সকাল ৬টা নাগাদ বান্দার ওপরের সূর্য যেন সকালের আবহাওয়াকে ভুলে গিয়েছিল। সূর্যের আলোর মধ্যে ছিল গ্রীষ্মের দুপুরের মতো তীব্র ঝলক। সকালের নাস্তার আগেই ছায়াগুলো ছোট হয়ে আসছিল।
মে মাসে, ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের এই ধুলোমাখা জেলাটি বেশ কয়েকদিন ধরে এক অনাকাঙ্ক্ষিত জাতীয় তালিকার শীর্ষে ছিল: দেশের সবচেয়ে উষ্ণতম স্থান। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তাপমাত্রা ৪৭-৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল, যা স্থানীয় মানদণ্ডেও এক অসাধারণ ধারাবাহিকতা।
তবুও, যেটি ছিল সবচেয়ে লক্ষণীয়, তা হলো মানুষের মানিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি। বান্দার বিশ লাখেরও বেশি বাসিন্দা—যাদের অনেকেই কৃষিকাজ, নির্মাণ, পরিবহন এবং অন্যান্য বাইরের কাজের ওপর নির্ভরশীল—তাপ সহ্য করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় ছিল না। তারা এর সাথে নিজেদের জীবনকে নতুন করে সাজিয়ে নিচ্ছিল।
জেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে, বেশিরভাগ শহর ঠিকমতো জেগে ওঠার আগেই আত্তারার সবজির বাজার বন্ধ হতে শুরু করেছিল। কৃষকেরা ভোরবেলা টমেটো, লাউ, মরিচ, লেবু এবং তরমুজ নিয়ে আসতেন। গরম আরো বাড়ার আগেই সবাই তাদের জিনিসপত্র তাড়াতাড়ি বিক্রি করে বাড়ি ফিরতে চাইছিল।
টমেটোর ক্রেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যবসায়ী হিমাংশু বলল, “সূর্যের দিকে তাকান। এখন মাত্র সকাল ৬টা ১৫ বাজে, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন সকাল ৮টা-৯টা বাজে।”
এই গরমে যেমন বাজারের সময় কমে আসছিল, তেমনই তার পণ্যের আয়ুও কমে যাচ্ছিল।
হিমাংশু বলেন, “এক বাক্স টমেটো আজ বা কালকের মধ্যে বিক্রি করতেই হবে। এই আবহাওয়ায় এগুলো বেশিদিন টিকবে না।”
যেখানে একসময় বেলা পর্যন্ত কেনাবেচা চলত, সেখানে এখন সকাল ৮টার মধ্যেই ব্যস্ততা কমে যাচ্ছে। সকাল ১০টা নাগাদ বাজার প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ছে।
বান্দার প্রায় সবকিছুই এখন সংক্ষিপ্ত সময়সূচির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। প্রখর আকাশ আর দগ্ধ মাটির মাঝে মানুষ তাই করে, যা পোলিশ সাংবাদিক রিশার্ড কাপুশিনস্কি একসময় আফ্রিকার অন্য এক চুল্লির মতো উত্তপ্ত ভূখণ্ডে পর্যবেক্ষণ করে বলেছিলেন: তারা তাদের সমস্ত শক্তি ব্যয় করে ‘ছায়া আর মৃদু বাতাসের খোঁজে।’
বান্দার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কেইন নদীটি জেলার তাপপ্রবাহের সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, বালু উত্তোলন এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ায় নদীটির চারপাশের ভূখণ্ডকে শীতল রাখার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা এমন এক দুষ্টচক্র তৈরি করেছে যেখানে পানির অভাব এবং চরম তাপমাত্রা একে অপরকে আরো শক্তিশালী করে তুলছে।
বান্দা কৃষি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিদ দীনেশ সাহের মতে, এই জেলায় আগেও ৪৮-৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দেখা গেছে। ২০২৪ সালে পরপর দুই দিন পারদ ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। কিন্তু এবারের গ্রীষ্মের ঘটনাটিকে যা অস্বাভাবিক করে তুলেছিল তা হলো এর দীর্ঘস্থায়ীত্ব।
তিনি বলেন, “আট-নয় দিন ধরে একটানা ৪৭-৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল। এটাই ছিল নতুন।”
সূর্যাস্তের অনেক পরেও গরম থেকে যায় উল্লেখ করে দীনেশ বলেন, “মনে হয় যেন সকাল-রাতের আর কোনো অস্তিত্ব নেই।”
সকাল ৭টা বা ৮টার মধ্যেই দুপুর হয়ে আসে। রাতের তাপমাত্রা প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। এর ফলে এখানকার মানুষ কখনোই পুরোপুরি ঠান্ডা হতে পারে না।
স্থানীয় কৃষক প্রেম সিং বলেন, এই অঞ্চলে প্রতি বছর যে তীব্র তাপপ্রবাহ হয় তা নতুন কিছু নয় এবং ফসলের জন্য এটি অপরিহার্য। যা তাকে চিন্তিত করে তা হলো এর ক্রমবর্ধমান তীব্রতা। তিনি এর জন্য বৃক্ষ আচ্ছাদন হ্রাস, ব্যাপক খনি খনন, জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের বিস্তারকে দায়ী করেন।
সূত্র: বিবিসি