লাইফস্টাইল

চা কতটুকু পান করা উচিত?

এস এম গল্প ইকবাল : বিশ্বে যত জনপ্রিয় পানীয় আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো চা। প্রতিদিন চা পানে স্বাস্থ্যের অনেক উপকার হয়। যে ব্যক্তি নিয়মিত চায়ের কাপে চুমুক দেন, তিনি তার শরীরের প্রত্যেকটি অর্গানকে সহযোগিতা করেন। চিনি বা সুইটেনারমুক্ত চায়ের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হার্টের রোগ, ক্যানসার ও ক্রনিক রোগ প্রতিরোধ করে এবং শরীরের কোষ মেরামতে ভূমিকা রাখে।

ওহাইওর অর্থোপেডিক সার্জন অ্যান্থনি কৌরি বলেন, ‘চা আসে ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস নামক উদ্ভিদ থেকে, যেখানে ক্যাটেচিন (এপিগ্যালোক্যাটেচিন গ্যালেট অথবা ইজিসিজি) নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীর থেকে ক্ষতিকর ফ্রি র‍্যাডিকেল দূর করে এবং প্রদাহ উপশম করে।’

চা কতটুকু পান করা উচিত?

প্রতিদিন কতটুকু চা পান করা উচিত তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গবেষণা হয়েছে। আপনি ক্যাফেইন ওভারডোজ না করে চা পান থেকে সর্বোচ্চ উপকার পেতে পারেন। ডা. কৌরি বলেন, ‘গ্রিন টি থেকে সর্বোচ্চ উপকারিতা পেতে তিন থেকে চার কাপ পান করতে পারেন।’ অধিকাংশ গবেষণার আলোকে এটা বলা যায় যে, সম্ভাব্য সমস্যা এড়াতে অতিরিক্ত চা পান না করাই ভালো, প্রতিদিন চা পান ৪ কাপের মধ্যে সীমিত রাখুন।

কোন চা সবচেয়ে ভালো?

যখন চা নির্বাচন করবেন তখন নিশ্চিত হোন যে আপনার পছন্দের চায়ে কোনো চিনি বা সুইটেনার নেই। এমনকি কিছু ফ্লেভারড টি-তে কোনো ক্যালরি না থাকলেও কৃত্রিম সুইটেনার ও প্রিজারভেটিভ থাকে। ইতোমধ্যে তৈরিকৃত চা কেনার পরিবর্তে নিজে চা বানানোর চেষ্টা করুন। ডা. কৌরি বলেন, ‘চা পাতাকে যত বেশি প্রক্রিয়াজাত করা হয়, এটির ক্যাটেচিন তত অকার্যকর হয়। গ্রিন টি হলো তুলনামূলক কম প্রক্রিয়াজাত চা এবং এর স্বাস্থ্য উপকারিতা সবচেয়ে বেশি।’

চায়ের যত উপকারিতা

* কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমে : প্রাণঘাতী রোগ ক্যানসার প্রতিরোধের অন্যতম সহজ উপায় হলো চা পান করা। গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, চায়ের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ও কিছু উপাদান কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের অন্তর্গত ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটাল অ্যান্ড ফ্যাকাল্টির নিউট্রিশনাল অ্যান্ড লাইফস্টাইল সাইকিয়াট্রির পরিচালক উমা নাইডু বলেন, ‘চা পানে স্কিন ক্যানসার, প্রোস্টেট ক্যানসার, ফুসফুস ক্যানসার ও স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ হতে পারে। বিভিন্ন ধরনের চা বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে।’

* ত্বকের স্বাস্থ্য উন্নত হয় : নিয়মিত ব্ল্যাক টি পানে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে যায়। কিন্তু আপনি কিভাবে চা তৈরি করছেন তার ওপর ভিত্তি করে উপকারিতার মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। ডা. নাইডু বলেন, ‘হট ব্ল্যাক টি ত্বকের ক্যানসার স্কোয়ামাস কার্সিনোমা প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে এবং এই চা আইসড টি বা ঠান্ডা চায়ের চেয়ে বেশি উপকার করতে পারে। এছাড়া ব্রুয়িং টাইমও (গরম পানিতে চা পাতাকে কতক্ষণ রাখা হচ্ছে বা সিদ্ধ করা হচ্ছে) ম্যাটার করে।’

* টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে : প্রতিদিন ব্ল্যাক টি পান করলে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হ্রাস পায়, কারণ এটি খাবার খাওয়ার পর রক্ত শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এশিয়া প্যাসিফিক জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, ব্ল্যাক টি সুক্রোজ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পর রক্ত শর্করা কমাতে পারে। এভাবে টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ হয়।

* দাঁত মজবুত হয় : সারাদিন চা পান করলে আপনার দাঁতে দাগ হবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে চা পান আপনার দাঁতকে মজবুত করতে পারে। জার্নাল অব ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল প্যাথোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, গ্রিন টি’র অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ইফেক্ট রয়েছে যা আপনার মুখে ক্যাভিটি-সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া হ্রাস করতে পারে। এর ফলে ক্যাভিটি প্রতিরোধ হবে অথবা ইতোমধ্যে সৃষ্ট ক্যাভিটি আরো বড় হতে পারবে না।

* হার্টের উপকার হয় : চায়ের প্রদাহবিরোধী উপাদান রক্তনালিকে শিথিল ও পরিষ্কার রাখতে পারে, যার ফলে হার্টের ওপর চাপ কমে। ডা. কৌরি বলেন, ‘চায়ের ক্যাটেচিন প্রদাহ হ্রাস করে- এভাবে গুরুত্বপূর্ণ ধমনীগুলোতে প্লেকের গঠন বাধাপ্রাপ্ত হয়।’ ডা. নাইডু হার্টের উপকারসাধনের জন্য প্রতিদিন তিন কাপ ব্ল্যাক টি পানের পরামর্শ দিচ্ছেন।

* অ্যালঝেইমারস রোগের ঝুঁকি কমে : অ্যালঝেইমারস হলো একটি স্নায়ুতাত্ত্বিক রোগ, যেখানে মস্তিষ্কের কোষ মারা যাওয়ার কারণে স্মৃতিশক্তি ধ্বংস হয় ও জ্ঞান বা চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কাজ সম্পাদনের ক্ষমতা হ্রাস পায়। একসময় খুব সহজ কাজ করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। একারণে অ্যালঝেইমারস রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো জানা এবং এ রোগ প্রতিরোধের জন্য লাইফস্টাইলে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা গুরুত্বপূর্ণ। ডা. নাইডু বলেন, ‘গ্রিন টি স্ট্রেস হ্রাস করে এবং শরীর ও মনকে রিলাক্স করে। এ চায়ের পলিফেনলস মস্তিষ্কের কোষকে ড্যামেজ হওয়া থেকে রক্ষা করে। এসবকিছু অ্যালঝেইমারস রোগ প্রতিরোধে অবদান রাখে।’

* ভালো ঘুম আনে : যদি আপনার ঘুম না আসার কারণে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করার প্রবণতা থাকে, তাহলে বিছানায় যাওয়ার পূর্বে এককাপ চা পান করতে পারেন। ডা. নাইডু বলেন, ‘পূর্ব এশিয়ার ভেষজ চা ইনসমনিয়া বা অনিদ্রায় সহায়ক হতে পারে।’ ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিন রিসার্চে প্রকাশিত একটি গবেষণা সাজেস্ট করছে যে, হালকা থেকে মাঝারি ইনসমনিয়ায় ভোগা লোকেরা চা পান করলে ভালো ঘুম আসতে পারে, যার ফলে জীবনের মান বৃদ্ধি পাবে।

* মনোযোগের দৈর্ঘ্য বাড়ে : চায়ের ক্যাফেইন মনোযোগ ও সচেতনতা বাড়াতে পারে। ডা. নাইডু বলেন, ‘চায়ের অনন্য অ্যামাইনো অ্যাসিড এল-থিয়েনাইন মস্তিষ্কের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। এটি মস্তিষ্ক শিথিলায়নের মাধ্যমে মনোযোগের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করে। তাই খুব মনোযোগের প্রয়োজন আছে এমন কাজের পূর্বে চা পান করলে পারফরম্যান্স ভালো হবে।’ আপনার কোনো কাজে মনোযোগ দিতে সমস্যা হলে চা পানের কথা বিবেচনা করতে পারেন।

* বিপাক দ্রুত করে : আপনার বিপাক দ্রুত করতে চান? তাহলে চা পানের কথা ভাবুন। ডা. কৌরি বলেন, ‘চায়ের ক্যাফেইন মেন্টাল অ্যাকুইটি বা মনের তীক্ষ্ণতা যেমন বৃদ্ধি করে তেমনি বিপাকও বাড়াতে পারে। এটি চর্বি পোড়াতে সাহায্য করে- প্রতিদিন ১০০ ক্যালরি পর্যন্ত।’ কিন্তু অতিরিক্ত চা পান করে ক্যাফেইন ওভারডোজ করবেন না। এককাপ গ্রিন টি-তে প্রায় ৪০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। ডা. কৌরি প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিগ্রামের বেশি ক্যাফেইন খেতে নিষেধ করছেন।

আজ থেকে শুরু হোক চা পান

আপনার ইতোমধ্যে চা পানের অভ্যাস থাকলে আপনাকে অভিনন্দন, কারণ আপনার স্বাস্থ্যের কিছু না কিছু উপকার হয়েছে। যদি আপনার এ পানীয় পানের অভ্যাস না থাকে, তাহলে এ প্রতিবেদনে আলোচিত উপকারিতাগুলো বিবেচনা করে আজই এককাপ চা পান করে ফেলুন। এটা মনে রাখা ভালো যে, পরিমিত চা পানে অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক লোকের কোনো ক্ষতি হয় না। ডা. কৌরি বলেন, ‘যেসব লোক নিয়মিত গ্রিন টি পান করেছেন তারা এর বিপরীত গ্রুপের লোকদের (অর্থাৎ যারা চা পান করেননি) তুলনায় স্বাস্থ্যবান ছিল। চা হলো পানের জন্য খুব নিরাপদ পানীয়- এটি তখনই সমস্যার কারণ হতে পারে, যখন আপনি মাত্রা ছাড়িয়ে পান করবেন।’

চা পানের কিছু খারাপ প্রভাব

* আয়রন শোষণে ব্যাঘাত ঘটায় : চায়ের ক্যাটেচিন আপনার শরীরের আয়রন শোষণের ক্ষমতায় নেতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। এর মানে হলো, যথেষ্ট আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া সত্ত্বেও আপনার শরীরে আয়রনের ঘাটতি হতে পারে এবং আপনি রক্তস্বল্পতায় ভুগতে পারেন। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে এমনটা হয় না। ডা. কৌরি বলেন, ‘অধিকাংশ সুস্থ লোকের ওপর এ ধরনের প্রভাব পড়ে না, কিন্তু আয়রন ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতায় ভোগা লোকদের প্রচুর পরিমাণে গ্রিন টি পান থেকে বিরত থাকা উচিত।’ শিশু, গর্ভবতী নারী ও কিডনি রোগের ইতিহাস থাকা লোকদের গ্রিন টি সীমিত করতে হবে।

* রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ে : অতিমাত্রায় চা পান করলে ছোটখাট ক্ষত থেকেও প্রচুর পরিমাণে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি অথবা কালশিটের প্রবণতা বেড়ে যায়। ক্যালিফোর্নিয়ার বিভারলি হিলসের বোর্ড-সার্টিফায়েড প্লাস্টিক সার্জন মিশেল লি বলেন, ‘অতি চা পানে কালশিটে ও রক্তক্ষরণের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। আমি আমার সকল রোগীদেরকে সার্জারির দুই-তিন সপ্তাহ পূর্ব থেকে চা পান না করতে পরামর্শ দিই।’

* ওষুধের কার্যকারিতা কমাতে পারে : চায়ের উপকারিতা অসীম মনে হলেও এ পানীয় পানে কিছু ওষুধের কার্যকারিতা কমতে পারে। ডা. কৌরি বলেন, ‘চায়ের ক্যাটেচিন হার্ট ও ব্লাড প্রেশারের কিছু ওষুধে হস্তক্ষেপ করে কার্যকারিতা হ্রাস করতে পারে। তাই আপনি এসব ওষুধ সেবন করতে গেলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।’

তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট

পড়ুন :  **

          **

          **

          ** রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ আগস্ট ২০১৯/ফিরোজ