মিডিয়া

‘সবার অধিকারের কথা বলে অধিকার বঞ্চিত সাংবাদিকেরা’

সমাজের সব শ্রেণির মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও দেশের সাংবাদিকরা নিজেরাই আজ চরম অধিকার বঞ্চনার শিকার। অনিশ্চিত চাকরি, বকেয়া বেতন-ভাতা, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বেড়াজালে আটকে পড়েছে গণমাধ্যমকর্মীদের জীবন। 

শুক্রবার (১ মে) মে দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সভায় বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরেন এবং করণীয় নিয়ে দিকনির্দেশনা দেন।

ডিইউজে সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই পেশার মানুষগুলোই আজ সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। অনেক প্রতিষ্ঠানে মাসের পর মাস বেতন-ভাতা বকেয়া থাকে, উৎসব ভাতা তো দূরের কথা, নিয়মিত বেতন পাওয়াটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এতে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে অনেক সাংবাদিককে।”

তিনি আরও বলেন, “সাংবাদিকরা গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করলেও তাদের জন্য কোনো কার্যকর সুরক্ষা কাঠামো নেই। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।”

ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম বলেন, “বর্তমানে গণমাধ্যম খাতে সবচেয়ে বড় সংকট হলো চাকরির নিরাপত্তাহীনতা। স্থায়ী নিয়োগের পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে মালিকপক্ষ যেকোনো সময় কোনো কারণ ছাড়াই সাংবাদিকদের ছাঁটাই করছে। এতে পেশার প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে, তরুণরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে।”

তিনি যোগ করেন, “সাংবাদিকবান্ধব শ্রমনীতি প্রণয়ন না হলে এই সংকট আরও গভীর হবে।"

বিএফইউজে সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের দাবি জানানো হলেও বাস্তবে তার অগ্রগতি নেই। দশম ওয়েজবোর্ডে বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও নবম ওয়েজবোর্ডই এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে সাংবাদিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হচ্ছে না।”

তিনি বলেন, “গণমাধ্যম মালিকদের মধ্যে একটি অংশ শ্রম আইন ও ওয়েজবোর্ড নির্দেশনা মানতে অনাগ্রহী। এ অবস্থায় সরকারের কঠোর নজরদারি এবং প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ জরুরি।”

বিএফইউজে মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, “মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতীক। কিন্তু দুঃখজনক হলো সাংবাদিকরা, যারা সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার, তারাই আজ নিজেদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। এটি শুধু পেশাগত সংকট নয়, গণতন্ত্রের জন্যও হুমকি।”

তিনি আরও বলেন, “সাংবাদিকদের জন্য একটি সুরক্ষিত কর্মপরিবেশ, নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো এবং চাকরির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।”

আলোচনায় বক্তারা আরও বলেন, ডিজিটাল যুগে গণমাধ্যমের বিস্তার ঘটলেও সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও আর্থিক সুরক্ষা সেই অনুপাতে বাড়েনি। অনেক অনলাইন ও প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম বেতন কাঠামোও মানা হচ্ছে না। ফলে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন।

বক্তারা সাংবাদিকদের জন্য আলাদা শ্রমনীতি প্রণয়ন, ওয়েজবোর্ড দ্রুত বাস্তবায়ন, বকেয়া বেতন পরিশোধে বাধ্যবাধকতা আরোপ এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধের দাবি জানান। পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় সরকার, মালিকপক্ষ ও সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দেন।