কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবীর ভূমিকায় পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোট পরবর্তী সহিংসতার মামলায় প্রশ্ন করতে আইনজীবীর ভূমিকায় হাইকোর্টে হাজির তৃণমূল সুপ্রিমো।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের এজলাসে ভোট পরবর্তী সহিংসতার মামলার শুনানি ছিল। সেই মামলায় প্রশ্ন করতেই এদিন সকালেই আইনজীবীদের নির্দিষ্ট কালো গাউন পরে হাইকোর্টে পৌঁছে যান সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। সকাল সোয়া দশটার দিকে কোর্টে উপস্থিত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধান বিচারপতির এজলাসে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ভোট পরবর্তী সহিংসতায় তৃণমূল কংগ্রেসের ৬ কর্মী নিহত ও একাধিক কার্যালয় আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিজেপি সরকার কড়া হাতে ব্যবস্থা নিলেও ভোট পরবর্তী হিংসার অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়।
গত ১২ মে বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব রুখতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। জনস্বার্থ মামলায় দাবি করা হয়েছে, প্রায় দুই হাজার তৃণমূল সমর্থক শারীরিক হামলার শিকার হয়েছে। কমপক্ষে ৩৬৫টি দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর বা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।আইনজীবী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা সেই জনস্বার্থ মামলার শুনানিতেই এদিন প্রশ্ন করতে নামেন খোদ সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চে দলের হয়ে প্রশ্ন করেন তৃণমূল সুপ্রিমো।
প্রশ্ন করতে গিয়ে প্রথমেই প্রধান বিচারপতির কাছে অনুমতি চেয়ে বলেন, ”আমি ১৯৮৫ সাল থেকে আইনজীবী। এবং সেই হিসাবেই আমি প্রশ্ন করতে চাই।” এরপরেই উত্তরপ্রদেশের প্রসঙ্গ টেনে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করেন তিনি। বলেন, “এটা উত্তরপ্রদেশ নয়, বাংলা। ফলে বাংলার মানুষকে বাঁচান।”
আদালতে মমতার দাবি, ‘৯২ বছরের বৃদ্ধ, ১৮ বছরের দম্পতিকেও বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। তপশিলি জাতি, সংখ্যালঘুদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, তাকেও বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুলিশের কাছে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। আদালতের কাছে মমতা জানান, “অনলাইনে অভিযোগ জানাতে হচ্ছে।” এরপরেই প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেদন, “দয়া করে রাজ্যের মানুষকে নিরাপত্তা দিন।”
ভোট পরবর্তী সহিংসতার একই মামলায় এদিন প্রশ্ন করেন সিপিআইএম নেতা ও আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য। এদিন মমতার পাশাপশি বিজেপি বিরোধী অবস্থানে তিনিও হাইকোর্টের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন “নিউ মার্কেট এলাকায় হকারদের অস্থায়ী দোকান বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হোক।”
এরপরেই রাজ্য পুলিশের তরফে আইনজীবী ধীরাজ ত্রিবেদী এই মামলাটি পুরোনো ভোট পরবর্তী সন্ত্রাসের মামলার সঙ্গে যুক্ত করে বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠিয়ে দেওয়ার আবেদন জানান। হাইকোর্টে তিনি বলেন, “পুলিশ, কড়া হাতে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। কেউ অপরাধ করে থাকলে পুলিশ নিশ্চয় ব্যবস্থা নেবে।”
বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের দায়ের করা নিউ মার্কেট সংক্রান্ত মামলাতেও জবাব দেন ধীরাজ ত্রিবেদী। তিনি বলেন, “সরকার ওই অস্থায়ী কাঠামো ভাঙেনি। ঘটনায় যুক্তদের মধ্যে ইতিমধ্যে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
হাইকোর্টের মধ্যে মমতা এবং বিকাশ রঞ্জন যখন বিজেপি সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন, ঠিক সেসময় আদালতের বাইরে জয় শ্রী রাম স্লোগান ওঠে। যা নিয়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মূল সমস্যা শুরু হয় শুনানি শেষে বেরোনোর সময়। আদালত চত্বরেই চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। আইনজীবীদের একাংশ ও উপস্থিত জনতা মমতাকে লক্ষ্য করে ‘চোর’ স্লোগান দিতে শুরু করেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তড়িঘড়ি প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। মমতা প্রধান বিচারপতিকে বলেন, “দেখুন বাইরের অবস্থাটা। কী হচ্ছে! এখান থেকে বেরোনোই মুশকিল।”
প্রধান বিচারপতি পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য আইনজীবীদের অনুরোধ জানালেও লাভ বিশেষ হয়নি। লিফট থেকে নেমে নিচতলায় আসা এবং সেখান থেকে মূল ফটক পর্যন্ত পৌঁছানো- প্রতি পদক্ষেপে বিক্ষোভের মুখে পড়েন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিরাপত্তারক্ষী ও পুলিশের তৎপরতায় কোনোরকমে এলাকা ছাড়েন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী।