সাক্ষাৎকার

কলকাতার পাবলিশার বইমেলায় অংশগ্রহণ করুক : আরিফ হোসেন ছোটন

লেখক-প্রকাশক-পাঠকের প্রাণের মেলা অমর একুশে বইমেলা। বাংলা একাডেমি মেলার আয়োজন করলেও মেলা সফল করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন প্রকাশকেরা। সেই প্রকাশকদের সংগঠন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস) সভাপতি আরিফ হোসেন ছোটনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুজাহিদ বিল্লাহ।

মুজাহিদ বিল্লাহ: আমরা মাসব্যাপী এই মেলার প্রায় শেষ দিকে চলে এসেছি। কেমন হলো এবারের বইমেলা? 

আরিফ হোসেন ছোটন: করোনার কারণে গত দুই বছর বইমেলায় উৎসবমুখর পরিবেশ ছিলো না। ফলে  আমরা ভেবেছিলাম এবার অমর একুশে বইমেলা উৎসবমুখর হবে। মেলা সফল হবে। কিন্তু যেহেতু কাগজের দাম বেড়েছে, এর প্রভাব বইয়ে পড়েছে। বইয়ের মূল্য বেড়েছে। প্রকাশকরা যে পরিমাণ বই প্রকাশ করার কথা ভেবেছিলেন কাগজের দাম বাড়ার ফলে তারা সে পরিমাণ বই প্রকাশ করতে পারেননি। অনেক লেখকও এবার পা-ুলিপি দেননি। আশা করছি সামনের বছর, আমরা যেসব প্রস্তাবনা সরকারকে দিয়েছি, সরকার যদি সেগুলো থেকে দু’একটা প্রস্তাবনা মেনে নেয় তাহলে কাজগের দাম এরকম থাকবে না। দাম একটা বড় সমস্যা।

মুজাহিদ বিল্লাহ:প্রকাশকরা কেন একুশে বইমেলা আয়োজন করতে পারছে না?

আরিফ হোসেন ছোটন: গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমরা কিন্তু প্রথম থেকেই বাংলা একাডেমিকে বলেছি- এটা আমাদের কাজ, প্রকাশকদের কাজ। একসময় অমর একুশে বইমেলায় কিন্তু প্রকাশকদের অংশগ্রহণ ছিলো না। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, সংস্কৃতি মন্ত্রী, সচিব উনারাই অংশগ্রহণ করতেন যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মেলা উদ্বোধন করতেন। ২০১৫ সাল থেকে আমরা বলে আসছি- এটা আমাদের কাজ। আমাদের অবশ্যই প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। ২০১৭ সাল থেকে প্রকাশকদের সভাপতি যারা আছেন তারা মেলার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন, বক্তব্য রাখছেন যা এখনো বিদ্যমান। আমরা আরেকটা কথা বলেছি। সরকার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব দেবে প্রকাশকদের। প্রকাশকরা বাংলা একাডেমির অনুমতি সাপেক্ষে বইমেলার আয়োজন করবে, কিন্তু হচ্ছে ভিন্ন। আন্তর্জাতিক বইমেলায়, ফ্রাঙ্কফুটে আমরা প্রকাশকরা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গিয়ে অংশগ্রহণ করি, বাংলা একাডেমি করে না। সেক্ষেত্রে আভ্যন্তরীণ বইমেলায় আমরা কেন অংশীদার নই- সেটা আমাদেরও প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর আমরা বাংলা একাডেমির কাছে অনেকবার চেয়েও পাইনি। 

মুজাহিদ বিল্লাহ: এ বিষয়ে আপনাদের নিজস্ব কোনো পরিকল্পনা আছে বা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন কিনা? 

আরিফ হোসেন ছোটন: এবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে স্টল পরিদর্শন করছিলেন, তখন আমি বলেছি যে, আপা আমাদের একটু সময় দিন। আমরা প্রকাশকেরা আপনার ওখানে যেতে চাই, কথা বলতে চাই। এর উদ্দেশ্য কিন্তু একটাই- বইমেলাটা যেন প্রকাশককেন্দ্রীক হয়। বইমেলার আয়োজনের মূল অংশীদার আমরা হবো, বাংলা একাডেমি আমাদের সহায়তা করবে। এ বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা আছে।

মুজাহিদ বিল্লাহ: কলকাতার প্রকাশকরা অমর একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণ করতে চায়। এ বিষয়ে আপনাদের ভাবনা জানতে চাচ্ছি।

আরিফ হোসেন ছোটন: এটা আসলে পারস্পরিক সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান। এটা আমাদের সংস্কৃতির একটা অন্যতম বিষয় হওয়া উচিত। আমরা কলকাতা বইমেলায় অংশগ্রহণ করি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমরা যখন অংশগ্রহণ করলাম সেখানে আমাদের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীও গিয়েছিলেন। আমরাও চাই বিদেশীরা আমাদের বইমেলায় অংশগ্রহণ করুক। সেক্ষেত্রে বই বাংলাদেশে আসা এবং বিক্রি হওয়ার ব্যাপারে একটা নিয়ম রয়েছে। এ জন্য সরকারিভাবে কিছু কাজ করার আছে। আমরা প্রস্তাবনা দিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে। কলকাতার পাবলিশারদের আগ্রহের বিষয়টি আমরা সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীকে জানিয়েছি। এটা যদি হয়, অবশ্যই আমরা চাই কলকাতার পাবলিশার আমাদের বাংলাদেশে আসুক, বইমেলায় অংশগ্রহণ করুক। মানুষ যেন ভালো বই পায়। বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়- এটাই আমাদের ইচ্ছা।

মুজাহিদ বিল্লাহ: আপনি নিজেও যদি লক্ষ্য করেন দেখবেন, আমাদের দেশে শিশুকিশোরদের বইয়ের মান সন্তোষজনক নয়। 

আরিফ হোসেন ছোটন: এটা প্রকাশকদের মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। প্রকাশক শিশুদের জন্য বই যখন প্রকাশ করে তখন তার ব্যবসার দিকে নজর থাকে। শিশুদের বইয়ের ক্রেতার সংখ্যা তুলনামূলক কম। আপনি দেখবেন শিশুদের জন্য বাইরে থেকে যে বইগুলো আসে সেগুলোর ক্রেতার সংখ্যা অনেক বেশি। আমাদের দেশের প্রকাশকরা শিশুদের জন্য যেসব বই প্রকাশ করে সে বইগুলো তেমন বিক্রি হয় না। ফলে এ দিকটায় আমাদের প্রকাশকদের ফোকাস তুলনামূলক কম। 

মুজাহিদ বিল্লাহ: মেলায় ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি হয়। মেলার বাইরেও বিষয়টি এমন দাঁড়িয়ে গেছে যে, বই কিনলে কমিশন পাওয়া যায়- এই ব্যাপারটি কীভাবে দেখেন?

আরিফ হোসেন ছোটন: অনেক সাংবাদিক আমাদের প্রশ্নটা করে। আসলে ক্রেতা যখন বই কিনতে আসে তখন বইটা দেখার পর বলে- ভাই ২০ টাকা কম নেন। অনেকে আবার বলে, আমি আপনার কাছ থেকে পাঁচটা বই নিলাম কিছু কম নেন। তারা যখন একটা বই কেনার পর হাসি মুখে বলে যে, ছাড় দেন। তখন আমরা আসলে ছাড়টা এভাবেই দেই। এটা তো আর নিয়মের বাইরে দেওয়া যায় না। আমরা আসলে এভাবেই ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ ছাড় রাখি ক্রেতাদের জন্য। এটা ব্যবসায়িক পলিসি বলতে পারেন। এটা বড় ধরনের কোনো শুভঙ্করের ফাঁকি বলে আমি মনে করি না। 

মুজাহিদ বিল্লাহ: বইয়ের মান বাড়াতে এবং দেশের বই সমৃদ্ধ করতে প্রকাশকদের কী পরামর্শ দেবেন?

আরিফ হোসেন ছোটন: আসলে প্রকাশকেরাই আমাকে পরামর্শ দেয়- সভাপতি সাহেব এই কাজগুলো করলে ভালো হয়। সেক্ষেত্রে আমি কি পরামর্শ দেব? আমি একটা জিনিস মাথায় রাখি যে, এবার যে বইগুলো বের হচ্ছে, আগামী বছর যে বইগুলো বের হবে, শেষ পর্যন্ত তারা যেন মান বাড়ানোর চেষ্টা করে। এক সময় আমাদের পুরো ট্রেন্ড নিয়ন্ত্রণহীন ছিল। দিনদিন এটা ঠিক হচ্ছে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ পথ চলার কারণে, আমরা প্রকাশকরা এক থাকার কারণে অনেক কিছুতেই আমরা এগিয়ে যেতে পারছি। একটা ব্যাপার জানি যে, প্রকাশক যদি মানসম্মত না হয়, তাহলে তারা মানসম্মত বই বের করতে পারবে না। ফলে আমরা প্রকাশকদের লাইসেন্স দেয়ার ব্যাপারে খুব হিসাব করে দিচ্ছি। যোগ্যদের লাইসেন্স দিচ্ছি। আমরা নতুন প্রকাশকদের এখন উৎসাহ দিচ্ছি না বই বের করার জন্য। আমরা চাই যারা আছে তারা বইয়ের মান আরো ভালো করুক। তাদের দেখে নতুন প্রকাশকরা অনুপ্রাণিত হোক।