ব্রিটিশ সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক নিক কোহেন। সোমবার প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে শাহবাগ আন্দোলন ও লন্ডনে এর প্রভাব নিয়ে তার একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। শাহবাগ আন্দোলনের প্রশংসা করে একে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। রাইজিংবিডি২৪.কম-এর পাঠকদের জন্য প্রবন্ধটির অনুবাদ তুলে ধরা হলো-তাহরির স্কয়ারে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের শাহবাগ মোড়। লাখো প্রতিবাদী তরুণ জায়গাটি দখল করে মৌলবাদী ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। এমনকি রাজনীতিকরাও তাদের আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। আন্দোলনকারীরা তাদের দেখছেন অভিযুক্তদের সঙ্গে আঁতাতকারী হিসেবে। এখানে একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে জেগে উঠছে আজকের যুগের সবচেয়ে জরুরি, কিন্তু অবহেলিত একটি মূল্যবোধ- ধর্মনিরপেক্ষতা। একুশ শতকের নাগরিক জীবন থেকে ধর্মান্ধদের নির্মূল করতে ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যা একান্ত প্রয়োজন। স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমগুলো শাহবাগের এ আন্দোলন নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কারণ শাহবাগ আন্দোলন এমন এক অপরাধের প্রতিবাদে, যার বিরুদ্ধে পশ্চিমারা একবার সোচ্চার থাকলেও বতমানে সেটি পুরোপুরি ভুলে গেছে।ঢাকার তরুণরা জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের যুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করছেন। তাদের অপরাধ বোঝার জন্য বামপন্থীদের একটি শব্দ ব্যবহার করা যায়- ‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী’ (ক্লারিক ফ্যাসিজম)। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ গঠনের উদ্দেশ্য নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনী তাদের জবাব দিয়েছিল গণহত্যা ও গণধর্ষণ দিয়ে, যা বিশ্ববাসীকে হতবাক করেছিল। জর্জ হ্যারিসন ও রবি শঙ্কর বাংলাদেশকে সাহায্য করার জন্য ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে (নিউইয়র্ক) কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন। যুদ্ধ চলাকালে হিন্দু ও খ্রিস্টানদের হত্যা, উদ্বাস্তুদের চাপ ও পাকিস্তানকে দুর্বল করে দেওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তখন নিজের রাজনৈতিক জীবনের সেরা কাজটি করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। নির্যাতিত বাংলাদেশকে স্বাধীনতায় সাহায্য করার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিলেন। সে সময় পাকিস্তানি দখলদারদের প্রতি পদক্ষেপে সমর্থন করে সক্রিয় ইসলামপন্থীরা। জামায়াত আবুল আলা মওদুদীর পথ অনুসরণ করে, যাকে ইসলামি রাজনীতির দিকপাল বলা হয়। খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিশ্বযুদ্ধ চেয়েছিলেন মওদুদী। পাকিস্তান ভেঙে গেলে তার এই বৈশ্বিক বিপ্লবের স্বপ্ন ভেস্তে যায়। এর বদলা হিসেবে ডেথ স্কোয়াড গঠন করে মওদুদীর অনুসারীরা। হত্যা করে দেশের বুদ্ধিজীবী, প্রকৌশলী, প্রশাসক, শিক্ষকদের, যাদের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠতো স্বাধীন বাংলাদেশ।জামায়াতের এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য অনেক দেরিতে গঠিত আদালতের বিরুদ্ধেই এখন জেগে উঠেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ইতিহাস আন্দোলনের ইতিহাস। শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে দুই রকম চিন্তাভাবনা দেখা যাচ্ছে দেশটির উদারপন্থীদের মধ্যে। একদিক দিয়ে তারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করতে তরুণদের দৃঢ়তা ও সাহসের প্রশংসা না করে পারছেন না। অন্যদিকে, একই দৃঢ়তার সঙ্গে তরুণরা বলছেন, যুদ্ধাপরাধীদের কোনো ক্ষমা নেই, তাদের মৃত্যুদন্ড চাই। আপনি কী এমনটা ভাবছেন যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনেকদূর এগিয়ে গেছে, যুদ্ধাপরাধ অনেক আগের কথা? ব্রিটেনের বাংলাদেশিদের মধ্যেও এ ব্যাপারে প্রচুর দ্বন্দ্ব রয়েছে।শাহবাগের সঙ্গে জামায়াতের দ্বন্দ্বের রেশ লন্ডনেও পৌঁছেছে। ৯ ফেব্রুয়ারি ইস্ট লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল রোডের আলতাব আলী পার্কে জড়ো হয় শাহবাগ-সমর্থকরা। সেখানে একই সঙ্গে অবস্থান নেয় জামায়াতও। আন্দোলনকারীদের একজন আমাকে বলেন, “তারা আমাদের উপর পাথর নিয়ে আক্রমণ করেছে। সেখানে বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা ছিল।”কিন্তু তিনি দমে যাওয়ার পাত্র নন। অন্যদের নিয়ে সোমবারই আবার পার্কে যাচ্ছেন আন্দোলনের জন্য। তবে তার সঙ্গীরা কিছুটা শঙ্কিত। শুক্রবার রাতে শাহবাগের সক্রিয় কর্মী আহমেদ রাজীব হায়দার খুন হওয়ার পর তাদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন লন্ডনের আন্দোলনকারীরা। এই হোয়াইটচ্যাপেলেই সমাজতন্ত্রী ও ইহুদিরা ব্রিটিশ ফ্যাসিস্ট ইউনিয়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। যদিও বামপন্থীরা একে নাৎসিবিরোধী আন্দোলন হিসেবে অ্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। আধুনিক বিশ্ব যেখানে চরমপন্থীদের সঙ্গে নিরলস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ব্রিটিশ বামপন্থীদের অবস্থান কোথায় আমার কাছে পরিষ্কার নয়। উদারনৈতিক বহুসংস্কৃতিবাদের ভেতরেই এর অস্বীকৃতির বীজ রয়েছে। এটি হয় উদারনৈতিক নতুবা বহুসংস্কৃতিবাদ, কিন্তু দুটোই হতে পারে না। বহুসংস্কৃতিবাদ মানে এই নয় যে, বর্ণবাদ কিংবা সাম্প্রদায়িকতার শিকার না হয়ে সবাই তার নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবে, মনের ভাব প্রকাশ করতে পারবে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, এর সুবিধা নিয়ে সমাজ তাদের সুবিধামতো নেতাদের বেছে নিয়ে সম্মানিত করছে। ব্রিটিশ ইসলামের ক্ষেত্রে প্রশ্রয় পাওয়া দলটি হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। এমনকি তাদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছে, যারা বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। ‘অপাস ডাই,’ যেমন ব্রিটিশ ক্যাথোলিসিজমকে প্রতিনিধিত্ব করে, শিবসেনা যেমন ব্রিটিশ হিন্দুত্ববাদকে প্রতিনিধিত্ব করে, তেমনি জামায়াতে ইসলামী ব্রিটেনে ইসলামকে প্রতিনিধিত্ব করে। আর এসবের জন্য বামপন্থীদেরই দায়ী করতে হবে। কেন লিভিংস্টোন ও জর্জ গ্যালওয়ের মতো রাজনীতিকরা জামায়াতের ইস্ট লন্ডন মসজিদে সহায়তা করেছেন, ইসলামিক ফোরাম ইউরোপ নামে জামায়াতের সংগঠনটিই টাওয়ার হ্যামলেটের স্থানীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। কুইলিয়াম ফাউন্ডেশনের উদার মুসলমানরা আমাকে বলেছেন, ব্রিটেন জামায়াতকে এমন একটা স্থান দিয়েছে,যার ফলে ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা সামাজিক গণতন্ত্রের বদলে মৌলবাদী ইসলামের দিকেই ঝুঁকে পড়ছেন।ব্রিটিশ-এশীয় নারীবাদী গীতা সেহগল ধর্মান্ধতার আগ্রাসন রোধে গত সপ্তাহে সেন্টার ফর সেক্যুলার স্পেস চালু করেছেন। তার মতে, জামায়াত ঐতিহ্যগত বিশ্বাসকেই বিকৃত করে। গীতা সেহগলই ১৯৯০ সালে চ্যানেল ৪-কে ব্রিটেনে বসবাসরত জামায়াতের যুদ্ধাপরাধীদের নাম জানিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি একই সঙ্গে জওহরলাল নেহেরুর নিকট আত্মীয় (গ্রান্ড নিস) ও ইন্দিরা গান্ধীর দূর সম্পর্কের আত্মীয়। আমি সেহগল ও কুইলিয়ামকে প্রচন্ড শ্রদ্ধা করি, কিন্তু মানুষ তাদের বিশ্বাস করে না। এমনকি বামপন্থীরাও তাদের ঘৃণা করে। বেশিরভাগই বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে কথা বলতে চান না। এগুলোকে রাজনৈতিক গণহত্যা বলে ভুলে যেতে চান। কিন্তু ঢাকা ও লন্ডনের এসব আন্দোলন থেকে এটা স্পষ্ট যে সন্ত্রাস কখনও ভোলা যায় না। উদারপন্থীদেরও এবার কোনো একটি পথ বেছে নেওয়ার সময় এসেছে। তারা ভুল কোনো পথ বেছে নেবে না, এটাই আমাদের আশা।