লতিফুল ইসলাম শিবলী জনপ্রিয় গীতিকার এবং কথাশিল্পী। বর্তমানে কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ‘জাতীয় কবি’ ঘোষণা করে সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রস্তাব করেন। এরপর ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর সরকার এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নসহ দায়িত্ব গ্রহণের পর তার আরো কিছু কাজ তো বটেই, এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে লতিফুল ইসলাম শিবলীর জনপ্রিয় গানগুলোর নেপথ্যকথা। কথোপকথনে ছিলেন স্বরলিপি।
রাইজিংবিডি: নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের পর আপনার কোন উদ্যোগটিকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বলে মনে করেন?
লতিফুল ইসলাম শিবলী: নজরুলের সাহিত্য ‘Quintessence of Nazrul’ নামে অনুবাদ করা হয়েছে। আপনি জানেন, আমরা বিশ্বসাহিত্যগুলো ইংরেজি থেকেই বেশি পাই। আমি বলব, অনুবাদের নব্বই শতাংশ কাজ হয় ইংরেজি থেকে। অন্য ভাষাভাষীর কাছে পৌঁছাতে হলে আমাদের গেটওয়ে আসলে ইংরেজি। আমার হাতে যদি নজরুল সাহিত্যের ইংরেজি সংস্করণ থাকত, তখন আমার কাজ হতো সেটিকে ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করানো। তখন হয়তো আমরা আলিয়াঁস ফ্রঁসেজ-এর সঙ্গে কথা বলতাম। আমরা অন্যান্য প্রধান দশটি ভাষায় এটি পৌঁছে দিতাম। তাদের সঙ্গে আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে যোগাযোগ করতাম।
সেই কাজটি এখন শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে নজরুল সাহিত্যের বিশ্বযাত্রা শুরু হলো। আমরা এখন এই অনুবাদ নিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার কাছেও যাব। এদিক থেকে এই প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি একটি বড় কাজ ও উদ্যোগ। অন্যান্য ভাষায় যাওয়া এখন আমাদের জন্য খুবই সহজ হয়ে গেছে। বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের যে হাইকমিশন রয়েছে, তাদের মাধ্যমে এই কাজ দ্রুত করা সম্ভব। আবার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের যে হাইকমিশন আছে, তাদের মাধ্যমেও আমরা এই কাজটি করতে পারব।
রাইজিংবিডি: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নজরুলকে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগের কথা বললেন। সারাদেশে নজরুলকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
লতিফুল ইসলাম শিবলী: আমাদের নিয়মিত উদ্যোগ তো আছেই। আমরা জেলা ধরে ধরে কাজ করছি। বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করছি। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এখন আমাদের আরেকটি বড় কাজ হচ্ছে— কীভাবে পাঠ্যপুস্তকে নজরুলকে আরও বেশি করে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। কারণ, বিগত সময়ে নজরুলকে অনেক সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। নজরুলের যে দ্রোহ ও চেতনা, তা যে কোনো স্বৈরশাসকের জন্য বিপদের কারণ। সেই কারণে কাজী নজরুলকে অনেকটা উপেক্ষা করা হয়েছে। উপেক্ষার মাত্রা এমন ছিল যে, নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবেও গেজেটভুক্ত করতে চায়নি। আমরা সেটি করেছি। এখন আমাদের কাজ হলো কীভাবে নজরুলের সাহিত্যচর্চা আরও বিস্তৃত করা যায়, সেই ব্যবস্থা করা।
রাইজিংবিডি: কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে পাওয়ার বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
লতিফুল ইসলাম শিবলী: দেশ ও জাতি হিসেবে আমরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে আমরা নজরুলের মতো একজন কবিকে এই বাংলায়, অর্থাৎ বাংলা ভাষায় পেয়েছি। বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য এটি বিশাল আশীর্বাদ। এই অঞ্চলে এমন বিশ্বমানের একজন কবির জন্ম হয়েছিল এবং তিনি বাংলায় লেখালেখি করেছেন। বাংলাদেশিদের জন্যও এটি সৌভাগ্যের যে আমরা তাকে জাতীয় কবি হিসেবে নিজের করে নিয়েছি। তবে পাশাপাশি আমরা দুর্ভাগ্যবান যে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দিতে দেরি করেছি। এটি আমাদের হীনমন্যতার একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে—যে আমরা তাকে জাতীয় কবি বলেছি, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করিনি। আমি সৌভাগ্যবান যে, আমার হাত ধরে কাজটি হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে গেজেটভূক্ত করেছি, আমি হয়তো সারা জীবন এটি নিয়ে গর্ব করব।
রাইজিংবিডি: এবার আপনার গানের কথায় আসি। গীতিকার হিসেবে জনপ্রিয় হওয়া বেশ কঠিন। আপনি গীতিকার হিসেবে জনপ্রিয়। অনেক জনপ্রিয় গানের মধ্যে ‘তুমি আমার প্রথম সকাল’ গানটি একটু ভিন্ন। এই গানটি কোন প্রেক্ষাপটে লেখা হয়েছিল?
লতিফুল ইসলাম শিবলী: আমি মনে করি ভালোবাসা আসলে স্পিরিচুয়াল। যারা অনর্গল লেখেন, তারা জানেন—প্রত্যেকেরই একজন ‘তুমি’ থাকে। দিন শেষে আমরা সেই ‘তুমি’র কাছেই সমর্পিত হই। সেটা স্পিরিচুয়ালি হতে পারে, মহান স্রষ্টার কাছে হতে পারে, মানুষের কাছেও হতে পারে। কারও কাছে সেটা মূর্তি হতে পারে, কারও কাছে টাকা-পয়সা হতে পারে।
‘তুমি আমার প্রথম সকাল’ গানটির ‘তুমি’ কোনো নির্দিষ্ট কাউকে ভেবে লেখা নয়। ‘হাসতে দেখো, গাইতে দেখো, অনেক কথায় মুখর আমায় দেখো— দেখো না কেউ হাসির শেষে নীরবতা’— এই যে আকুতি, এটি আসলে প্রতিটি মানুষের জীবনেরই একটি আকুতি। যে কবি বা গীতিকবি এই আকুতিকে যত বেশি স্পর্শ করতে পারেন, তার গান বা গীতিকবিতা তত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। সহজ ভাষায় কে কত সহজভাবে এই আকুতিটা প্রকাশ করতে পারল—সেটাই মূল বিষয়। হয়তো আমার সৌভাগ্য যে আমি কিছু বিষয় সহজভাবে প্রকাশ করতে পেরেছি। ফলে হয়তো আমার গানগুলো মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
‘তুমি আমার প্রথম সকাল’ গানটিতে সুর করেছেন আশিকুজ্জামান টুলু। এই গানটি আসলে আমার ঘরানার বাইরে। কারণ, আমি গানের জন্য গান লিখতাম না। গানের যে নির্দিষ্ট ফরম্যাট আছে, আমি তা কখনো মানিনি। আমি সরাসরি কবিতার মতো করে লিখতাম। পরে সুরকাররা সেই কবিতায় সুর দিয়েছেন—তখন সেটি গীতিকবিতা হয়ে গেছে। এ জন্য গীতিকবি ও গীতিকারের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে। গীতিকবিরা মূলত কবিতা লেখেন, যেগুলোকে পরে সুরকাররা গান করে তোলেন।
রাইজিংবিডি: জেমসের কণ্ঠে ‘জেল থেকে বলছি’ গানটি জনপ্রিয়তা পায়। জেমসের সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে? গানটি কীভাবে তার কাছে পৌঁছালো?
লতিফুল ইসলাম শিবলী: ‘জেল থেকে বলছি’ গানটি নব্বইয়ের দশকের গণঅভ্যুত্থানের সময়ের। এই শব্দগুলো প্রথম আমি দেয়ালে লিখেছিলাম। তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে পড়ি। কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাহিত্য সম্পাদক পদে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন নাটোর সরকারি কলেজে পড়ি। সময়টা ছিল খুব উত্তাল। একদিন সন্ধ্যায় পুলিশ এসে আমাদের প্যানেলের সবাইকে ধরে নিয়ে গেল। আমি তখন বাইরে ছিলাম। তখন শুরু করলাম দেয়াললিখন। ‘জেল থেকে বলছি’—এই শব্দগুলোও প্রথম দেয়ালে লিখেছিলাম। পরে ঢাকায় এলাম। একদিন দুপুরে মনে হলো—এই সুন্দর পৃথিবীতে আমি বেঁচে আছি, কিন্তু এমন একজন মানুষ আছে যে জানে কালই সে মারা যাবে। তিনি হতে পারেন ক্যানসার রোগী কিংবা জেলের বন্দি। সেই ভাবনা থেকেই গানটি লিখে ফেললাম। পরে গানটি জেমসের হাতে পৌঁছায়।
আমি জেমসকে চিনতামও না। অনেকটা নাটকীয়ভাবেই গানটি তার কাছে পৌঁছে যায়। আমার এক বন্ধু এটি জেমসের কাছে দেয়। গ্রীন রোডে হক হোটেল আছে—সেখানে আমি আড্ডা দিতাম। আড্ডা দিতে দিতে টেবিল বাজিয়ে গানটি গাইতাম। আমার বন্ধু শহীদ মাহমুদ, যিনি জেমসের সঙ্গে ড্রাম বাজাতেন এবং নিজেও গান করেন, তার পরিকল্পনা ছিল নিজের অ্যালবামের জন্য গানটি রাখা। একদিন তিনি গানটি নিয়ে জেমসের কাছে গিয়ে বললেন, ‘এটা একটু কম্পোজ করে দেন।’ জেমস লিরিক দেখে বললেন, ‘এটা তোমার গাওয়ার দরকার নেই, আমি গাইব।’ এরপর তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। পরে আমাদের দেখা হলো এবং আমি তাকে গানটি গাওয়ার অনুমতি দিলাম।
রাইজিংবিডি: নতুন কোনো গান লিখেছেন?
লতিফুল ইসলাম শিবলী: আমি ‘সোলজার’ সিনেমার টাইটেল সং লিখেছি।
রাইজিংবিডি: এখন লেখালেখি কেমন চলছে?
লতিফুল ইসলাম শিবলী: আমি এই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন আর লেখার সময় পাচ্ছি না।