জাতীয়

কে হচ্ছেন দুদক চেয়ারম্যান

এম এ রহমান : কে হচ্ছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরবর্তী চেয়ারম্যান। সংশ্লিষ্ট মহলে এ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। একইসঙ্গে একজন কমিশানারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তা নিয়েও চলছে আলোচনা।  দুদকের বর্তমান চেয়ারম্যান ও এক কমিশনারের মেয়াদ আগামী ১৩ মার্চ শেষ হতে যাচ্ছে। তাই নিয়ম অনুযায়ী শূন্য পদ পূরণে এরই মধ্যে গঠন করা হয়েছে বাছাই কমিটি। চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।গত ২ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে সভাপতি করে বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে।পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন- হাইকোর্টের বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন, বাংলাদেশ মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মাসুদ আহমেদ, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ ও প্রাক্তন মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম আবদুল আজিজ এনডিসি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মফিউল আলমের সই করা প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানা গেছে।প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, দুদক চেয়ারম্যান ও একজন কমিশনারের পদ শিগগিরই শূন্য হবে। এ দুটি পদে নতুন নিয়োগের জন্য সুপারিশ করতে দুদক আইন ২০০৪’র ৭ ধারা অনুযায়ী  বাছাই কমিটি গঠন করা হলো।কমিটির কার্য্পরিধির বিষয়ে সূত্র জানায়, বাছাই কমিটি নিয়োগে সুপারিশের উদ্দেশ্যে সদস্যদের অন্তত তিনজনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কমিশারের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দু’জন ব্যক্তির নামের তালিকা প্রণয়ন করা হবে। ওই আইনের ৬ ধারার অধীনে নিয়োগ দিতে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। অন্তত চারজন সদস্যের উপস্থিতিতে বাছাই কমিটির কোরাম গঠিত হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ওই বাছাই কমিটির কার্য্-সম্পাদনে প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা দেবে। এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। তিন কমিশনারের মধ্যে থেকে নিয়োগ করা হবে দুদক চেয়ারম্যান।বর্তমান দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান ও কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ আগামী মার্চে শেষ হলেও অপর কমিশনার ড. মো. নাসিরউদ্দিনের মেয়াদ থাকছে আরো বেশ কিছুদিন। দুদক আইনটি সংশোধন না করা পর্যন্ত একজনের দ্বিতীয় মেয়াদে থাকার সুযোগ নেই। তাই বর্তমান চেয়ারম্যান ও কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিনের পুনরায় স্বপদে বহাল থাকার সুযোগ খুবই কম।নতুন দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার হওয়ার দৌড়ে এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনের নাম ঘুরে ফিরে আলোচনায় আসছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সদ্য অবসরে যাওয়া সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি এএইচএম শামছুদ্দিন চৌধুরী মানিক, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই)প্রাক্তন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মঞ্জুর কাদের ও অবসরে যাওয়া জ্যেষ্ঠ সচিব ইকবাল মাহমুদ। এদের মধ্যে বিচারপতি এএইচএম শামছুদ্দিন চৌধুরী মানিক, এনএসআইয়ের প্রাক্তন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মঞ্জুর কাদের চেয়ারম্যান হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র রাইজিংবিডিকে জানিয়েছে। চেয়ারম্যান হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন বর্তমান কমিশনার ড. মো. নাসিরউদ্দিনও।দুদকের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান দুদকে কমিশনার হিসেবে যোগ দেন ২০১১ সালের ১৪ মার্চ। একই দিনে কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন যোগ দেন। এরপর ২০১৩ সালের ২৬ জুন প্রাক্তন দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান অবসরে গেলে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান বদিউজ্জামান। মো. বদিউজ্জামান চেয়ারম্যান হওয়ায় তার শূন্য পদে দুদক কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান ড. মো. নাসিরউদ্দিন। বাছাই কমিটি প্রসঙ্গে দুদক আইনের ৭ ধারায় বলা হয়েছে, (১)‘কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে নিন্মবর্ণিত পাঁচজন সদস্যের সমন্বয়ে একটি বাছাই কমিটি গঠিত হইবে’। এর মধ্যে রয়েছেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান ও অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিবদের মধ্যে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব।(২)‘প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক বাছাই কমিটির সভাপতি হইবেন।’(৩)‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বাছাই কমিটির কার্য-সম্পাদনে প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা প্রদান করিবে।’(৪) ‘বাছাই কমিটি, কমিশনার নিয়োগে সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে, উপস্থিত সদস্যদের অন্যূন ৩ (তিন) জনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুইজন ব্যক্তির নামের তালিকা প্রণয়ন করিয়া ধারা ৬-এর অধীন নিয়োগ প্রদানের জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট প্রেরণ করিবে?’(৫) ‘অন্যূন ৪ (চার) জন সদস্যের উপস্থিতিতে বাছাই কমিটির কোরাম গঠিত হইবে।’কমিশনারদের যোগ্যতা, অযোগ্যতা, ইত্যাদি প্রসঙ্গে ৮ ধারায় বলা হয়েছে, (১) ‘আইনে, শিক্ষায়, প্রশাসনে, বিচারে বা শৃঙ্খলা বাহিনীতে অন্যূন ২০ (বিশ) বৎসরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি কমিশনার হইবার যোগ্য হইবেন।’ উপধারা (২) এ কমিশনার না হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে বলা হয়েছে- ‘বাংলাদেশের নাগরিক না হওয়া, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ঋণ খেলাপী হিসেবে ঘোষিত বা চিহ্নিত, আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত হইবার পর দেউলিয়াত্বের দায় হইতে অব্যাহতি লাভ না করা, নৈতিক স্খলন বা দুর্নীতিজনিত কোনো অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হইয়া আদালত কর্তৃক কারাদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তি, সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থাকা, দৈহিক বা মানসিক বৈকল্যের কারণে কমিশনের দায়িত্ব পালনে অক্ষম, বিভাগীয় মামলায় গুরুদণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তি কমিশনার হতে পারবেন না।দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত হয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর। কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। আর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পান প্রফেসর মনিরুজ্জামান ও মনিরউদ্দিন আহমেদ। যদিও ওই কমিশন মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। মাত্র ২৭ মাসের মাথায় ২০০৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করেন। দ্বিতীয় দফায় ২০০৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান লে. জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরী, কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পান আবুল হাসান মঞ্জুর মান্নান ও মো. হাবিবুর রহমান। ঠিক দুই বছরের মাথায় ২০০৯ সালের মার্চে এই কমিশনের চেয়ারম্যান লে. জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। তবে, দুই কমিশনার থেকে যান। কমিশনাররা তাদের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।দুদকের তৃতীয় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান গোলাম রহমান। ২০১১ সালে আগের কমিশনের দুই কমিশনারের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তার দায়িত্ব পালন শেষে বিদায় নেন। এ সময় চেয়ারম্যান থেকে যান গোলাম রহমান। দুই কমিশনারের ফাঁকা পদে ২০১১ সালের ১৪ মার্চ যোগদান করেন কমিশনার মো. বদিউজ্জামান ও কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন। ২০১৩ সালে চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের মেয়াদ চার বছর পূর্ণ হলে তিনি অবসরে যান। এ সময় তার শূন্য পদে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান মো. বদিউজ্জামান। দুদক সূত্র জানায়, দুদক আইন অনুযায়ী প্রথমে চার বছর করে কমিশনারদের দায়িত্ব থাকলেও পরে ২০১৩ সালের নভেম্বরে তা সংশোধন করে পাঁচ বছর করা হয়। আইনের ৬ (৩) ধারায় মেয়াদ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘কমিশনারগণ, ধারা ১০ এর বিধান সাপেক্ষে, তাহাদের যোগদানের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসর মেয়াদের জন্য স্ব-স্ব পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন’। সেই অনুযায়ী আগামী মার্চে দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ পূর্ণ হয়ে যাবে। আর এই মেয়াদ পূর্ণ করতে সক্ষম হলে বর্তমান চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান হবেন দ্বিতীয় চেয়ারম্যান যিনি পূর্ণ মেয়াদ দায়িত্ব পালন করলেন। অন্যদিকে দুদক আইনের ধারা ৬(৪)এ বলা হয়েছে, ‘উক্ত মেয়াদ অতিবাহিত হইবার পর কমিশনারগণ পুনঃনিয়োগের যোগ্য হইবেন না’। সে হিসেবে যতক্ষণ পর্যন্ত নতুন করে আইন সংশোধন না করা হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত পুরাতন কমিশনারা নতুনভাবে নিয়োগ পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকছে না।

     

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬/এম এ রহমান/এসএন