রূপকথার আলাদিনের চেরাগ যেন হাতে পেয়েছেন ঢাকা ওয়াসার সাবেক মিটার রিডার ও বর্তমান রাজস্ব পরিদর্শক হারুন অর রশিদ রানা, এমনই আলোচনা চলছে নানা মহলে। একসময় জীবিকার তাগিদে রিকশা চালালেও বর্তমানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক। তার এই সম্পদ গড়ে ওঠার পেছনে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যেখানে আন্ডার বিলিং, মিটার টেম্পারিং ও অবৈধ পানির সংযোগে সহযোগিতার মাধ্যমে অল্প বেতনের চাকরি করেও রাজধানীতে একাধিক ভবন ও সম্পদ গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে তার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে। সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ময়মনসিংহ-১০ আসনের সাবেক এমপি ফাহমী বাবেল গোলন্দাজের প্রভাব দেখিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছেন। বর্তমানে তিনি মোহাম্মদপুরের ঢাকা ওয়াসা রাজস্ব জোন-৩–এ দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়াও, অভিযোগ আছে, ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদের ওপর হামলার জন্য অর্থ জোগান দেন তিনি। ঢাকায় মোহাম্মদপুর এলাকায় একই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। জুলাই গণহত্যা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার নামও এসেছে বলে জানা গেছে, যদিও মামলাটি এখনো তদন্তাধীন।
জুলাই আন্দোলনের এক সক্রিয় অংশগ্রহণকারী আব্দুল মান্নান দাবি করেন, “হারুন আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা হিসেবে ময়মনসিংহ অঞ্চলে ছাত্রদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে অর্থ জোগান দেন এবং আন্দোলন দমনের চেষ্টা করেন। তার অভিযোগ, মোহাম্মদপুর এলাকায় সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের সঙ্গে মিলে আন্দোলনে সহিংস ভূমিকা পালন করেন হারুন।”
মোহাম্মদপুরের টিক্কাপাড়া, ঢাকা উদ্যান, ৩ নম্বর সড়ক ও চান মিয়া হাউজিং এলাকায় হারুনের একাধিক ভবন রয়েছে। এছাড়া গাজীপুর, ময়মনসিংহের ভালুকা ও নিজ গ্রাম গফরগাঁওয়ের মাখল এলাকায়ও তার বিপুল সম্পত্তির খবর পাওয়া গেছে। অভিযোগ আছে, সরকারি গণপূর্ত বিভাগের জমিও তিনি দখল করেছেন এবং অবৈধভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করে সেখান থেকে ভাড়া আদায় করছেন।
তার বাসার দারোয়ান সিরাজ জানান, মোহাম্মদপুরে হারুনের একাধিক বাড়ি ও দোকান রয়েছে এবং তার বিষয়ে প্রায়ই তদন্ত করতে লোকজন আসেন।
নিজ এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের জমি দখল করেছেন, এমন অভিযোগও রয়েছে হারুনের বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসিন্দা মান্নান ভুঁইয়া বলেন, “একসময় তিনি রিকশা চালাতেন। ওয়াসার চাকরি পাওয়ার পর রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে জমি দখল শুরু করেন। পছন্দের জমি না দিলে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করতেন।”
আরেক অভিযোগে বলা হয়, বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেক পরিবারকে সর্বস্বান্ত করেছেন তিনি। এমনকি স্থানীয় এক ইমামকেও জঙ্গি আখ্যা দিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।
এত অভিযোগের পরও হারুনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। গ্রামবাসী ও ওয়াসার কিছু কর্মচারী একাধিকবার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ওয়াসা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে তিনি বারবার দায়মুক্তি পেয়েছেন।
ঢাকার এক সরকারি আনসার কমান্ডার জালাল উদ্দিন বলেন, “স্বল্প বেতনের চাকরি দিয়ে শুরু করে তিনি এখন কোটি টাকার মালিক। কেউ প্রতিবাদ করলে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। দুদকে অভিযোগ দিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।”
তবে, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হারুন অর রশিদ রানা। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা। আমার সম্পদের বৈধ উৎস রয়েছে।” তবে সেই উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলার কথা জানান।
এ বিষয়ে ওয়াসার এমডির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।