কোরবানি ইসলামের একটি ওয়াজিব বিধান। এই বিধান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে কোরবানির পশু ইসলামী শরিয়তের নিয়ম মেনে জবাই করা আবশ্যক। পাশাপাশি জবাইয়ের পর কোরবানির পশুর গোশত যথানিয়মে বণ্টন করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোরবানির পশু জবাই এবং গোশত বণ্টনের নিয়মাবলী তুলে ধরা হলো।
পশু জবাইয়ের বিধি-বিধান
নিজের কোরবানির পশু নিজ হাতে জবাই করা মুস্তাহাব। যদি নিজে জবাই করতে না পারে তবে এমন ব্যক্তির সাহায্য গ্রহণ করবে যে জবাইয়ের নিয়ম ও বিধি-বিধানগুলো জানে। এ অবস্থায় নিজে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা উত্তম। (ফাতাওয়ায়ে শামি : ৫/২৭২)
অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ জবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। যদি কোনো একজন না পড়ে তবে ওই কোরবানি সহিহ হবে না এবং জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না। (রদ্দুল মুহতার : ৬/৩৩৪)
জবাই করার সময় কোরবানির পশু কিবলামুখী করে শোয়াবে। অতঃপর ‘বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করবে। ইচ্ছাকৃত ‘বিসমিল্লাহ’ পরিত্যাগ করলে জবাইকৃত পশু হারাম বলে গণ্য হবে। আর যদি ভুলক্রমে ‘বিসমিল্লাহ’ ছেড়ে দেয় তবে তা খাওয়া জায়েজ আছে। পশু জবাই করার সময় মুখে নিয়ত করা জরুরি নয়। অবশ্য মনে মনে নিয়ত করবে যে আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করছি। তবে মুখে দোয়া পড়া উত্তম। (হেদায়া : ৪/৪৩৫; ফাতাওয়ায়ে শামি : ৫/২৭২)
জবাই করার সময় চারটি রগ কাটা আবশ্যক। ১. কণ্ঠনালি, ২. খাদ্যনালি, ৩. দুই পাশের দুটি মোটা রগ। এই চারটি রগের মধ্যে যে কোনো তিনটি কাটা হলে কোরবানি শুদ্ধ হবে। কিন্তু যদি দুটি কাটা হয় তবে কোরবানি শুদ্ধ হবে না। (হেদায়া : ৪/৪৩৭)
কোরবানির পশু কিবলামুখী করে শোয়ানোর পর নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করবে, ‘ইন্নি ওয়াজ জাহতু ওয়াজ হিয়া লিল্লাজি ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকিন। ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাবিবল আলামিন। লা শারিকা লাহু ওয়া বিজালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমিন। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়ালাকা।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ২৭৯৫)
এই দোয়া পাঠ করার পর ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে পশু জবাই করবে। পশু জবাই করার পর নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করবে, আল্লাহুম্মা তাকাব্বালহু মিন্নি কামা তাকাব্বালতা মিন হাবিবিকা মুহাম্মদ ও খালিলিকা ইবরাহিম আলাইহিমাস সালাতু ওয়াস সালাম। যদি একাধিক ব্যক্তি মিলে কোরবানি করে তবে মিন্নির স্থলে মিন্না পাঠ করবে এবং শরিকদের নাম পাঠ করবে। তবে তাদের নাম শুধু নিয়ত করলে হবে।
জবাই করার আগে ছুরি ভালোভাবে ধার দিয়ে নেওয়া মুস্তাহাব। কোরবানির পশুকে এমনভাবে জবাই করা উচিত, যাতে পশুর কোনো প্রকার অপ্রয়োজনীয় কষ্ট না হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্থানে জবাই করা উচিত। জবাইয়ের পর পশু নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা জরুরি। পশু নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা কোনো অঙ্গ কাটা মাকরুহ। (হেদায়া : ৪/৪৩৮; এমদাদুল ফাতাওয়া : ৩/৫৪৭, ফাতাওয়ায়ে শামি : ৯/৪৭৩)
গোশত বণ্টনের নিয়ম
কোরবানির পশুর গোশত নিজে খাওয়া, অন্যকে খাওয়ানো এবং তা সংরক্ষণ করা জায়েজ। (ইলাউস সুনান : ১৭/২৭০)
কোরবানির গোশত বণ্টনের উত্তম পদ্ধতি হলো এক তৃতীয়াশ গরীব-মিসকিনকে, এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীকে দেওয়া এবং অপর এক তৃতীয়াংশ নিজে রাখা। অবশ্য পুরো গোশত নিজে রেখে দেওয়াও নাজায়েজ নয়। (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি : ৫/৩০০)
কোরবানির গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েজ নয়, বিক্রি করলে প্রাপ্ত মূল্য সদকা করে দিতে হবে। কোরবানির পশু জবাইকারী, কসাই বা কাজে সহযোগিতাকারীদের চামড়া, গোশত বা কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ হবে না। অবশ্য নির্ধারিত পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারি দেওয়া যাবে। (আদ্দুররুল মুখতার : ৬/৩২৮; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি : ৫/৩০১)
লেখক: তরুণ আলেম ও মুহাদ্দিস