আন্তর্জাতিক

ইরানের বিমান খাতের অভাবনীয় অগ্রগতিতে ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র, দাবি কর্মকর্তার

মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক হামলার পর ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের দ্রুত পুনর্গঠনে ওয়াশিংটন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। আর সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ও হুমকি দিচ্ছে বলে দাবি করেছেন তেহরানের একজন শীর্ষস্থানীয় বিমান কর্মকর্তা। খবর ইরানি সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির।

শুক্রবার (৩০ মে) ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-প্রধান সৈয়দ হামিদরেজা সানেয়ী এক বিবৃতিতে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সাম্প্রতিক হুমকিকে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর ল্যান্ডিংয়ের অধিকার, রিফুয়েলিং সুবিধা ও টিকিট বিক্রি বন্ধের এই হুমকির কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

সানেয়ী বলেন, “মার্কিন অর্থমন্ত্রী এ নিয়ে দ্বিতীয়বার এ ধরনের হুমকি দিয়েছেন। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরানের বিমান পরিবহন খাতের দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো দেখে যুক্তরাষ্ট্র আসলে ক্ষুব্ধ, ওয়াশিংটনের এই অবস্থান সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হচ্ছে।”

মার্কিন অর্থমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে বলেছিলেন, ওয়াশিংটন ‘ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর ল্যান্ডিং স্পট, বিরফুয়েলিং এবং টিকিট বিক্রির সুবিধা বন্ধ করে দিচ্ছে’। তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট বিমান সংস্থার নাম উল্লেখ করেননি বা বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি। মার্কিন অর্থ বিভাগ এর আগে ইরান এয়ার ও মাহান এয়ারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

প্রেস টিভি বলছে, ওয়াশিংটনের এই চাপের পটভূমিতে রয়েছে এমন একটি বেসামরিক বিমান চলাচল খাত, যা আন্তর্জাতিক অনেক অধিকাংশ বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্যনুযায়ী, ভারী মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা সত্ত্বেও, বৈশ্বিক যুদ্ধোত্তর পুনরুদ্ধারের সব রেকর্ড ভেঙে ইরান দুই মাসেরও কম সময়ে তাদের বোমাবিধ্বস্ত ২১টি বিমানবন্দর বা বেসামরিক নেটওয়ার্কের ৪০ শতাংশ পুনরুদ্ধার করেছে।

৪০ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের বেসামরিক বিমানবন্দরগুলো ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ইরানের সংসদের নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজা রেজায়ী-কুচি গত মাসে জানিয়েছিলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হওয়া এই যুদ্ধে বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ১০টি যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস হয়েছে এবং আরো ৫০টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি আরো যোগ করেন, ক্ষতিগ্রস্ত কিছু বিমান মেরামতযোগ্য ও পুনরায় পরিষেবাতে ফিরে আসতে সক্ষম। তিনি বলেন, ইরান সরাসরি আক্রমণকারী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করছে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে।

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার সময় ইরানের বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোর কন্ট্রোল টাওয়ার, রানওয়ে ও নেভিগেশন সিস্টেম লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। যদিও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে এই ধরনের অবকাঠামো স্পষ্টভাবে সুরক্ষিত।

দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ইরান তাদের বোমাবিধ্বস্ত ২১টি বিমানবন্দর- যা দেশের সামগ্রিক বেসামরিক নেটওয়ার্কের প্রায় ৪০ শতাংশ- পুনরায় সচল করতে সক্ষম হয়েছে।

প্রেস টিভির তথ্যমতে, সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কন্ট্রোল টাওয়ার ও রানওয়ে ধ্বংস হওয়া ইরানের তৃতীয় ব্যস্ততম ‘তাবরিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ গত বুধবার থেকে পুনরায় ফ্লাইট কার্যক্রম শুরু করেছে। কোনো বিদেশি সরঞ্জাম বা প্রকৌশলীর সাহায্য ছাড়াই, সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে এই পুনরুদ্ধার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের গড়ে ওঠা স্বনির্ভরতাই এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি বলে জানানো হয়েছে।

ইরানি সংবাদমাধ্যমটি আরো জানায়, একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা অনুযায়ী এই পুনর্নির্মাণ কাজ চালানো হয়। প্রথমে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে থাকা পূর্বদিকের বিমানবন্দরগুলো চালু করে আকাশসীমা ব্যবহারের রাজস্ব নিশ্চিত করা হয়। এরপর কেন্দ্র ও পশ্চিমাঞ্চলের বিমানবন্দরগুলো সচল করা হয়। বর্তমানে ইসফাহান, শিরাজ ও ইয়াজদ বিমানবন্দরগুলো হজ যাত্রীদের সেবায় ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে।

তাবরিজ বিমানবন্দর থেকে তেহরান, মাশহাদসহ অভ্যন্তরীণ রুটগুলোর পাশাপাশি ইস্তাম্বুল, বাগদাদ, দুবাই, বাকু এবং হামবুর্গের মতো আন্তর্জাতিক রুটেও পর্যায়ক্রমে বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানি আকাশসীমা ব্যবহারের বিষয়ে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গেও আলোচনা শুরু করেছে তেহরান।