আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধ বন্ধে চীনের সাহায্যের প্রয়োজন নেই: ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষ করতে চীনের সহায়তার কোনো প্রয়োজন পড়বে না বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চীনের বেইজিংয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে তিনি এই মন্তব্য করেন।

ট্রাম্পের এই অবস্থান এমন সময়ে সামনে এলো যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা ক্রমশ কমে আসছে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হচ্ছে। খবর রয়টার্সের।

হোয়াইট হাউজ ত্যাগ করার সময় সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমি মনে করি না ইরানের বিষয়ে আমাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন আছে। আমরা একভাবে না একভাবে জিতে যাব- তা শান্তিপূর্ণভাবেই হোক বা অন্য কোনোভাবে।”

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও, শত্রুতা বন্ধে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে দুই পক্ষই এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।

সূত্রের বরাতে রয়টার্সকে জানিয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত করেছে। তারা ওই অঞ্চল থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের জন্য ইরাক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বিশেষ চুক্তি করছে। অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তির পথ খুঁজছে, যা ওই জলপথের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণকে স্থায়ী রূপ দিতে পারে।

গত মঙ্গলবার ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, গত মাসে মার্কিন ও চীনা কর্মকর্তারা একমত হয়েছিলেন যে কোনো দেশই এই অঞ্চলে যাতায়াতের ওপর টোল আদায় করতে পারবে না। বেইজিং সম্মেলনের আগে এই বিষয়ে একটি বৈশ্বিক ঐকমত্য প্রদর্শনের চেষ্টা হিসেবেই একে দেখা হচ্ছে। ইরান থেকে তেল কেনা ও দেশটির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা চীন এই বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ করেনি।

বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছিল, ট্রাম্প তেহরানকে চুক্তিতে রাজি করানোর জন্য চীনকে অনুরোধ করবেন। আমেরিকার প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা ও প্রণালির ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া।

অন্যদিকে তেহরানও পাল্টা দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে- যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ, মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার ও সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা। এর মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত, যেখানে মার্কিন মিত্র ইসরায়েল ইরানের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সোমবার ট্রাম্প এসব দাবিকে ‘আবর্জনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে খাদ্যদ্রব্য, বাড়ি ভাড়া ও বিমান ভাড়াসহ নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। মুদ্রাস্ফীতি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেও ট্রাম্প জানিয়েছেন, আমেরিকানদের এই অর্থনৈতিক কষ্ট তাকে ইরানের সঙ্গে দ্রুত চুক্তিতে পৌঁছাতে বাধ্য করছে না। 

জনসাধারণের এই অর্থনৈতিক কষ্ট তাকে চুক্তিতে পৌঁছাতে কতটা উৎসাহিত করছে- মঙ্গলবার সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “একবিন্দুও না।”

তিনি আরো বলেন, “ইরানের বিষয়ে আমি যখন কথা বলি, তখন একটাই বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- তারা পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না। আমি আমেরিকানদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে ভাবি না; আমি কারো কথা ভাবি না। আমি শুধু একটি বিষয় নিয়ে ভাবি: আমরা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দিতে পারি না। এটাই একমাত্র বিষয় যা আমাকে অনুপ্রাণিত করে।”

আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগের মাঝে ট্রাম্পের এই মন্তব্য কড়া সমালোচনার মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৭ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে যে, তাদের রণতরী ‘আব্রাহাম লিঙ্কন’ আরব সাগরে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অবরোধ কার্যকর করছে। ইরানের অর্থনীতি ধসিয়ে দিতে  মার্কিন বাহিনী এই অঞ্চলে ৬৫টি বাণিজ্যিক জাহাজের পথ পরিবর্তন করে দিয়েছে ও ৪টি জাহাজকে অকেজো করে দিয়েছে।

পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত আমেরিকার ব্যয় হয়েছে ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। 

জরিপের তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ছয় মাস আগে এই যুদ্ধ মার্কিন ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রয়টার্স/ইপসোস-এর এক জরিপে দেখা গেছে, তিন-চতুর্থাংশ আমেরিকান মনে করেন ট্রাম্প কেন এই যুদ্ধে জড়িয়েছেন তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

এদিকে ইরানি কর্মকর্তারা এখনো তাদের অবস্থানে অনড়। ইরানের ফারস নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ পরিধি আরো বিস্তৃত করেছে, যা এখন পূর্বে জাস্ক শহর থেকে পশ্চিমে সিরি দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত।

দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, আইআরজিসি ‘শত্রুকে মোকাবিলার প্রস্তুতি’ হিসেবে সামরিক মহড়া পরিচালনা করছে।