নারীঘটিত বিরোধের জের ধরে খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজিদের নির্দেশে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সালাউদ্দিন ওরফে সাগরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় টিকটকার রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে খুন করা হয়েছে। কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেওয়া চারজনসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন ডিএমপির রমনা জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম।
হত্যকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করে মাসুদ আলম জানান, রাকিব হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছিল কুখ্যাত বি কোম্পানির শীর্ষ সন্ত্রাসী সালাউদ্দিন ওরফে সাগর। তিন-চার দিন আগে খুলনা থেকে ভাড়াটে খুনিরা ঢাকায় আসে এবং কয়েকটি হোটেলে অবস্থান বসে করে হত্যার পরিকল্পনা করে৷ এর পর ফলো করা হয় রাকিবের গতিবিধি। এ কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেয় সিহাব, রাফিন, জয়। সাগরকে গ্রেপ্তারের হত্যার রহস্য জানা যায়। তাদের তথ্যে গ্রেপ্তার হয় সালাউদ্দিন।
ডিসি মাসুদ জানান, টিকটকার রাকিব সাফা নামের এক বিবাহিত নারীকে পুনরায় বিয়ে করেছিল। এছাড়া, খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজিদের স্ত্রী টিকটকার জান্নাত মুনের সঙ্গেও ছিল অনৈতিক সম্পর্ক। এই ক্ষোভ থেকে রাকিবকে হত্যার পরিকল্পনা করে সাজিদ। এ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি জানান, গত রবিবার (১৫ মার্চ) রাতে বোরহান উদ্দিন কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাকিবুল ইসলাম বন্ধুদের নিয়ে শহিদ মিনারের সিঁড়িতে আড্ডা দিচ্ছিলেন। রাত সোয়া ৯টার দিকে তিনি মোটরসাইকেল পার্ক করে বসার পরপরই ওত পেতে থাকা ৫-৬ জন সশস্ত্র হামলাকারী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘাতকরা প্রথমে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে এবং পরে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়।
এর আগে ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপ-কমিশনার তালেবুর রহমান রকিবুল হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়ে বলেছেন, জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের একজনের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তলটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
তালেবুর রহমান জানান, রাকিব হত্যার রহস্য পুলিশ ইতোমধ্যে উদঘাটন করেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে।
রবিবার রাতে শহীদ মিনারে বোরহান উদ্দিন কলেজের বিএ দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিব আহমেদকে (২৫) কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়।
রাকিব টিকটক ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য ভিডিও কন্টেন্ট বানাতেন। তার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী।
রাত সোয়া ৯টার দিকে শহীদ মিনারে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন রাকিব। সেখানে তিন-চারজন মিলে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে রাকিবকে। পরে মাথায় গুলি করা হলে রাকিবের মৃত্যু হয়।
তার বন্ধু আল-আমিনের ভাষ্য, ছুরিকাঘাত ও গুলি করার পর হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
রাকিবের গ্রামের বাড়ি ভোলা সদরের চৌমুহনী গ্রামে। তার বাবার নাম তরিকুল ইসলাম খোকন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৈত্রী হলের কর্মী। ঢাকার নিমতলী নাজিম উদ্দিন রোডে পরিবারের সাথে থাকতেন রাকিব।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, নারী সংক্রান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাকিবুলকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর সাধারণ জনতা হামলাকারী এক যুবককে আটক করে পুলিশে দেয়। জিজ্ঞাসাবাদে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে আরো চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় রাকিবের বাবা তরিকুল ইসলাম খোকন শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন।
পুলিশ বলেছে, রাকিবের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ১০টি কোপের চিহ্ন রয়েছে। এছাড়া, দুটি গুলির চিহ্নও রয়েছে।
যার মধ্যে একটি গুলি মাথার ডান পাশে কানের উপর দিয়ে ঢুকে মাথার বাঁ পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। আরেকটি পিঠের ডান পাশে লেগেছে।
রাকিবের মা রাজিয়া বেগম সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, তার ছেলের সঙ্গে ‘কারো কোনো শত্রুতা ছিল না’।
রাকিবের স্ত্রী হাবিবা আক্তার ঢাকা মেডিকেলে মর্গে সাংবাদিকদের বলেন, বগুড়ায় এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের বিয়েতে গিয়ে জান্নাত মুন নামের এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সঙ্গে আমার স্বামীর পরিচয় হয়। এরপর থেকে জান্নাত আমার বাসায় যাতায়াত করত। আমাদের বাসায় থাকাকালে আমার স্বামী টের পায়, জান্নাত কার সঙ্গে যেন ফোনে মাদক বহনের বিষয়ে কথা বলত। বিষয়টি নিয়ে জান্নাতের বয়ফ্রেন্ড আমার স্বামীকে হত্যার হুমকি দেয়। এর কিছুদিন পরে ফেইসবুকে কমেন্ট করা নিয়েও জান্নাতের বয়ফ্রেন্ড আবারো হুমকি দেয়। তখন গুলি করে হত্যার হুমকি দেয়।
রবিবার রাতে এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে শহীদ মিনার এলাকায় দেখা করতে গেলে ওই 'হুমকিদাতারই' পরিকল্পিতভাবে রাকিবকে হত্যা করেছে বলে তার স্ত্রীর ধারণা।