রক্তে আগুন ঝরা জুলাই অভ্যুত্থানের পর এক অনিশ্চিত, উত্তাল সময় অতিক্রম করে বাংলাদেশ এখন দাঁড়িয়ে এক নতুন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে। দীর্ঘদিনের বিতর্কিত নির্বাচন, অবিশ্বাস ও অচলাবস্থার পর অবশেষে ভোটকেন্দ্রমুখী হচ্ছে মানুষ— শুধু সরকার বেছে নিতে নয়, বরং গণতান্ত্রিক যাত্রাপথ নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারসংক্রান্ত গণভোটকে তাই অনেকে দেখছেন এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের মাহেদ্রক্ষণ হিসেবে।
এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। প্রায় দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ এবার ভোটের মাঠে নেই। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।
অন্যদিকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিয়েছেন। ফলে দেশের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন মেরুকরণ। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন বিএনপির ধানের শীষ ও জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লার মধ্যে। আর সমমনা হিসেবে এবং ঐক্য করে দুটি প্রধান দল ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে বিভক্ত নীতি-আদর্শের শক্তিশালী, যার চূড়ান্ত লড়াই আজ ভোটের ময়দানে দেখা যাবে।
প্রায় ১৩ কোটি ভোটার বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হচ্ছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ গণভোট, যেখানে রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার নিয়ে জনগণের মতামত চাওয়া হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, সারাদেশে প্রায় ৪৩ হাজার কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এ নির্বাচনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, বহু তরুণ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন; আবার অনেকে দীর্ঘদিন পর প্রকৃত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। তাই নির্বাচন যেন শঙ্কামুক্ত, বিশ্বাসযোগ্য ও উৎসবমুখর অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়, তা নিশ্চিত করা সবার নৈতিক দায়িত্ব।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনও ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ফলাফল মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘদিন পর বাস্তব প্রতিযোগিতামূলক ভোটের সম্ভাবনা। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্নের মুখে পড়ে। ২০১৪ সালে বহু আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়, ২০১৮ সালে কারচুপির অভিযোগ এবং ২০২৪ সালে সীমিত প্রতিযোগিতার নির্বাচনের পর জনগণের মধ্যে ভোটব্যবস্থা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক পুনরারম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে নির্বাচনি প্রচারের উৎসবমুখর আবহের পাশাপাশি শঙ্কা দেখা গেছে। তফসিল ঘোষণার পর শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড থেকে কয়েকশ সহিংসতার ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের খবর পাওয়া গেছে। ভোটের আগমুহূর্তে কিছু এলাকায় টাকা দিয়ে ভোট কেনার অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার পরও প্রশাসন বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মাঠে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি জনমনে আস্থার সঞ্চার করেছে।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন, পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেন।
৩০০ আসনের তফসিল হলেও শেরপুরে একজন প্রার্থী মারা যাওয়া সেটি স্থগিত রেখে বাকি ২৯৯টিতে ভোট হচ্ছে। মোট ৫০টি দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে ২০২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
লন্ডনে ১৭ বছর কাটিয়ে দেশে ফিরে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনি প্রচারে সক্রিয় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনের শরিক কয়েকটি দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে তিনি পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও শাসনব্যবস্থার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন। তবে নারী প্রতিনিধিত্ব ও কিছু বক্তব্য নিয়ে দলটি বিতর্কের মুখেও পড়েছে।
ইশতেহারে বিএনপি পরিবার কার্ড, কৃষি বীমা, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের জন্য মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন এবং আইটি খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের মতো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিপরীতে জামায়াত ২৬টি অগ্রাধিকার ও ৪১ দফা কর্মসূচিতে দুর্নীতিমুক্ত শাসন, যুব কর্মসংস্থান, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে— যার বাস্তবতা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও তরুণদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছে, যা নতুন রাজনৈতিক প্রজন্মের অংশগ্রহণের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি আস্থা পুনর্গঠন, রাজনৈতিক ভারসাম্য পুনর্নির্মাণ এবং গণতন্ত্রের পথচলায় নতুন অধ্যায় রচনার পরীক্ষা। ভোটার উপস্থিতি, ভোটের পরিবেশ ও ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতাই নির্ধারণ করবে— জুলাইয়ের অগ্নিপরীক্ষা পেরিয়ে বাংলাদেশ সত্যিই কি নতুন এক গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু করতে পারল।