যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তাইওয়ানের কাছে সম্ভাব্য মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের সঙ্গে কথা বলবেন। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ঐতিহ্যের পরিপন্থি।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৯ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের কোনো শীর্ষ নেতা সরাসরি কথা বলেননি। মূলত সে বছর বেইজিং সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে গিয়ে তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল ওয়াশিংটন।
বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে ও প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এটি দখল করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি। ২০২৪ সালে ক্ষমতা নেওয়া লাই চিং-তে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দ্বীপটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে সমর্থন করে আসছে। মার্কিন আইন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন তাইপেকে আত্মরক্ষার উপায় সরবরাহ করতে বাধ্য। তবে একই সঙ্গে বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটনকে ভারসাম্য বজায় চলতে হয়।
বুধবার (২০) তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্তের আগে লাইয়ের সঙ্গে কথা বলার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “আমি তার সঙ্গে কথা বলব। আমি সবার সঙ্গেই কথা বলি... আমরা বিষয়টা নিয়ে কাজ করব, তাইওয়ান সমস্যাটা নিয়ে।”
গত সপ্তাহে বেইজিংয়ে দুই দিনের শীর্ষ সম্মেলনের পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ককে ‘অসাধারণ’ বলেও প্রশংসা করেন ট্রাম্প।
১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’ নামক আইন পাস করে। ওই আইনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ‘তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষামূলক মানের অস্ত্র সরবরাহ করতে পারে’। আর এ কারণেই ওয়াশিংটন তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রেখেছে।
তাইওয়ানের কাছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন অস্ত্র প্যাকেজ বিক্রির বিষয়ে ট্রাম্প এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। এই প্যাকেজে ড্রোন-বিরোধী সরঞ্জাম ও বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টাগনের শীর্ষ নীতি নির্ধারণী কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবির একটি প্রস্তাবিত সফর বর্তমানে আটকে রেখেছে বেইজিং। চীন জানিয়েছে, ট্রাম্প এই অস্ত্র চুক্তির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেন, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা এই সফরের অনুমোদন দিতে পারছে না।
গত সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক শেষে এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে বেইজিং থেকে ফেরার পথে ট্রাম্পকে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে জিজ্ঞেস করে ছিলেন সংবাদদিকরা। জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একটি সিদ্ধান্ত নেবেন’।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, “বর্তমানে যিনি তাইওয়ান চালাচ্ছেন, আপনারা তো জানেনই তিনি কে, আমাকে সেই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
ট্রাম্পের বেইজিং সফরের সময় চীন স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, মার্কিন-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বড় ইস্যুটি হলো তাইওয়ান। শি জিনপিং সতর্ক করে বলেছিলেন, এই ইস্যুটি সঠিকভাবে সামলানো না হলে দুটি পরাশক্তির মধ্যে ‘সংঘাত’ তৈরি হতে পারে।
যদিও দ্বীপটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে তিনি এটাও বলেছেন যে, শি জিনপিং তাইওয়ান নিয়ে ‘খুবই সংবেদনশীল’। গত সপ্তাহে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প আরো বলেন, “আমি কোনো পক্ষকেই কোনো প্রতিশ্রুতি দিইনি।”
ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠকের পর থেকে লাই চিং-তে একের পর এক বিবৃতি দিয়ে চলেছেন। তিনি বলেছেন, এই দ্বীপটি একটি ‘সার্বভৌম, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশ’। তাইওয়ান প্রণালির শান্তি কোনোভাবেই ‘বিনিময় করা হবে না’।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি ‘আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একটি অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি’।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য প্রথা ভাঙার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি তৎকালীন তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েনের সঙ্গে সরাসরি ফোনে কথা বলেছিলেন, যা নিয়ে চীন তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
ট্রাম্প আরো দাবি করেছেন যে, তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এই অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে ‘বিস্তারিত’ আলোচনা করেছেন। এ ঘটনা সত্যি হলে তা হবে মার্কিন নীতির আরেকটি বড় লঙ্ঘন।
১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে আশ্বাস দিয়েছিল, তারা তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করবে না। কিন্তু বেইজিং থেকে ফেরার পথে যখন ট্রাম্পকে সেই প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়, তখন তিনি বলেন, ১৯৮০-র দশক ছিল ‘অনেক আগের কথা’।
গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়, যা এখন পর্যন্ত অন্যতম বৃহত্তম অস্ত্র চুক্তি। এ ঘটনায় বেইজিং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল।
চীনের ক্রমাগত সামরিক চাপ মোকাবিলায় তাইওয়ান বর্তমানে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি করেছে। তবে তাইওয়ানের বেশিরভাগ নাগরিক ‘বর্তমান পরিস্থিতি’ বজায় রাখার পক্ষে- অর্থাৎ তারা চীনের সঙ্গে একীভূত হতেও চায় না, আবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে যুদ্ধও ডেকে আনতে চায় না।