সাক্ষাৎকার

শিক্ষা হতে হবে উৎপাদনমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও গণমুখী: ঢাবি উপাচার্য

চলতি বছর ১৭ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম। এর আগে তিনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সোলার সেল ও সোলার এনার্জি নিয়ে করেছেন উচ্চতর গবেষণা। এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তার শিক্ষা ভাবনা, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে পরিকল্পনার কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাইজিংবিডির ক্যাম্পাস ইনচার্জ জান্নাতুল ফেরদৌস রীতা।

রাইজিংবিডি: স্যার, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং আচার্যের নিয়োগের মাধ্যমে আপনি ১৭ মার্চ থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথমেই যে বিষয়টি জানতে চাচ্ছি— উপাচার্য হিসেবে আপনার নেতৃত্বের মূল দর্শন কী হবে?

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: উপাচার্যের দায়িত্ব একক নয়—এটি টিমওয়ার্ক। এখানে আমি টিমের প্রধান হিসেবে কাজ করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী—সবাই মিলে একটি দল। এই দলের নেতৃত্ব দেওয়া আমার দায়িত্ব। আমার মূল লক্ষ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়কে বর্তমান অবস্থান থেকে আরও মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যাওয়া। এজন্য বিভিন্ন সূচকে—যেমন কিউএস র‌্যাংকিংয়ের প্যারামিটারগুলো—ধাপে ধাপে উন্নয়ন করতে হবে।

আমার ব্যক্তিগত দর্শন খুব সরল: ন্যায়নীতি মেনে চলা, নিয়ম অনুসরণ করা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা। ব্যক্তি নয়, আইনকে গুরুত্ব দেওয়া। আমি বিশ্বাস করি, এই মূল্যবোধগুলো মেনে চললে কাজ করা কঠিন হবে না এবং অন্যরাও তা অনুসরণ করবে। দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করলে ব্যর্থ হওয়ার কারণ দেখি না। তবে বাস্তবতা হলো—৪০ হাজার শিক্ষার্থীর মন জয় করা সহজ নয়।

রাইজিংবিডি: আপনি গবেষণার প্রতি আগ্রহ থেকেই পিএইচডির পরও জার্মানি, ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসে পোস্টডক করেছেন। সোলার সেল ও সোলার এনার্জি নিয়ে কাজ করেছেন। শিক্ষকতা এবং গবেষণার কোন বিষয়গুলো আপনাকে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে?

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: শুরু থেকেই আমার লক্ষ্য ছিল শিক্ষকতা ও গবেষণায় আসা। মানুষের জীবনে যেমন একটি লক্ষ্য থাকে, আমার ক্ষেত্রেও সেটাই ছিল। শিক্ষকতা আমার ভালো লাগে, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করতে। আমি কতটা ভালো শিক্ষক—সেটা শিক্ষার্থীরাই ভালো বলতে পারবে, তবে তাদের কাছে কিছুটা হলেও জনপ্রিয়তা আছে বলে মনে করি। গবেষণার প্রতি আগ্রহ থেকেই পিএইচডির পরও আমি জার্মানি, ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসে পোস্টডক করেছি। এছাড়া ভারত, নেপাল, ইতালি ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশে গবেষণার কাজে গিয়েছি। আমি মূলত সোলার সেল ও সোলার এনার্জি নিয়ে কাজ করি, আর এ কাজটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে।

ক্লাসরুমে গিয়ে যখন দেখি শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলো আগ্রহ নিয়ে গ্রহণ করছে— ভালো লাগে। শিক্ষার্থীদের মন জয় করা সহজ নয়। অনেক শিক্ষকই আছেন, কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া সৌভাগ্যের বিষয়। তারা যখন বলে, “স্যারের কাছে গেলে সমস্যার সমাধান হয়”—তখন সেটি সত্যিই অনুপ্রেরণা জোগায়। আমি কিছুটা কঠোর স্বভাবের শিক্ষক হলেও, শিক্ষার্থীরা বিশ্বাস করে যে আমার কাছে গেলে সমাধান পাওয়া যাবে—এটাই আমার ভালো লাগে।

একজন শিক্ষক হিসেবে এই জনপ্রিয়তা ধরে রাখাও এক ধরনের চাপ। তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছি তা দলমত নির্বিশেষে। আমি কোনো বিভাজনে বিশ্বাস করি না; সবার কাছেই সমানভাবে একজন শিক্ষক হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পেরেছি। এমনও হয়েছে, ভিন্নমতের শিক্ষার্থীরাও আমার কাছে এসে একই ধরনের সম্মান ও সহযোগিতা পেয়েছে।

গবেষণার ক্ষেত্রেও একইভাবে তৃপ্তি কাজ করে। যখন ভালো গবেষণা করতে পারি, ভালো পেপার প্রকাশ হয়—তখন খুব ভালো লাগে। আমার বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থীরা—ফার্স্ট, সেকেন্ড এমনকি অন্যরাও আমার কাছে গবেষণা করতে এসেছে, যা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তবে সময়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে একসময় কিছু শিক্ষার্থী হয়তো ভেবেছে, আমার কাছে কাজ করলে চাকরির ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারে। এই ভয় ও বৈষম্যের আশঙ্কা অনেককে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এতে কিছুটা কষ্ট পেয়েছি, কারণ এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ক্ষতি হয়েছে। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, শুধু চাকরির চিন্তা থেকে নয়, জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্যই গবেষণায় আসা উচিত।

রাইজিংবিডি: আপনি শুরু থেকেই শিক্ষকতা ও গবেষণায় আসার কথা বলেছেন। কিন্তু যেহেতু বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার এত সুযোগ পেয়েছেন, চাইলে সেখানে স্থায়ীভাবে ভালো ক্যারিয়ার গড়তে পারতেন। আপনি দেশে ফেরার কথা ভাবলেন কেন? 

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: এখন ফিরে তাকিয়ে বিষয়টা বলতে হয়। ১৯৯৯ সালে পিএইচডি শেষে যখন জাপান থেকে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন আমার জাপানি সুপারভাইজার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—“তুমি ফিরে যাচ্ছ কেন?” তিনি বলেছিলেন, আমি পরিশ্রমী, ভাষাজ্ঞান ভালো, জাপানিজ বলতে পারি, শিক্ষকতাও ভালো করি—তাই জাপানেই থেকে যেতে পারি। এমনকি তিনি বলেছিলেন, বাসা রেখে দেশে গিয়ে ছুটি কাটিয়ে আবার ফিরে এসে কাজ শুরু করতে।

কিন্তু আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম দেশে ফিরব। আমি বলেছিলাম, ‘‘দেশে হয়তো আয় কম হবে, কিন্তু নিজের দেশে কাজ করা, নিজের দেশের জন্য অবদান রাখা—এটাই আমার কাছে বড় পাওয়া।’’ তিনি যখন জানতে চাইলেন, ‘‘আমি কত বেতন পাই এবং তা দিয়ে কতদিন চলতে পারি?’’ আমি বলেছিলাম, ‘‘এক সপ্তাহও ঠিকমতো চলে না।’’ তখন তিনি অবাক হয়ে আবার জিজ্ঞেস করেন, “তাহলে কেন যাচ্ছ?” আমি বলেছিলাম, ‘‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করি—এটা আমার দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। এই জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়াটা আমার কাছে সম্ভব না।’’ তখন তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “তুমি তাহলে গ্রেট ম্যান হবে।” আমি বলেছিলাম, ‘‘গ্রেট ম্যান কি না জানি না, তবে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সুযোগটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন।’’

পরে জার্মানিতে গবেষণার সময়ও একই ধরনের প্রস্তাব পেয়েছি। সেখানকার অধ্যাপকও বলেছিলেন, সেখানে থেকে যেতে বা পরে খারাপ লাগলে আবার ফিরে যেতে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা থেকেও ২০০৮ সালে আমি অফার পেয়েছিলাম—ডলারভিত্তিক আকর্ষণীয় বেতনে, এইচ-১বি ভিসাসহ, যা থেকে দ্রুত গ্রিন কার্ড পাওয়ার সুযোগ ছিল। তবুও আমি যাইনি। কারণ আমি বুঝেছিলাম, সেখানে গেলে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার একটি টান তৈরি হবে।

শেষ পর্যন্ত আমি ভাবলাম, নিজের দেশে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো, স্বাধীনভাবে কথা বলা এবং নিজের শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে দেশকে সেবা দেওয়াটাই বেশি মূল্যবান। অন্য দেশের জন্য কাজ করার চেয়ে নিজের দেশের জন্য কাজ করাকে আমি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। সেই বিশ্বাস থেকেই আমি দেশে থেকে গেছি এবং নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আজও সেই অবস্থান থেকে সরে আসিনি।

রাইজিংবিডি: শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন নানা পরিবর্তন ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। আপনার মতে, এই খাতকে আরও কীভাবে প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর করা যায়?

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: বিষয়টি নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন, কারণ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা নিয়ে কাজ করছি। আমাদের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু নেতিবাচক দিক আছে। গত প্রায় ১৭ বছরে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে আমরা ধরে নিয়েছিলাম—শুধু জিপিএ-৫ পেলেই চলবে, কিন্তু বাস্তব জ্ঞান অর্জন জরুরি নয়। ভুলে ভরা বই পড়া, ভুল লিখেও নম্বর পাওয়া, সবাইকে পাস করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা—এসব আমাদের শিক্ষার মানকে দুর্বল করেছে। ফলে অনেক অভিভাবকের মধ্যে বাংলা মাধ্যমের বাইরে ইংরেজি মাধ্যমে সন্তানদের পড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে, তবে এটিই যথেষ্ট নয়। আমাদের শিক্ষা হতে হবে উৎপাদনমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও গণমুখী—যা বেকারত্ব কমাতে সাহায্য করবে। শুধু পুঁথিগত জ্ঞান নয়, দক্ষতা উন্নয়নভিত্তিক শিক্ষা প্রয়োজন। সবাই চাকরি করবে—এমন নয়; অনেকেই উদ্যোক্তা হবে। তাই কর্মমুখী শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি।

আরেকটি বড় বিষয় হলো বাজেট। উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫-৬% ব্যয় করা হয়, সেখানে আমাদের দেশে তা ২% এরও কম। এই সীমিত বাজেটে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। একইসঙ্গে শিক্ষকতা পেশাকে মর্যাদাপূর্ণ করতে হবে। যদি যোগ্য ও মেধাবী মানুষ শিক্ষকতায় না আসে, তাহলে মানসম্মত শিক্ষা সম্ভব নয়। বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে অন্য কোথাও সুযোগ না পেয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীরাই শিক্ষকতায় আসছে—এটি পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাথমিক শিক্ষা। একটি ভবনের মতো—ভীত যত মজবুত হবে, কাঠামো তত টেকসই হবে। প্রাথমিক স্তর শক্তিশালী না হলে উচ্চশিক্ষায় ভালো শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে না। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, সেখান থেকে কলেজ—এই ধারাবাহিকতায় ভালো শিক্ষার্থী তৈরি হয়।

এখানে দায়িত্ববোধের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়, এটি দায়িত্ব। নির্দিষ্ট সময় পার করলেই দায়িত্ব শেষ—এমন মানসিকতা থাকলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের নিজের সম্পদ হিসেবে ভাবতে হবে। তারা-ই ভবিষ্যতে দেশ গড়বে। তাই শিক্ষককে দায়িত্বশীল হতে হবে, আর রাষ্ট্রকে সেই শিক্ষককে সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। এই জায়গাগুলো যদি আমরা ঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারি, তবেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা টেকসই ও কার্যকর হবে।

রাইজিংবিডি: আপনি কর্মমুখী শিক্ষার কথা বললেন। এ ধরনের শিক্ষা বাস্তবায়নে আপনার পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে কী?

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: কর্মমুখী শিক্ষার মূল পরিকল্পনা নেওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের। সরকারকেই এ বিষয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমার অবস্থান থেকে আমি যা করতে পারি, তা হলো—শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত সুবিধা পাচ্ছে কি না, তাদের পাশে দাঁড়ানো যাচ্ছে কি না, এবং পরিবেশটি শিক্ষক-শিক্ষার্থী বান্ধব কি না—এসব নিশ্চিত করা। তবে কর্মমুখী শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য কারিকুলাম পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় পর্যায়ে কারিকুলামে বড় পরিবর্তন আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আমরা আমাদের সীমার মধ্যে কারিকুলাম আপডেট করতে পারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ৩-৪ বছর পরপর কারিকুলাম পরিবর্তন করা হয়—যুগের চাহিদা ও ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে। শিক্ষার্থীরা যা শিখছে, তা যেন বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারে—সেই দিকটি মাথায় রেখেই এসব পরিবর্তন করা হয়।

আমাদের চেষ্টা থাকে, দেশের প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গেও তাল মিলিয়ে চলা। উন্নত বিশ্বের কারিকুলামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা আমাদের কারিকুলাম সাজানোর চেষ্টা করি। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা তাদের নিজস্ব বিষয়, তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামকে আমরা মোটামুটি মানসম্মত এবং সময়োপযোগী বলতেই পারি।

রাইজিংবিডি: আপনি নিজে গবেষণামুখী মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মান আরও কীভাবে উন্নত করা যায়? আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা কীভাবে বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন?

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলার পর এখন উচ্চশিক্ষার প্রসঙ্গে আসি। এখানে প্রথমেই বলতে চাই—শিক্ষকদের মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা খুব বেশি আর্থিক সুবিধা চাই না, তবে সম্মান ও মর্যাদা চাই। যখন সেই জায়গাটি ক্ষুণ্ন হয়, তখন কষ্ট লাগে। বিশ্ববিদ্যালয় যে বাজেট পায়, তার বড় একটি অংশ—প্রায় ৮৪ শতাংশ—শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়ে যায়। বাকি অংশ দিয়ে অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও বিভাগীয় খরচ মেটাতে হয়। ফলে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না। অথচ গবেষণা শুধু চিন্তায় সীমাবদ্ধ নয়—এর জন্য প্রয়োজন যন্ত্রপাতি, ল্যাব সুবিধা ও সার্বিক সাপোর্ট। এসব ছাড়া গবেষণা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

এই বাস্তবতা থেকে আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগের চেষ্টা করছি। একাডেমিকভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি—পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার চিন্তা রয়েছে। লক্ষ্য হলো, শুধু সরকারি বাজেটের ওপর নির্ভরশীল না থেকে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়ানো, গবেষণার জন্য আলাদা বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ জোরদার করা। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, গবেষণায় উৎসাহ দেওয়া এবং ফান্ড সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে তারা গবেষণায় আরও মনোযোগী হবেন এবং বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

রাইজিংবিডি: প্রায়ই দেখা যায়, নতুন উপাচার্যদের নিয়ে শুরুতে অনেক প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয় না এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততাও কমে যায়। আপনার মতে, এই বিচ্যুতি কীভাবে এড়ানো সম্ভব?

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: এটি সত্যিই কঠিন একটি প্রশ্ন। তবে আমি সংক্ষেপে বলব—যদি আমি পক্ষপাতদুষ্ট না হই, ব্যক্তিগত স্বার্থ বিবেচনা না করি এবং কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চিন্তা না করি, তাহলে এই সমস্যাগুলো এড়ানো সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনের মধ্যে থেকে চলা। কে খুশি হলো বা কে অখুশি হলো—এটা মুখ্য নয়। নিয়ম ও নীতিমালা মেনে চলাটাই আসল বিষয়। যখনই নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তখনই বিচ্যুতি ঘটে। সোজা কথায়, নিয়মের বাইরে গেলেই সমস্যা তৈরি হয়—এটাই মূল কথা।

রাইজিংবিডি: বৈশ্বিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়া এবং র‌্যাংকিং উন্নত করার জন্য আপনি বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলেছেন। এর বাইরে আর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন?

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: শিক্ষক হিসেবে আমি এর আগে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছি—সিনেট মেম্বার, শিক্ষক সমিতির সদস্য, বিভাগীয় চেয়ারম্যান—সব জায়গাতেই শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও বিভাগগুলো আধুনিকতার দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে আছে। আমরা প্রযুক্তির যুগে থাকলেও সেই মানের সুবিধা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি। হলগুলোতে ডাইনিং, ক্যান্টিন, রিডিং রুম, মসজিদসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা উন্নত করতে হবে। একইভাবে লাইব্রেরি, সেমিনার ও গবেষণাগারগুলো আধুনিকায়ন করা জরুরি। গবেষণাগারগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে পারলে এবং গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মান উন্নত হবে। এখানে একাধিক সূচক কাজ করে—সবগুলো ক্ষেত্রেই সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন।

আমাদের একটি বড় শক্তি হলো ভর্তি পরীক্ষার স্বচ্ছতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া সবসময়ই নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়েছে—এটি আমাদের গর্বের জায়গা। এখন অন্যান্য ক্ষেত্রেও একই মান বজায় রাখতে পারলে উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু টিচিং ইউনিভার্সিটি হিসেবে রাখলে চলবে না; শিক্ষা ও গবেষণা—দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তবে গবেষণায় আরও বেশি জোর দিলে আমরা বৈশ্বিকভাবে এগিয়ে যেতে পারব।

রাইজিংবিডি: শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে এবং ক্যাম্পাসে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: এ বিষয়ে আমরা নতুন প্রো-ভিসির সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করব। পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত হলে বিস্তারিতভাবে জানানো যাবে—কীভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়ানো হবে এবং কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বর্তমানে হলগুলোতে পর্যাপ্ত ইন্টারনেট সুবিধা, উন্নত আবাসিক ব্যবস্থা কিংবা বিভাগগুলোকে আরও উন্মুক্ত করার বিষয়গুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব সুবিধা স্বাভাবিক বিষয়। আমাদের শিক্ষার্থীরা এখনো সেই মানের সুযোগ পুরোপুরি পাচ্ছে না। প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের অংশ হিসেবে ডাইনিং ও ক্যান্টিনে স্মার্ট কিচেন চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করা যায়। এসব বিষয় আমাদের ভাবনায় আছে। পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি হলে বিষয়গুলো আরও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হবে।

রাইজিংবিডি: কো-কারিকুলার কার্যক্রম প্রসঙ্গে জানতে চাই, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আপনি কীভাবে দেখেন?

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: এই বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রিমিয়ার প্রতিষ্ঠান। এর অবদান অনন্য। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়েও (২০২৪) এর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পৃক্ততা রয়েছে। বলা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার ধারা ভিন্ন হতে পারত। তাই সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এক অর্থে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

রাইজিংবিডি: বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লাইব্রেরিতে বিসিএসকেন্দ্রিক পড়াশোনার প্রবণতা বেড়েছে। কেন এমন হচ্ছে?

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: এটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন এবং বিষয়টি আমাকে ভাবায়। আমি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করছি এবং বিভিন্ন চাকরির ইন্টারভিউ বোর্ডেও অংশ নিয়েছি। সেখানে দেখেছি—কৃষি, প্রকৌশল বা মেডিকেল—যে ক্ষেত্রের শিক্ষার্থীই হোক না কেন, অনেকেই প্রশাসন, পুলিশ বা ট্যাক্স ক্যাডারকে প্রথম পছন্দ দিচ্ছে। এর কারণ হলো—যেসব ক্যাডারে ক্ষমতা বা প্রভাব বেশি বলে মনে করা হয়, সেগুলোর প্রতি আকর্ষণ বেশি। ফলে পেশাভিত্তিক ক্যারিয়ার, যেমন শিক্ষকতা বা নিজ নিজ বিষয়ে কাজ করার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এর পেছনে বড় কারণ হলো বৈষম্য—একজন শিক্ষক সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়েও যে মর্যাদা বা সুযোগ পান, তা অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ক্যাডারের তুলনায় কম।

এই বৈষম্য দূর না হলে দক্ষ মানুষ নিজ নিজ পেশায় থাকবে না। সবাই প্রশাসনিক দিকে ঝুঁকবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ক্ষতিকর। আমি সবসময় স্কিল ডেভেলপমেন্টের কথা বলি। কিন্তু যদি দক্ষ মানুষ তার নিজস্ব ক্ষেত্রে কাজ না করে, তাহলে সেই দক্ষতার সঠিক ব্যবহার হবে না। এটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়; রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এগিয়ে আসতে হবে। আমি আমার জায়গা থেকে বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট মহলে তুলে ধরার চেষ্টা করি এবং ভবিষ্যতেও করব।

রাইজিংবিডি: শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং নৈতিকতার অবক্ষয়—এসব বিষয় এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি কীভাবে উন্নত করা সম্ভব?

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: সমাজ একদিনে পরিবর্তন করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা—পাবলিক অ্যাওয়ারনেস। নৈতিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেকটাই অনুপস্থিত। জাপানে আমি দেখেছি, ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয়—কীভাবে অন্যকে সম্মান করতে হয়, কীভাবে মতামতকে মূল্য দিতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এই চর্চা কমে গেছে। ফলে সহনশীলতা কমেছে, স্বার্থপরতা বেড়েছে।

আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা করি না—অর্ধেক ভরা গ্লাস না দেখে অর্ধেক খালি অংশটাই বেশি দেখি। পরিশ্রম ছাড়াই ফল পাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, যোগ্য মানুষ আত্মসম্মান নিয়ে চলে, কিন্তু অযোগ্যরা তদবিরের দিকে ঝোঁকে—এটি সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

নিয়ম মানার সংস্কৃতিও দুর্বল। আমরা অনেক সময় নিজের সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙি। অথচ যেখানে কঠোরতা আছে, যেমন ক্যান্টনমেন্টে—সেখানে সবাই নিয়ম মেনে চলে। এর মানে, আমাদের মধ্যে আইন ও শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে ওঠেনি। আমি বিশ্বাস করি, যা অর্জন করব, তা নিজের পরিশ্রমেই হওয়া উচিত। অন্যভাবে পাওয়া সাফল্যে প্রকৃত তৃপ্তি নেই। এই মূল্যবোধ তৈরি না হলে বিভাজন ও সংঘাত বাড়তেই থাকবে।

রাইজিংবিডি: উপাচার্যের মেয়াদ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোথায় দেখতে চান?

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের সমাজে নেতিবাচক মানসিকতা অনেক বেশি, তবে আমি ইতিবাচক থাকতে চাই। সততা, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বিশ্ববিদ্যালয়কে বর্তমান অবস্থান থেকে আরও এগিয়ে নিতে চাই। মহান আল্লাহর সহায়তা এবং সবার সহযোগিতা পেলে তা সম্ভব।

রাইজিংবিডি: ধন্যবাদ স্যার, আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য।

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।