জাতীয়

চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে বখতিয়ারের পদযাত্রা 

ট্রেনযাত্রায় জনপ্রিয়তার পাশাপাশি যাত্রীদের মাঝে নিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়ছে। চলন্ত ট্রেনে পথের দু’পাশ থেকে পাথর ছুঁড়ে মারার ঘটনা এখন যাত্রীদের মাঝে এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে। 

এ অবস্থায় সচেতনতা সৃষ্টিতে এক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন বেলগাছিয়ার বন্যপ্রাণীর বন্ধু নামে পরিচিত বখতিয়ার হামিদ ও তার একসঙ্গী।

বখতিয়ার হামিদ পেশায় একজন শিক্ষক। বেলগাছির গাইদঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি তার এলাকায় একজন পরিবেশবিদ হিসেবে পরিচিত। তিনি একজন দক্ষ ওয়াইল্ড ফটোগ্রাফার।

প্রচারণার অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে পায়ে হেঁটে তারা চুয়াডাঙ্গার বেলগাছি থেকে কুষ্টিয়ার হালসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এইপথের দূরত্ব প্রায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গতবছর জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে ১১০টি। এতে জানালার কাঁচ ভেঙেছে ১০৩টি, আর আহত হয়েছেন ২৯ জন যাত্রী।

এ বিষয়ে বখতিয়ার হামিদ সোমবার রাইজিংবিডিকে বলেন, ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করতে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে মঙ্গলবার সকাল ৯ টায় হেঁটে বেলগাছি থেকে আনসারবাড়িয়া যাত্রা শুরু করবো। এই পথের দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। রাতে চুয়াডাঙ্গা অবস্থান করে পরের দিন চুয়াডাঙ্গা স্টেশন থেকে হালসা পর্যন্ত যাবো। এসময় আমরা পথের দু’পাশের অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের এলাকায় যাতে চলন্ত ট্রেনে কেউ ঢিল না ছুঁড়েন, সে বিষয়ে তাদের সচেতন করার চেষ্টা করবো। এসময় আমার তাদের হাতে সচেতনতামূলক হ্যান্ডবিল তুলে দেবো। সেইসাথে বন্যপ্রাণী রক্ষায় রেললাইনের ঝোপঝাড়গুলো সংরক্ষণ করার জন্যেও জনসচেতনতা সৃষ্টি করবো।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য মতে- দেশের ২০টি স্থান ট্রেনে পাথর নিক্ষেপপ্রবণ এলাকা। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা হটস্পট। এটা জানার পরই জনসচেতনতার বিষয়টি মাথায় আসে। তাছাড়া খুবভালো করে আমি পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি যে, রেললাইনের দু-পাশের ঝোপগুলোর অনেক প্রাণী আশ্রয়স্থল বিলীন হয়ে গেছে। এসব ঝোপে যেমন- শেয়াল, খরগোশ, বেজি, বনবিড়াল, সাপ, পাখি ইত্যাদি আশ্রয় নিয়ে থাকে। তাই এগুলোও সংরক্ষণ করা দরকার।

বেশ কিছুদিন থেকে নিরাপদ ও আরামদায়ক যাতায়াতে দেশে ট্রেনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে সংস্থাটি। ট্রেনের বগিগুলোও এখন বেশ পরিচ্ছন্ন-আরামদায়ক। দূরযাত্রায় তাই পছন্দের শীর্ষে থাকে ট্রেন। এত সবকিছুর পরেও পাথর নিক্ষেপকারীরা যাত্রীদের সুখের যাত্রায় আতঙ্ক হিসেবে সামনে দাঁড়ায়। পাথরের আঘাতে জানালার কাঁচ ভেঙে অনেক যাত্রী আহত হচ্ছেন।  কিন্তু এটা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না রেলওয়ে বিভাগ। সম্প্রতি যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্রেনের জানালাগুলোতে লোহার নেট লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

যাত্রীদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো অঞ্চলে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। নিক্ষেপ করা এই পাথরে নারীশিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হচ্ছেন। পাথর ছোঁড়া এই মানুষগুলো এখন যাত্রীদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। রেলওয়ে বিভাগ কোন পদক্ষেপই নিতে পারছে না। রেলওয়ে আইনে পাথর নিক্ষেপের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। সেটাও যদি নিক্ষেপকারীকে শনাক্ত করা যায়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটা সম্ভব হয় না।

এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম বলেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করা হয় এমন ২০টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। ট্রেনে পাথর ছোঁড়ার অপরাধে ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাথরের আঘাতে কোন যাত্রীর মৃত্যু হলে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, পাথর নিক্ষেপকারীদের শনাক্ত করা বেশ কষ্টসাধ্য। মাঝে মধ্যে যাদের শনাক্ত করা হয় তাদের বেশির ভাগই শিশু, ভবঘুরে অথবা মানসিক রোগী। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় কোন পদক্ষেপ নেওয়া যায়না। এ কারণে জনগনের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরী। তাই রেলবিভাগের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক কর্মসূচী আরো জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রেল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিমাঞ্চলের ১০টি জেলার ১৫টি স্থান পাথর নিক্ষেপপ্রবণ। এলাকাগুলো হচ্ছে চুয়াডাঙ্গা,নাটোরের আব্দুলপুর, সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন, বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম রেলওয়ে স্টেশন, পাবনার মুলাডুলি, পঞ্চগড় জেলা ও ঠাকুরগাঁও জেলার কিসমত-রুহিয়া, পাবনার ভাঙ্গুরা,বড়ালব্রিজ রেলওয়ে এলাকা,বগুড়ার ভেলুরপাড়া,গাইবান্ধার বামনডাঙ্গা, জয়পুরহাটের আক্কেলপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকা, খুলনার ফুলতলা স্টেশন এলাকা এবং সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, সলপ ও জামতৈল স্টেশন এলাকা।

এছাড়া পূর্বাঞ্চলের চার জেলার ৫টি জায়গায় পাথর নিক্ষেপপ্রবণ বলে রেলওয়ে বিভাগ চিহ্নিত করেছে। এগুলোর মধ্যে চট্রগ্রামের পাহাড়তলী ও সীতাকুন্ড-বাড়বকুন্ড, ফেনীর ফাজিলপুর-কালিদহ, নরসিংদী শহর, জিনারদী ও ঘোড়াশাল এলাকা। এছাড়াও হবিগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জসহ আরো কিছু জায়গায় চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে অনেক যাত্রী আহত হন।

আশার বিষয় চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগসহ জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে রেলওয়ে। পাথর নিক্ষেপে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত রেল-পুলিশের টহল বাড়ানোসহ স্কুলশিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, মসজিদ-মন্দিরের ইমাম-পুরোহিতদের সহযোগিতায় জনসচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া কেউ পাথর নিক্ষেপকারীকে ধরিয়ে দিলে তাকে ১০ হাজার টাকা পুরস্কারের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

বখতিয়ার হামিদ বলেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ একটি অমানবিক কাজ। যারা এটা করেন তারা অনেকটা না বুঝেই করেন। কেউ কেউ খেলার ছলে করে থাকেন। এটার বন্ধ করতে আইনের প্রয়োগের চেয়ে সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টিটাই বেশি কার্যকর হবে। তাই আমরা ৫০ মাইল পায়ে হেঁটে সচেতনতামূলক কর্মসূচী পালনের উদ্যোগ নিয়েছি।