জাতীয়

রেকর্ড ব্যয়ের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নজিরবিহীন প্রস্তুতি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ভোটার, ভোটকেন্দ্র, নির্বাচন কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনে নজিরবিহীন প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে সারাদেশে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের নির্বাচনি ইতিহাসে এবারই প্রথম সর্বোচ্চ ব্যয়ে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে ইসি।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন, পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। এই বিপুল ভোটার উপস্থিতি সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ ভোটকেন্দ্র রয়েছে ২১ হাজার ২৭৩টি এবং গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ২১ হাজার ৫০৬টি। ২৯৯টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী।

ভোটগ্রহণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিয়োজিত থাকছেন মোট ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন নির্বাচন কর্মকর্তা। এর মধ্যে ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিজাইডিং অফিসার, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নির্বাচন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।

নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক সংখ্যক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার সেনাসদস্য, ৩ হাজার ৫০০ জন বিমান বাহিনীর সদস্য, ৫টি জেলার ১৭টি আসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ৫ হাজার নৌবাহিনীর সদস্য এবং ১ হাজার ২১০ প্লাটুন বিজিবি, যা মোট ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন সদস্যের সমান। এছাড়া, ১০টি জেলার ১৭টি আসনের ৩৩২টি ভোটকেন্দ্রে র‍্যাবের ৩ হাজার ৫৮৫ জন সদস্য মোতায়েন থাকবে।

পুলিশ বাহিনীর ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন সদস্য সারা দেশে দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন আনসার সদস্য ও ৯ হাজার ৩৪৯ জন আনসার ভিডিপি সদস্য ভোটকেন্দ্র ও এর আশপাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। এছাড়া, বিএনসিসির ১২৮টি সেকশনের ১ হাজার ৯২২ জন সদস্যও নির্বাচনি দায়িত্বে থাকবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই সমন্বিত উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বহুমাত্রিক ও শক্তিশালী করা হয়েছে।

নির্বাচনি ব্যয়ের দিক থেকেও এবারের নির্বাচন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজন করতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, যা আগের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা মোট নির্বাচনি ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ।

আইনশৃঙ্খলা খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে আনসার বাহিনী ৫৪৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা। পুলিশ বাহিনীর জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৭০ কোটি ২১ লাখ টাকা। তিন বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী) জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৮৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সেনাবাহিনী পাচ্ছে ১৪৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, নৌবাহিনী ২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং বিমান বাহিনী ১৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

এছাড়া, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পাচ্ছে ১০০ কোটি ১৭ লাখ টাকা, কোস্ট গার্ড ৩৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা, র‍্যাব ২১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা এবং গ্রাম পুলিশের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অন্যান্য সংস্থার মধ্যে ফায়ার সার্ভিস পাচ্ছে ১ কোটি টাকা, এনটিএমএসি ৫২ লাখ, স্বশস্ত্র বিভাগ ৫৫ লাখ, ডিজিএফআই ২ কোটি এবং স্বরাষ্ট্র বিভাগ পাচ্ছে ৪০ লাখ টাকা।

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিপুল ব্যয় ও জনবল নিয়োগের মাধ্যমে নির্বাচনকে ঘিরে যেকোনো ধরনের সহিংসতা, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার নির্বাচনের পরিবেশ ভালো। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা না ঘটলে পরিস্থিতি আরো ভালো হতো।”

রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার ও সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার বলেন, সৌহার্দপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে বহু প্রতীক্ষিত এই নির্বাচন সম্পন্ন করতে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২২০ জন।

সারাদেশে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হওয়ায় বুথ ও ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে ব্যালট গণনায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে।

নির্বাচন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দায়িত্ব পালন করবেন মোট ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা। এর মধ্যে ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং কর্মকর্তা। 

ভোট পর্যবেক্ষণে থাকবে ৮১টি পর্যবেক্ষণী সংস্থার ৫৫,৪৫৪ জন দেশি পর্যবেক্ষক। বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক থাকছেন ৫৪০ জন।

এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫১টি রাজনৈতিক দল। মোট প্রার্থী ২ হাজার ২৯ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৪ জন।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি ২৯১ জন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন প্রার্থী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা এবং জাতীয় পার্টির ১৯৮ জন প্রার্থী লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৭৬ জন ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন।