সম্প্রতি মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় নাশকতার কোনো প্রমাণ মেলেনি। মেট্রোরেলের নকশার ত্রুটি ও নিম্নমানের বিয়ারিং প্যাডের কারণে সেটি খুলে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
সম্প্রতি মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে একজন নিহত হওয়ার ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতেই উপদেষ্টা এই সংবাদ সম্মেলন করেন।
এর আগে, উপদেষ্টার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন কমিটির সদস্যরা। কমিটি দুর্ঘটনারোধে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাডের হার্ডনেস, কম্প্রেশন সেট ও নিওপ্রিন কন্টেন্ট প্রচলিত স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সঠিক ছিল না বলে কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয় জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, “বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য দেশের বাইরের ল্যাবরেটরিতে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে। এছাড়া, বিয়ারিং প্যাড কিছুটা ঢালু অবস্থায় (০.৮% স্লোপ) সন্নিবেশিত করা হয়েছে। বিয়ারিং প্যাড বিচ্যুতির ক্ষেত্রে এর কিছুটা প্রভাব রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।”
ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনটির উভয় প্রান্তে বৃত্তাকার এলাইনমেন্ট অবস্থিত জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, “প্রতীয়মান হয় যে, ভায়াডাক্টের অ্যালাইনমেন্টের সোজা অংশ ও বৃত্তাকার অংশের মধ্যে কোনো ধরনের ট্রানজিশন কার্ড ব্যবহার করা হয়নি। কমিটির অনুসন্ধানে মেট্রোরেলের এই অ্যালাইনমেন্টের নকশায় ত্রুটি থাকতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। কার্ড এলাইনমেন্টের জন্য পৃথকভাবে মডেলিং ও অ্যানালাইসিস করা হয়নি। সোজা এলাইনমেন্টের মডেলিং ও এনালাইসিস দিয়েই কার্ড এলাইনমেন্টের জন্য নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে।”
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, কমিটি ট্রেন চলাকালীন পরিচালিত কম্পন পরিমাপে বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাড সংশ্লিষ্ট পিয়ারসমূহে (পিয়ার নম্বর-৪৩০ ও পিয়ার নম্বর-৪৩৩) অন্যান্য পিয়ারের তুলনায় কম্পন অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। কার্ড অ্যালাইনমেন্টে নকশায় সম্ভাব্য ত্রুটির কারণে এ অংশে অযাচিত পার্শ্ববল এবং সংশ্লিষ্ট কম্পনের উদ্ভব হচ্ছে, যার সঙ্গে বিয়ারিং প্যাডের বিচ্যুতির সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “অনুসন্ধানে দেখা যায়, কার্ড এলাইনমেন্ট এবং নিকটস্থ স্টেশনে রেলট্র্যাকের নিচে নিওপ্রিন রাবার ম্যাস-স্প্রিং ড্যাম্পার সিস্টেম ব্যবহার করা হলেও মধ্যবর্তী দুর্ঘটনার স্থান সংশ্লিষ্ট ট্রাকের জায়গায় রিজিড ট্র্যাক রাখা হয়েছে। ধারণা করা হয় যে, এসব জায়গায় ম্যাস-স্প্রিং ড্যাম্পার সিস্টেম ব্যবহার করা হলে ভাইব্রেশন কমানো সম্ভব হতো। তবে কমিটি ঘটনার সঙ্গে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের কোনো যোগসাজশ পায়নি।”
কমিটির সুপারিশ তুলে ধরে ফাওজুল কবির খান বলেন, “ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য কার্ড এলাইনমেন্টের সংশ্লিষ্ট স্থানে বিয়ারিং প্যাড যাতে সরে যেতে না পারে সেজন্য যথাযথ কারিগরি ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে সন্নিবেশিত করতে হবে। যার কার্যক্রম ডিএমটিসিএল কর্তৃক বাস্তবায়িত হচ্ছে।”
বিয়ারিং প্যাড সরে যাওয়ার কারণ সুনিশ্চিতভাবে নির্ণয়ের জন্য থার্ড পার্টি ইন্ডিপেডেন্ট কনসালট্যান্ট দিয়ে বিস্তারিত অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে ভায়াডাক্টের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ও ট্র্যাক ডিজাইনের গভীর পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। মেট্রোরেলের সার্বিক প্রজেক্ট ডিজাইনের ওপর একটি থার্ড পার্টি সেফটি অডিট পরিচালনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান
কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য অতি দ্রুত একটি কার্যকর ও যথাযথ স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন করতে হবে। সর্বোপরি, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিদেশি পরামর্শকের কাছ থেকে স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের কাছে টেকনোলজি ট্রান্সফার নিশ্চিতে জোর প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির প্রধান ছাড়াও সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ড. এ বি এম তৌফিক হাসান, এমআইএসটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জাহিদুল ইসলাম, বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিযারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. খান মাহমুদ আমানত উপস্থিত ছিলেন।
২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে রাজধানীর ফার্মগেটে মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড পড়ে আবুল কালাম নামে একজন পথচারী নিহত হন।