আইন ও অপরাধ

ভয়াল সেই রাতের তিন বছর

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াল রাত। কথিত জিহাদের নামে গুলশানের কূটনৈতিক পাড়ায় আচমকা দেশী বিদেশীদের জিম্মির ঘটনা। রাতভর নৃশংসভাবে ১৭ বিদেশীসহ ২০ জনকে হত্যা। বলছি, রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার কথা। আজ ১ জুলাই, এ ঘটনার তিন বছর পূর্ণ হলো।

বলা হয়ে থাকে, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলা ছিল গুলশান হামলা। ওইদিন জঙ্গিরা রেস্তোরাঁর ভেতরে থাকা দেশি-বিদেশি সব নাগরিককে জিম্মি করে ফেলে। জিম্মিদের করতে গিয়ে নিহত হন গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাউদ্দীন আহমেদ। রাতভর জঙ্গিরা দুই পুলিশ কর্মকর্তা ছাড়াও জাপানি, ইতালি, আমেরিকান নাগরিকসহ ১৭ বিদেশী ও ৩ বাংলাদেশীকে হত্যা করে। পরদিন সকালে যৌথ বাহিনীর কমান্ডো অভিযান অপারেশন 'থান্ডারবোল্টে' হামলাকারী ৫ জঙ্গি নিহত হয়। জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জিম্মিকে।

গুলশান হামলায় তিন দিন পর ৪ জুলাই নিহত পাঁচ জঙ্গিসহ অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন  পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এই মামলার তদন্ত শেষে আদালতে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে চার্জশিট জমা দিয়েছে।

ভয়াবহ এই হামলার পর পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র-বোমা সংগ্রহ ও সমন্বয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত করে তদন্তসংস্থা। মামলা তদন্তকালে বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা, প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞের মতামত, আলামত সংগ্রহ, স্বাক্ষ্য গ্রহণ করে অপরাধীদের চিহ্নিত করা হয়। তদন্তে অস্ত্র সংগ্রহে কারা জড়িত, অস্ত্রের উৎস, অর্থের যোগানদাতা, আশ্রয়দাতা, পরিচালক সকলকে শনাক্তসহ অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করার জন্য ঘটনা সংশ্লিষ্ট আলামত সংগ্রহ করে পুলিশ।

চার্জশিট  থেকে জানা যায়, হলি আর্টিজান হামলার ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২১ জনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তারা হলেন- তামিম চৌধুরী, সরোয়ার জাহান ওরফে আব্দুর রহমান, তানভীর কাদেরী ওরফে জামসেদ, নূরুল ইসলাম মারজান, বাশারুজ্জামান চকোলেট, মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান, মেজর (অব) জাহিদুল ইসলাম, রায়হান কবির ওরফে তারেক, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিরবাস ইসলাম, মীর সামিহ মোবাশ্বের, খায়রুল ইসলাম পায়েল, শফিকুল ইসলাম উজ্জল ওরফে বিকাশ, জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলামুল ইসলাম ওরফে রাশেদ, সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ, হাদীসুর রহমান সাগর, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, মামুনুর রশিদ রিপন ও শরীফুল ইসলাম খালিদ।

এই ২১ জনের মধ্যে ১৩ জন বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছেন। নিহতদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। বাকি আটজনকে সরাসরি অভিযুক্ত করে চার্জশিট জমা দেয়া হয়েছে। 

হলি আর্টিজানে হামলায় নিহতরা :

আচমকা ওই হামলায় প্রাণ যায় ১৭ বিদেশি ও তিন বাংলাদেশীসহ ২০ জনের। নিহত তিন বাংলাদেশি হলেন- ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের নাতি ফারাজ আইয়াজ হোসেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অবন্তি কবির ও শিল্প ব্যক্তিত্ব ইশরাত আকন্দ। জঙ্গি হামলা প্রতিরোধ করতে গিয়ে জঙ্গিদের ছোঁড়া গ্রেনেডে প্রাণ হারান ঢাকা মহানগর (উত্তরের) গোয়েন্দা পুলিশের সহকারি কমিশনার রবিউল আলম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন খান।

পরদিন সকালে সেনা অভিযানে সময় মারা যান ওই রেস্তোঁরার শেফ সাইফুল ইসলাম। নিহত একমাত্র ভারতীয় নাগরিক তারুশি জৈন।

নিহত ৯ ইতালিয়ান হলেন- ক্লাউদিয়া মারিয়া ডি এন্তোনা (৫৬), সাত মাসের অন্তঃসত্বা সিমোনা মন্টি (৩৩), মারকো তোন্দাত (৩৯), নাদিয়া বেনেদেত্তি (৫২), আদেলে পুগলিসির (৫০), ক্রিসটিয়ান রোজি (৪৭), ক্লাউডিও কাপেল্লি (৪৫), ভিনসেনজো দাল্লেসত্রো (৪৬) ও মারিয়া রিবোলি (৩৪)।

নিহত সাত জাপানী হলেন- তানাকা হিরোশি, ওগাসাওয়ারা, শাকাই ইউকু, কুরুসাকি নুবুহিরি, ওকামুরা মাকাতো, শিমুধুইরা রুই ও হাশিমাতো হিদেইকো। 

গুলশান হামলার তিন বছর পর সিটিটিসি বলছে, গুলশানে হামলার বিষয়ে তারা অপরিষ্কার তথ্য পেয়েছিলেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটেছে।

রোববার সিসিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ তদন্ত শেষে আমরা ৮ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিয়েছিলাম। হামলায় জড়িত বাকি ১৩ জন বিভিন্ন সময় অভিযানে নিহত হয়েছেন। অভিযুক্ত ৮ জনের মধ্যে দুজন পলতক ছিলেন, যারা পরবর্তী সময়ে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এখন সকলেই জেলে রয়েছেন।

আমরা বলেছিলাম, তদন্তে আরো কারো নাম বেরিয়ে আসলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দিব। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাকি দুইজনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছি আমরা। কিন্তু কারো বক্তব্যে অভিযোগপত্রে সংযুক্ত করার মতো এখনো নতুন কারো নাম আসেনি, নতুন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। ৮ জনের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

হলি আর্টিজান হামলায় গোয়েন্দা ব্যর্থতা ছিলো কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যর্থতা ওই অর্থে বলা ঠিক হবে না। আমাদের কাছে কিছু তথ্য ছিল তবে তা সুনির্দিষ্ট ছিল না। দূতাবাস এলাকায় একটা হামলা হতে পারে বলে ভাসা ভাসা তথ্য ছিল। সেজন্য আমরা নিরাপত্তাও জোরদার করেছিলাম। আমরা যেভাবে ইনটেলিজেন্স সংগ্রহ করি সেটাকে একটা প্রসেস করে একটা অ্যাসেসমেন্ট দাড় করাই। আবার কখনো কখনো জঙ্গিদের যোগাযোগে নজরদারি বাড়ানো হয়। নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিলো, চেকপোস্ট ছিল।

জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত :

সিটিটিসি দাবি করছে, হলি আর্টিজান হামলার পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে গেছে। তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সকল নেতাই ধারাবাহিক অভিযানে নিহত হয়েছেন বা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। এ পর্যায়ে সকলের সমর্থিত বা মনোনীত অবিভক্ত কোন নেতা নেই। ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তারা তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

তবে তাদের চেষ্টা থাকলেও বড় ধরনের হামলা চালানোর সক্ষমতা নেই। এ পর্যায়ে জঙ্গি হামলার ঝুঁকির মাত্রা খুব বেশি না হলেও সকলকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সবাই আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকলে জঙ্গিরা কখনোই সফল হবেন না।

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘জঙ্গিবাদ বৈশ্বিক সমস্যা। যে কোন আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক বা জাতিগত ঘটনার প্রভাব পড়ে জঙ্গিদের উপর। নিউজিল্যান্ডে হামলার পর বাংলাদেশে ঝিমিয়ে পড়া জঙ্গিদের ভেতরে একটা আলোড়ন দেখেছি। এর পরপরই শ্রীলঙ্কায় হামলাও তাদের বড় অনুপ্রেরণা ছিলো। তাদের ইনটেনশন থাকলেও ক্যাপাসিটি বিপর্যস্ত করে দেওয়ায় তারা কোন ধরনের নাশকতায় সক্ষম হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘ঝুঁকির মাত্রা খুব বেশি না থাকলেও আমাদের সকলকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’ আতঙ্কিত না হয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে সচেতন থাকলে জঙ্গিরা কখনই সফল হবে না'। রাইজিংবিডি/ঢাকা/১ জুলাই ২০১৯/নূর/এনএ