তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বলেছেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলতে পারলে ‘খুশি’ হবেন। মূলত ট্রাম্পের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতেই তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট এই কথা বলেছেন।
তবে, তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্ভাব্য এই সরাসরি ফোনালাপ একদিকে যেমন চার দশকেরও বেশি সময়ের মার্কিন কূটনৈতিক প্রটোকল ভেঙে দেবে, অন্যদিকে তেমনি চীনকে ক্ষুব্ধ করার ঝুঁকিও তৈরি করবে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আল-জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার (২০ মে) ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, তাইওয়ানের কাছে সম্ভাব্য মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন।
গত সপ্তাহে বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষ করার পর, এই নিয়ে দ্বিতীয়বার ট্রাম্প তাইওয়ানের নেতার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।
১৯৭৯ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের কোনো শীর্ষ নেতা সরাসরি কথা বলেননি। সে বছর বেইজিং সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে গিয়ে তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল ওয়াশিংটন।
বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে ও প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এটি দখল করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি।
বুধবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প আবারো জোর দিয়ে বলেন, “আমি তার (লাইয়ের) সঙ্গে কথা বলব। আমি সবার সঙ্গেই কথা বলি।” এর মাধ্যমে তিনি এই প্রাথমিক জল্পনা উড়িয়ে দিলেন যে, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বেইজিং শীর্ষ সম্মেলনের পর লাইয়ের নাম উল্লেখ করাটা তার কোনো মুখের ভুল ছিল।
ট্রাম্প দাবি করেন, বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার চমৎকার বৈঠক হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন এখন ‘তাইওয়ান সমস্যা’ নিয়ে কাজ করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন হোয়াইট হাউজ তাইওয়ানের কাছে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি বিশাল অস্ত্র সহায়তা প্যাকেজ বিক্রির বিষয়টি বিবেচনা করছে। বেইজিং সফর শেষে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, এই অস্ত্র বিক্রিকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক বা কূটনৈতিক দরকষাকষির ঘুঁটি হিসেবেও ব্যবহার করা হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বলেন, “তাইওয়ান প্রণালিতে স্থিতিশীল বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” এর পাশাপাশি বেইজিংয়ের দিকে আঙুল তুলে তিনি যোগ করেন, “চীনই মূলত এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার মূল বিঘ্নকারী।” ট্রাম্পের সঙ্গে এই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।
আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও, ১৯৭৯ সালের ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’ আইন অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার উপায় সরবরাহ করতে বাধ্য। যেকোনো সম্ভাব্য চীনা আক্রমণ ঠেকাতে তাইওয়ান মূলত মার্কিন সমর্থনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ওয়েলিংটন কু বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে, তাই অস্ত্র ক্রয়ের বিষয়ে আমরা ইতিবাচক।”
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টাগনের শীর্ষ নীতি নির্ধারণী কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবির একটি প্রস্তাবিত সফর বর্তমানে আটকে রেখেছে বেইজিং। চীন জানিয়েছে, ট্রাম্প এই অস্ত্র চুক্তির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেন, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা এই সফরের অনুমোদন দিতে পারছে না।
ট্রাম্পের বেইজিং সফরের সময় চীন স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, মার্কিন-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বড় ইস্যুটি হলো তাইওয়ান। শি জিনপিং সতর্ক করে বলেছিলেন, এই ইস্যুটি সঠিকভাবে সামলানো না হলে দুটি পরাশক্তির মধ্যে ‘সংঘাত’ তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্প ও লাইয়ের মধ্যকার সম্ভাব্য সরাসরি ফোনালাপ চীন-মার্কিন সম্পর্ক কিংবা চীন-তাইওয়ান সম্পর্ক কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
এর আগে ২০১৬ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েনের একটি অভিনন্দনসূচক ফোন কল গ্রহণ করেছিলেন। সেই ঘটনাটি তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং বেইজিংকে চরম ক্ষুব্ধ করেছিল।