জাতীয়

চলে গেলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদকঢাকা, ১১ জানুয়ারি : পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)।

শনিবার রাত নয়টা ৫৩ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত নয়টা ২০ মিনিটের দিকে হাবিবুর রহমান বাসায় মাথা ঘুরে পড়ে যান। এরপর তাকে দ্রুত ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত নয়টা ৫৩ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিত্সক হাবিবুর রহমানকে মৃত ঘোষণা করেন।

হাবিবুর রহমানের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তার চিকিত্সক। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

গুণী এই আইন বিশেষজ্ঞের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আলাদা শোকবাণীতে তারা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশের আইন, সংস্কৃতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিচারপতি হাবিবুর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের বিচারব্যবস্থায় তার অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবেও তার সাহসী ভূমিকার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবে জাতি।

জন্ম ও পরিচয়

১৯২৮ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গীপুর মহকুমার দয়ারামপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। তার বাবা মৌলভী জহিরউদ্দিন বিশ্বাস ছিলেন পেশায় আইনজীবী। মা গুল হাবিবা ছিলেন গৃহিণী। তবে হাবিবুর রহমানের বাবা রাজনীতিতেও ছিলেন পরিচিত মুখ। জহিরউদ্দিন বিভিন্ন সময়ে আঞ্জুমান এবং মুসলিম লীগ আন্দোলনের সাংগঠনিক পর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জাতীয় যুক্তফ্রন্টের বিভাগীয় নেতা হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন জহিরউদ্দিন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে তাকে গ্রেপ্তার করে বহরমপুর কারাগারে পাঠায়। অবশ্য কয়েক দিন পরই জহিরউদ্দিন বিশ্বাস মুক্তি লাভ করেন। ভারতভাগের পর ১৯৪৮ সালে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে জহিরউদ্দিন বিশ্বাস রাজশাহীতে চলে আসেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

পড়াশোনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে ১৯৪৯ সালে বিএ সম্মান ও ১৯৫১ সালে এমএ পাস করেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। পরবর্তী সময়ে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আধুনিক ইতিহাসে ১৯৫৮ সালে বিএ সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন

ভাষা আন্দোলনের বছর ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক হিসেবে হাবিবুর রহমান তার কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানে তিনি ইতিহাসের রিডার (১৯৬২-৬৪) ও আইন বিভাগের ডিন (১৯৬১) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৪ সালে তিনি আইন ব্যবসাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ঢাকা হাইকোর্ট বারে যোগ দেন। তিনি সহকারী অ্যাডভোকেট জেনারেল (১৯৬৯), হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট (১৯৭২) প্রভৃতি দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলেরও (১৯৭২) সদস্য ছিলেন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন।

১৯৮৫ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নিয়োগ লাভ করেন। তিনি ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯০-৯১ মেয়াদে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে হাবিবুর রহমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ সালে প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। তার অধীনে ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

গ্রন্থ রচনা

তার সফল পদচারণ ছিল লেখালেখিতেও। দীর্ঘ জীবনের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ের ওপর লিখেছেন বেশ কিছু বই। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য : যথাশব্দ (১৯৭৪), মাতৃভাষার সপক্ষে রবীন্দ্রনাথ (১৯৮৩), বচন ও প্রবচন (১৯৮৫), বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক (১৯৯৬), কোরান শরীফ : সরল বঙ্গানুবাদ (২০০০)।

স্বীকৃতি

বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বেশ কয়েকটি সম্মানজনক পুরস্কার।

রাইজিংবিডি / লিমন / আবু