সৌদি ভিন্নমতাবলম্বী ও প্রখ্যাত সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে ফ্রান্স। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের করার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ফ্রান্সের একটি আদালত এই নির্দেশ দিয়েছেন।
রবিবার (১৭ মে) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম আরটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের অক্টোবরে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেট ভবনের ভেতরে নির্মমভাবে খুন হন ৫৮ বছর বয়সী ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট জামাল খাশোগি। ধারণা করা হয়, হত্যার পর তার মরদেহ টুকরো টুকরো করে গায়েব করে দেওয়া হয়, যা আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
সৌদি কর্তৃপক্ষ কনস্যুলেটের ভেতরে খাশোগি নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও দাবি করেছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের কোনো অনুমতি ছাড়াই কিছু ‘বিপথগামী কর্মকর্তা’ এই অভিযান চালিয়েছিল।
২০২২ সালের জুলাই মাসে খাশোগির প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘ডেমোক্রেসি ফর দ্য আরব ওয়ার্ল্ড নাও’ (ডন) এবং আন্তর্জাতিক সাংবাদিক অধিকার সংস্থা ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’ (আরএসএফ) ফ্রান্সে একটি আইনি অভিযোগ দায়ের করে। এতে অভিযোগ করা হয়, একটি সুসংগঠিত গোষ্ঠীর অংশ হিসেবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নিজেই জামাল খাশোগিকে ‘শ্বাসরোধ করে হত্যার’ নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তিনি নির্যাতন ও জোরপূর্বক গুম করার অপরাধে সরাসরি জড়িত।
ফ্রান্সের জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী প্রসিকিউটরের কার্যালয় (পিএনএটি) এই তদন্ত শুরুর বিরোধিতা করেছিল। প্রসিকিউটরের এই অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে আরএসএফ-এর আইনজীবী ইমানুয়েল দাউদ একে ‘স্বার্থের রাজনীতি’ বলে আখ্যা দেন। তিনি মন্তব্য করেন, সৌদি কর্তৃপক্ষকে না চটিয়ে ফ্রান্সের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতেই শুরুতে এই তদন্তে বাধা দেওয়া হয়েছিল।
তবে প্যারিসের আপিল আদালত এখন রায় দিয়েছে যে, “এই কর্মকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
শনিবার (১৬ মে) ফ্রান্সের জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী প্রসিকিউটরের কার্যালয় (পিএনএটি) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি-কে জানায়, আদালতের নির্দেশের পর দেশটির ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ ইউনিট’-এর একজন তদন্তকারী বিচারক এখন খাশোগি হত্যাকাণ্ডের এই অভিযোগটি খতিয়ে দেখার দায়িত্ব পেয়েছেন।
খাশোগি একসময় সৌদি সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছিলেন ও রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি সৌদি নেতৃত্বের কট্টর সমালোচনে পরিণত হন ও যুক্তরাষ্টে আশ্রয় নেন।
সৌদি আরবের প্রসিকিউটরদের দাবি, খাশোগিকে সৌদি আরবে ফিরিয়ে আনার একটি ব্যর্থ চেষ্টার সময় জোরপূর্বক আটকে রেখে অতিরিক্ত মাত্রায় ড্রাগ ইনজেকশন দেওয়ার ফলে তার মৃত্যু হয়।
২০২১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন খাশোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, সৌদি আরবের ওপর যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে। সৌদি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো খাশোগিকে ‘আটক বা হত্যা’ করার একটি অভিযানের অনুমোদন দিয়েছিল। সৌদি আরব অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে এই মার্কিন প্রতিবেদনকে ‘মিথ্যা ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর বলেছিলেন যে, সাংবাদিক খাশোগিকে হত্যার এই পরিকল্পনা সম্পর্কে সৌদি যুবরাজ আসলে ‘কিছুই জানতেন না’।