জাতীয়

ক্যাব যুব সংসদের ১৩ দফা নির্বাচনি ইশতেহারে যুক্ত করার দাবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারে জ্বালানি খাত সংস্কারে ১৩ দফা যুক্ত করার দাবি জানিয়েছে ক্যাব যুব সংসদ।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি হলে সংবাদ সম্মেলনে এসে এই দাবি তুলে ধরে সংগঠনটি।

সংবাদ সম্মেলন লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ক্যাব যুব সংসদের প্রতিনিধি অরিত্র রুদ্র ধর। 

তিনি বলেন, “আইএমএফ-এর ঋণের শর্ত পূরণের অজুহাতে ভর্তুকি প্রত্যাহরের জন্য ২০২৩ সালে বিইআরসি (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন) আইন পরিবর্তন করে মূল্যহার পরিবর্তনের ক্ষমতা সরকার নিজের হাতে নেয় এবং এক বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যহার গড়ে কম-বেশি ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করে। কিন্তু লুণ্ঠনমূলক ‘ব্যয় ও মুনাফা’ মুক্ত বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হলে বিদ্যমান মূল্যহার কমানো যেত এবং ভর্তুকিবিহীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি লাভজনক হতো।”

ভোক্তাদের এমন যৌক্তিক বক্তব্য সরকার কখনো আমলে নেয়নি বলে মন্তব্য করে অরিত্র রুদ্র ধর বলেন, “বিদ্যুৎ ও জ্বালানিকে লুণ্ঠনমূলক ‘ব্যয় ও মুনাফা’ মুক্ত করার ব্যাপারে সরকার কখনো এগিয়ে আসেনি। উপরন্তু সরকার ও সরকারি সংস্থা বা কোম্পানি চলমান এই লুণ্ঠনে সক্রিয় অংশগ্রহণে পিছপা হয়নি।” 

তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাত রূপান্তরের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিগত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে একদিকে সরকারের জ্বালানি নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকার মতো উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহের নীতি সহায়তায় বিনিয়োগ সুরক্ষার নামে বিনিয়োগকারীর অবাধ লুণ্ঠন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইন, নীতি ও চুক্তির ক্রমবিকাশ ঘটেছে, অন্যদিকে জ্বালানি অধিকার সংরক্ষণে চলমান লড়াই-আন্দোলন বেগবান হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ হতাহতের শিকার হয়েছে।”

ফুলবাড়ী আন্দোলন ও হত্যাকাণ্ড, কানসাট বিদ্রোহ ও গণহত্যা, টাটার জ্বালানি ও জ্বালানিজাত পণ্য রপ্তানি প্রকল্পবিরোধী আন্দোলন, কাফকো চুক্তিসহ পাইপ লাইনে স্থলভাগের গ্যাস ও এলএনজি হিসেবে সাগরের গ্যাস রপ্তানিবিরোধী আন্দোলন, সুন্দরবন সুরক্ষায় রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রবিরোধী আন্দোলন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাবিরোধী অন্দোলন, প্রতিযোগিতাবিহীন বিনিয়োগের জন্য প্রণীত বিশেষ বিধান আইনবিরোধী আন্দোলন, লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও লুণ্ঠনমূলক মুনাফা সমন্বয়ে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণে বিইআরসি আইন পরিবর্তনবিরোধী আন্দোলন, ইত্যাদি জ্বালানি অধিকার আদায়ের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসকে গুরুত্বপূর্ণ এবং জাতির জন্য এক গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।  

এসময় বলা হয়, জ্বালানি অপরাধ, জ্বালানি দারিদ্র্য, জ্বালানি অধিকার, জ্বালানি সুবিচার ও জ্বালানি নিরাপত্তা- এসব মানদণ্ডে চলমান জ্বালানি রূপান্তর জনস্বার্থবিরোধী এবং এই রূপান্তরে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মানবতাবিরোধী গণশত্রু হিসেবে অপরাধী।

ক্যাব যুব সংসদের ১৩ দফা দাবি (১) বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাত থেকে পুনরায় সেবাখাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সরকারি সেবা মুনাফা মুক্ত নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ কস্ট প্লাস নয়, কস্টভিত্তিক নিশ্চিত করা;

(২) জ্বালানি দক্ষতা ও সংরক্ষণ উন্নয়নের মাধ্যমে বর্তমানের তুলনায় জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি গড়ে আগামী সরকারের ৫ বছর মেয়াদে কমপক্ষে ৫ শতাংশ কমানো নিশ্চিত করা;

(৩) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রেখে ওই ৫ বছরে গড়ে ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং ছোট শিল্প হিসেবে এই বিদ্যুৎ উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া;

(8) এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি ৫ বছরের জন্য রোহিত করা এবং কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি নিষিদ্ধ করা;

(৫) গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থে গণশুনানির ভিত্তিতে স্থলভাগের শতভাগ গ্যাস বাপেক্সসহ দেশীয় কোম্পানির মাধ্যমে শতভাগ অনুসন্ধান ও উত্তোলন নিশ্চিত করা;

(৬) গণশুনানির ভিত্তিতে ছাতক (পূর্ব) ও ভোলা বা দক্ষিণাঞ্চলের অব্যবহৃত গ্যাস ব্যবহারের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন নিশ্চিত করা;

(৭) আদানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করানো এবং আদানির বিদ্যুৎ আমদানি রদ নিশ্চিত করা;

(৮) ক্যাবের দায়ের করা স্পিডি অ্যাক্ট ২০১০ রোহিতকরণ অধ্যাদেশ ২০২৪-সংক্রান্ত রিট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে এই আইনের আওতায় সম্পাদিত সব চুক্তি ও লাইসেন্স বাতিলসহ সকল ফার্নেস অয়েল-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করা;

(৯) ওইসব চুক্তির কারণে রাষ্ট্রের যত আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আদায় নিশ্চিত করা;

(১০) জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসেবে বিচার নিশ্চিত করা;

(১১) (ক) লুণ্ঠনমূলক ‘ব্যয় ও মুনাফা’ মুক্ত করে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যয় কমিয়ে বিদ্যমান মূল্যহার কমানো এবং (খ) এলপিজির বাজার ওলিগোপলি থেকে মুক্ত করার জন্য এলপিজি অপারেটরস এসোসিয়েশন আব বাংলাদেশ (লোয়াব)-এর কর্তৃত্ব রদ করা, উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশি-বিদেশি ব্যাবসায়ীদের প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির লাইসেন্স প্রদান করা, সরকারি মালিকানায় এলপিজি টারমিনাল ও ওয়েল রিফাইনারি করা এবং সরকারি মালিকানায় এলপিজির ৫০ শতাংশ আমদানি ও স্টোরেজক্ষমতা উন্নয়ন নিশ্চত করা;

(১২) বিইআরসির জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিইআরসির বিরুদ্ধে আনীত ক্যাব-এর অভিযোগ দ্রুত নিস্পত্তি করা, ক্যাব প্রস্তাবিত বিইআরসি আইন সংশোধনী প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা ও সেই সঙ্গে ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতি ২০২৪-এর আলোকে গণবান্ধব জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করা এবং

(১৩) আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসা সুরক্ষায় প্রণীত জ্বালানি সনদ চুক্তি ১৯৯২ স্বাক্ষরে সরকারকে বিরত রাখা।

ক্যাব যুব সংসদ প্রত্যাশা ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের জন্য ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতি ২০২৪-এর আলোকে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে যেসব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী প্রতিযোগিতা করছেন, তারা জাতীয় স্বার্থে নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নে উল্লিখিত ১৩ দফা দাবি বিবেচনায় নেবেন।