নারীর জীবন মোটাদাগে দুই ভাগে ভাগ করলে ‘বিবাহিত’ আর ‘অবিবাহিত’ জীবনের কথাই বলতে হয়। সামাজিকভাবে এই দুই ভাগে নারী একেবারে আলাদা কিছু মানুষকে আপনজন হিসেবে জানেন, বোঝেন। কিন্তু একটা পর্যায়ে তার মনে হতে থাকে দুই ভাগের কাউকেই তিনি হাতের নাগালে পাচ্ছেন না!—নারী মাত্রই বুঝবেন এই বিচ্ছিন্নতার বেদনা। বলা যায় এই বিচ্ছিন্নতাবোধ আরও প্রগাঢ় হয় যে কোনো উৎসবে।
নারীর ঈদ মানেই কেবল উৎসব নয়, কখনও কখনও সেই উৎসবকে রাঙিয়ে তুলতে গিয়ে নিজের আনন্দ আর বিশ্রামের সুযোগটুকুও অনেকেই পান না। বিশেষ করে আমাদের সমাজে একজন বিবাহিত নারীর ঈদ যেন পরিবারের সবার আনন্দ নিশ্চিত করার এক নীরব যুদ্ধ। কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরেছেন এমনই এক বাস্তবতা—যেখানে একজন নারী ঈদের দিনেও নিজের মানুষদের কাছে যেতে পারেন না, নিজের মতো করে একটু সময় কাটাতে পারেন না। পাপড়ি রহমানের বক্তব্য শুধু একজন নারীর গল্প নয়, বরং আমাদের সমাজের অসংখ্য নারীর অব্যক্ত কষ্টের প্রতিচ্ছবি।
পাপড়ি রহমান প্রথমেই আপত্তি জানান ‘গৃহিণী’ শব্দটিতেই। তার মতে, সমাজ কখনো কোনো পুরুষকে ‘গৃহকর্তা’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে না; বরং তার পেশাগত পরিচয়ই সামনে আনে। অথচ নারীর ক্ষেত্রে ‘গৃহিণী’ শব্দটি যেন তার অসংখ্য পরিচয়কে আড়াল করে দেয়। তিনি বলেন, একজন পূর্ণবয়স্ক নারী একাধারে মা, রাঁধুনি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, সেবিকা, চাকরিজীবী, স্ত্রী, এমনকি কখনো কখনো কেয়ারটেকার কিংবা ড্রাইভারের ভূমিকাও পালন করেন। অর্থাৎ এই সমাজ নারীকে সবসময়ই ‘দশভুজা’ হয়ে উঠতে বাধ্য করে।
পাপড়ি রহমানের ভাষায়, ঈদের প্রকৃত আনন্দ তিনি অনুভব করেছেন অবিবাহিত জীবনে। তখন বাবার হাত ধরে নতুন জামা-স্যান্ডেল কেনা, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো—সবকিছুতেই খুঁজে পেতেন নির্মল আনন্দ। বড় হওয়ার পর মাকে সামান্য সাহায্য করলেও দায়িত্ব শেষ হয়ে যেত। বিয়ের পর ঈদের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। তখন আর নিজের সাজগোজ বা আনন্দের কথা ভাবার সুযোগ থাকে না।
পাপড়ি রহমান জানান, বাবা বেঁচে থাকতে ঈদের দিন নামাজ শেষে নিজেই মেয়ের বাসায় খাবার নিয়ে আসতেন। কিন্তু বাবার অসুস্থতার পর সেই দৃশ্য বদলে যায়। ঈদের দিন রাত গভীর হওয়ার আগে তিনি বাবার কাছে যেতে পারতেন না। বৃদ্ধ বাবা অপেক্ষা করতেন মেয়েকে একনজর দেখবেন বলে। সেই অপেক্ষা, সেই অপূর্ণতা আজও পাপড়ি রহমানকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
এই কথাসাহিত্যিক বলেন, ‘‘নারী সংসারের সকল দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় নিজের সবচেয়ে আপন মানুষগুলোকেও সময় দিতে পারে না।’’ কোরবানির ঈদকে তিনি আরও বেশি কষ্টসাধ্য বলে উল্লেখ করেন। কোরবানির মাংস ভাগ করা, সংরক্ষণ, রান্না, অতিথি সামলানো—সবকিছুর চাপ একসঙ্গে এসে পড়ে নারীর ওপর। ফলে ঈদ আসার আগেই তার মধ্যে ভয় কাজ করে, এমনকি শারীরিক অসুস্থতাও দেখা দেয়। অথচ এত কিছুর পরও পরিবার বা সমাজের সবাইকে সন্তুষ্ট করা যায় না; বরং নারীকেই অধিকাংশ সময় দোষারোপের মুখোমুখি হতে হয়।
পাপড়ি রহমানের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের সমাজে নারীর আত্মত্যাগের নির্মম বাস্তবতা। পাপড়ি রহমান বলেন, ‘‘নারী যেন এক অবোধ পশু! যে নিজেকে কোরবানি দিয়েও কাউকে পুরোপুরি সুখী করতে পারে না।’’
কথাগুলো কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়; বরং সমাজে নারীর অবস্থান, মূল্যায়ন এবং স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। কিন্তু উত্তর মেলে না।