২৭ লাখ ভোটার বাদ পড়া পশ্চিমবঙ্গে মোট প্রদত্ত ভোটের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ে বিজেপি যেখানে মাত্র ৫ শতাংশের মতো ভোটে এগিয়ে রয়েছে।

সোমবার জয়ের বার্তায় আবির খেলায় মেতে ওঠেন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। ছবি: আলজাজিরা।

 “প্রশ্নটি এড়ানো যায় না: যদি এই ২৭ লাখ মানুষকে ভোট দিতে দেওয়া হতো, তাহলে ফলাফলে কী প্রভাব পড়ত?”- মঙ্গলবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় এক কলামে যোগেন্দ্র যাদব এই কথা লিখে বিরোধীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন ‌‌‘নির্বাচনের বেঁধে দেওয়া ফলাফলকে’ বৈধতা না দেয়, যা কি না নির্বাচনি প্রক্রিয়ার সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

খুবই আশ্চর্যজনক হলেও মমতা তার নিজের আসনে হেরেছেন। তবে মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন ডেকে তিনি অভিযোগ করেনছেন, বিজেপি ‘১০০টির বেশি আসন লুট করেছে’। তিনি ভারতের নির্বাচন কমিশনকে ‘ভিলেন’ এবং ‘বিজেপির কমিশন,’ বলে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে আবার ‘ফিরে আসার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনের একেবারে শেষে তিনি বলেছেন, “আমি রাস্তায় লোক, রাস্তায় থাকব।” অর্থাৎ রাজপথের লড়াইয়ে নিজেকে আবার মেলে ধরার আভাস দিয়েছেন তিনি।

বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে কি আসামের মডেল মেনে চলবে? পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক জয় একটি পরিচিত নির্বাচনি কৌশল অনুসরণ করছে, যেখানে মুসলিমবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়া একটি প্রধান ভিত্তি।

মোদিসহ বিজেপির নেতাদের ভাষণে মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে দলটি ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ রাজ্য থেকে তাড়াতে হিন্দু ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ দখল করায় কথিত ‘অবৈধ’ মুসলিম বাসিন্দাদের ওপর দমন-পীড়নের আশঙ্কা আরো প্রকট হয়ে উঠল।

যে রাজ্যটি রাস্তার ধারের খাবারের দোকানে গরুর মাংসসহ মাছ ও মাংস এবং বিভিন্ন সুস্বাদু খাবারের জন্য বিখ্যাত, সেখানে নিরামিষভোজন চাপিয়ে দেওয়া বা প্রচার করা একেবারে অসম্ভব নয়। বিজেপি-শাসিত অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যে মাংস, বিশেষ করে গরুর মাংস বিক্রি ও খাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ চাপানোর চেষ্টা হয়েছে।

শুধু মাছ সম্ভবত ব্যতিক্রম হবে। হিন্দু ও মুসলিম উভয়ের জন্যই একটি প্রধান খাদ্য হিসেবে মাছ শুধু প্রোটিনের উৎস নয়; এটি বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে বিয়ে এমনকি ধর্মীয় আচারেও এটি ব্যবহৃত হয়। নির্বাচনে জিতলে বিজেপি মানুষের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করবে, এই আশঙ্কা দূর করতে দলের অনেক নেতাকে হাতে মাছ নিয়ে প্রচার করতে দেখা গেছে।

সোমবার পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে ধন্যবাদ জানানোর সময় মোদির কথায় এমন আশঙ্কা দূর করার চেষ্টার প্রতিফলন দেখা যায়।

“আমাদের ডাবল-ইঞ্জিন সরকার সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্য সমান সুযোগ ও সম্মান নিশ্চিত করবে,” মোদি এক্স-এ পোস্ট করেন। 

কিন্তু মোদি বরাবরই ‘সমাজের সব স্তরের মানুষের’ জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনি প্রচার ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ স্লোগানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, যার অর্থ ‘সবার সঙ্গে, সবার উন্নয়ন’। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপির যে ‘ডাবল-ইঞ্জিন’ সরকার রয়েছে, সেগুলোর চিত্র একবারেই ভিন্ন ধরনের। বিশেষ করে প্রতিবেশী আসামকে উদাহরণ হিসেবে নিলে বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গের জন্য কী অপেক্ষা করছে।

আসামের হিন্দু জাতীয়তাবাদী মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা হিমান্ত বিশ্ব শর্মা।

আসামের সঙ্গে ২৬৩ কিলোমিটার এবং পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং ১৯৭১ সালে ভারতের পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, যেখানে ভারত সামরিক সহায়তা দেয়।

ঔপনিবেশিক মানচিত্রবিদরা উপমহাদেশকে আধুনিক রাষ্ট্রে ভাগ করার অনেক আগেই বর্তমান বাংলাদেশের মানুষ আসামের ধানক্ষেত ও চা-বাগানে কাজ করার জন্য সেখানে চলে যায় বলে ইতিহাস রয়েছে।

আজ আসামের পৌনে ৪ কোটি মানুষের এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম, যা ভারতীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ শতাংশ। তাদের বেশিরভাগই ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে আসামে অভিবাসিত হয়েছে। এই বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিমরা, যাদের অবমাননাকরভাবে ‌‘মিয়া’ বলা হয়, বহু দশক ধরে বিদেশিবিদ্বেষী প্রচারের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে আসছে। ২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসার সময় থেকে বিজেপি এই প্রচারকে সমর্থন করে আসছে।

১২৬ সদস্যের আসাম বিধানসভায় ১০২টি আসন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা ২০২১ সালের তুলনায় আরো বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে ফিরেছেন। এই জোরালো জয়ের ফলে কট্টর হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রী শর্মা মুসলিমদের বিরুদ্ধে তার আক্রমণ আরো বাড়াতে পারেন। গত পাঁচ বছরে তাকে ও তার সরকারকে এই সম্প্রদায়কে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে আখ্যা দিতে, তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করতে এবং বাড়িঘর ভেঙে দিতে দেখা গেছে।

বিতর্কিত ‘নির্বাচনি এলাকা পুনর্বিন্যাস’ প্রক্রিয়া আসামের বড় মুসলিম ভোটার গোষ্ঠীর প্রভাব আগের তুলনায় অনেক কমিয়ে দিয়েছে। আসামে বিরোধী দল কংগ্রেস থেকে জয়ী ১৯ জন বিধায়কের মধ্যে ১৮ জনই মুসলিম; যা রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

এই বছর বিশ্ব শর্মা তার ভাষণে আরো কঠোর দমন-পীড়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘অবৈধ বাংলাদেশি মুসলিমদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার’ কথা বলেছেন। তিনি সিভিল কোড হিসেবে ‘ইউনিফর্ম’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা একটি বিতর্কিত প্রস্তাব এবং ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনকে প্রতিস্থাপন করে। বিজেপি তাদের ইশতেহারে কথিত জোরপূর্বক ধর্মান্তর রোধ এবং তথাকথিত ‘লাভ জিহাদ’ নিয়ে আইন আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে, যা একটি অপ্রমাণিত ডানপন্থি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। যেখানে অভিযোগ করা হয় মুসলিম পুরুষরা হিন্দু নারীদের বিয়ের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করছে।

পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ু ভারতের অন্যতম উন্নত রাজ্য। যেখানে একটি চমক দেখা গেছে।

এই রাজ্যে চলচ্চিত্র তারকাদের রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অভিনেতা বিজয়, যিনি মাত্র দুই বছর আগে তামিলাগা ভেট্ট্রি কাজাগাম (টিভিকে) দল গঠন করেন। ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় ১০৮টি আসন জিতে ডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোটকে পরাজিত করেছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের মমতার মতোই, মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনও নিজের আসন হারিয়েছেন, যা একটি বড় ধাক্কা। কারণ তার সরকার তামিলনাড়ুকে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হারে ভারতের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে গড়ে তোলার কৃতিত্ব পেয়েছিল।

ভারতের তামিলনাড়ুর মেগাস্টার বিজয় থালাপাতি নিজে দল খুলে প্রথমবার নির্বাচন করেই চমক সৃষ্টি করেছেন।

বিজয়ের উত্থান তামিলনাড়ুর দুই প্রধান দ্রাবিড় দলের কয়েক দশকের আধিপত্য ভেঙে দিয়েছে, যাদের নামকরণ এসেছে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে শক্তিশালী এক আন্দোলন থেকে। এই দুই দল উত্তর ভারতের আধিপত্যশীল দলগুলোর হিন্দি ভাষা ও তথাকথিত উচ্চবর্ণ হিন্দু মূল্যবোধ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টারও বিরোধী।

তবে ৫১ বছর বয়সি এই অভিনেতা তামিলনাড়ু বিধানসভায় ১১৮ আসনের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে ১০টি আসন কম পেয়েছেন। সরকার গঠনের জন্য তার মিত্র দল দরকার। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেস ও অন্যান্য আঞ্চলিক দল তার সরকারে যোগ দিতে পারে।

কেরালার উন্নয়ন সূচক যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও ভালো বলে দাবি করা হয়। সেখানেও এবার ক্ষমতার পরিচিত পালাবদল ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট সরকার কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে হেরে গেছে। ১৪০টির মধ্যে ১০১টি আসন জিতেছে কংগ্রেস জোট। পশ্চিমবঙ্গের মতোই এখানে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ এবং তারা এক-চতুর্থাংশ আসন জিতেছে, যার মধ্যে ভারতীয় ইউনিয়ন মুসলিম লীগের (আইইউএমএল) একজন প্রথমবারের নারী বিধায়কও রয়েছেন।

দশকের পর দশক চেষ্টা করেও মোদির বিজেপি কেরালা ও তামিলনাড়ুতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে এই দুই রাজ্যেও বিজেপির ভোটের হার বেড়েই চলেছে।

মোদিকে প্রধানমন্ত্রী বহাল রাখায় বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে স্বজনপ্রীতিমূলক পুঁজিবাদের অভিযোগের মুখে পড়েছে। তবে দলটি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু যা অস্বীকার করা যায় না, তা হলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ধনকুবেররা আরো বেশি জমি, বন ও খনির মালিকানা হয়েছেন।

সোমবার পাঁচ রাজ্যের ফলাফলের মাধ্যমে বিজেপির ক্ষমতার সংহতি আরো বেড়েছে। দলটি এখন দেশের ২৮টির মধ্যে ২১টি রাজ্যে সরাসরি বা জোটের অংশ হিসেবে ক্ষমতায় রয়েছে। এই ২১ রাজ্য মিলে ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের প্রায় ৮০ শতাংশের বসবাস। একটি দলের জন্য এমন ক্ষমতার মানচিত্র শেষবার দেখা গিয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে, যখন কংগ্রেস তার ক্ষমতার শীর্ষে ছিল।

সমালোচকরা প্রায়ই বিজেপিকে একটি ‘নির্বাচনি যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেন। ২০২৫ সালে অ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্রেটিক রিফর্মসের এক মূল্যায়ন অনুযায়ী বিজেপির মোট আয় ৭১২ মিলিয়ন ডলার। যেখানে তাদের নিকটতম জাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের আয় প্রায় ৯৬ মিলিয়ন ডলার। লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট অরুন্ধতী রায় একবার বলেছিলেন, “এটা যেন ফেরারি (গাড়ি) আর সাইকেলের দৌড়।”

এখন এই ‌‘যন্ত্র’ ভারতের সাম্প্রতিক নির্বাচনি ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল এনে দেওয়ার পর মোদির তৃতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি তাকে রাজনৈতিকভাবে আরো শক্তিশালী করেছে। তবে এটি একই সঙ্গে গুরুতর প্রশ্নও তুলেছে, ভারত কি আরো স্বৈরাচারী হয়ে উঠছে? এটি কি একদলীয় আধিপত্যের দিকে এগোচ্ছে? বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল গণতন্ত্রে নির্বাচন কি আর স্বাধীন ও সুষ্ঠু থাকবে না?

লেখক পরিচিতি: নাদিম আসরার আলজাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের অন্যতম সম্পাদক।