লাইফস্টাইল

রমজানে ঈমান আমলের কতটা উন্নতি হলো

মহিমান্বিত রমজান এখন বিদায়লগ্নে। রহমত ও মাগফিরাতের দশক অতিক্রম করে রমজান এখন উপনীত হয়েছে নাজাতের দশকে। রমজানের বিদায়লগ্নে মুমিনের আত্মজিজ্ঞাসা হলো, নিজের ঈমান ও আমলের কতটা উন্নতি হলো? বরকতময় এ সময় দ্বারা কতটা উপকৃত হতে পারলাম? কেননা একজন মুমিনের জন্য রমজান হলো বিদ্যালয়ের মতো, যেখানে সে ঈমান ও আমলের শিক্ষা ও দীক্ষা গ্রহণ করে। রমজান মাসে দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার ফলে তাঁর ভেতর নেক আমলের এমন স্পৃহা তৈরি হয় যা তাকে বছরের অন্য সময়গুলোতে আল্লাহর পথে পরিচালিত করে। 

প্রশ্ন হলো, মুমিন কেন রমজান শেষে নিজের ঈমান আমলের উন্নতি ও অগ্রগতির হিসাব করবে? এর উত্তর হলো, এই ইতিবাচক পরিবর্তনের আহ্বান রমজানের শুরুতে আল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করে এবং শয়তানকে বন্দি করে বান্দার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন রমজান মাসের প্রথম রাত হয়, শয়তান ও অবাধ্য জীনদের বন্দী করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর একটিও খোলা রাখা হয় না। এদিকে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। একটিও বন্ধ রাখা হয় না। একজন আহ্বানকারী ঘোষণা দেন, হে কল্যাণ অনুসন্ধানকারী! আল্লাহর কাজে এগিয়ে যাও। হে অকল্যাণ ও মন্দ অনুসন্ধানী! থেমে যাও। এই মাসে আল্লাহ তাআলাই মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করেন এবং এটা রমজান মাসের প্রতি রাতেই হয়ে থাকে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৬৮২)

প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, আল্লাহ রমজানে যেসব কল্যাণের পথে অগ্রগামী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তার শীর্ষে রয়েছে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। পবিত্র কোরআনে এটাকেই সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর যেন তোমরা আল্লাহভীরু হতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩) তাকওয়াই মুমিনের ঈমান-আমলের উন্নতির চাবিকাঠি। কেননা আলেমরা বলেন, তাকওয়া হলো কোনো কাজ করার আগে বান্দার অন্তরে এই চিন্তা জাগ্রত হওয়া যে, আল্লাহ এতে সন্তুষ্ট হবেন, নাকি অসন্তুষ্ট হবেন। তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অনুসারে কোনো কাজে যদি আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন বলে মনে হয়, তবে সে তা করে এবং অসন্তুষ্ট হওয়ার ভয় থাকলে সে তা পরিহার করে। 

আর মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার অর্থ হলো যাবতীয় মন্দ কথা, কাজ, আচরণ এবং সমস্ত পাপ পরিহার করা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রোজা ঢালস্বরূপ। সুতরাং অশ্লীলতা করবে না এবং মূর্খের মতো কাজ করবে না। যদি কেউ তার সাথে ঝগড়া করতে চায়, তাকে গালি দেয়, তবে সে যেন দুইবার বলে, আমি রোজা পালন করছি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৯৪)

এ জন্য পূর্বসূরী বুজুর্গ ও আলেমরা রমজানকে আত্মশুদ্ধি ও আত্মোন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতেন। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম জাওজি (রহ.) বলেন, রোজা মুত্তাকিদের জন্য লাগাম, (নফসের বিরুদ্ধে) যুদ্ধকারীদের জন্য ঢাল এবং নেককার ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জন্য সাধনা। (নিদাউর রাইয়ান, পৃষ্ঠা ২১০)

পূর্বসূরীর আলেমরা রমজানে শুধু নেক আমল করতেন না, বরং তারা পরস্পরের সঙ্গে নেক আমলের প্রতিযোগিতা করতেন, যেন নিজেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে আরো বেশি এগিয়ে নেওয়া যায়। হাসান বসরি (রহ.) বলেন, আল্লাহ রমজান মাসকে তাঁর বান্দাদের জন্য ময়দানস্বরূপ বানিয়েছেন। তারা সেখানে নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রতিযোগিতা করে। যারা অগ্রগামী হয় তারা সফল এবং যারা পিছিয়ে পড়ে তারা ক্ষতিগ্রস্ত। (তানবিহাতুল হাসান, পৃষ্ঠা ৪৮)

এখন বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে, আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রতিযোগিতায় সফল হলাম নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হলাম? নেক আমল ও উত্তম গুণাবলি অর্জনে আমরা কতটা পিছিয়ে আছি? যদি আমরা পিছিয়ে থাকি তবে রমজানের অবশষ্টি দিনগুলোতে এগিয়ে যাওয়ার চষ্টো করতে হবে। বিশেষত নিজের গুনাহগুলো ক্ষমা করাতে পারলাম কি না সেটা ভেবে দেখতে হবে। কেননা নবীজি (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘সেই ব্যক্তির নাক ধূলোয় ধূসরিত হোক যে রমজান পেল, কিন্তু গুনাহ ক্ষমা করানোর আগেই তা অতিবাহিত হয়ে গেল।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৪৫)

এজন্যই রমজানের শেষভাগে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলতেন, ‘আমাদের মধ্যে কার রোজা কবুল হলো, আমরা তাঁকে অভিনন্দন জানাব এবং কে বঞ্চিত হলো তাঁর জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করব। হে সৌভাগ্যবান! যার রোজা কবুল হয়েছে তোমাকে অভিনন্দন এবং হে হতভাগা! যার রোজা প্রত্যাখাত হয়েছে আল্লাহ তোমার পাপ মার্জনা করুন।’ (লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা ২১০)

আল্লাহ সবাইকে রমজানের সাফল্য দান করুন। আমিন।