জাতীয়

ভোটের মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাড়ে ৯ লাখ সদস্য

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে ৬ হাজার ৭৪৮টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এ কারণে এসব কেন্দ্রকে নিরাপত্তা বেশি গুরুত্ব দিয়ে সারাদেশের ভোটকেন্দ্রে সাড়ে ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ,  র‌্যাব, বিজিবি, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নির্বাচনে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার ৭৬১টি। এর মধ্যে ২ লাখ ৬০ হাজারের মতো ভোটকক্ষ রয়েছে। গোপন বুথ ৪ লাখের মতো। নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছে পুলিশ। ঢাকার পর অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে। এই বিভাগের ১১টি জেলায় ভোটকেন্দ্র ৭ হাজার ৩৪৭টি। এর মধ্যে ৮১৩টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ব্রাক্ষণবাড়িয়ায়  ১১৩, কুমিল্লায় ৯৩, চাঁদপুরে ৬২, লক্ষ্মীপুরে ৫৪, নোয়াখালীতে ১০৬, ফেনীতে ৫৫, খাগড়াছড়িতে ৭০, রাঙ্গামাটিতে ৪৫, বান্দরবানে ৭০, চট্টগ্রামে ৮৫ ও কক্সবাজারে ৬০টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

আর ঢাকা শহরে ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৮৫৩টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। এর মধ্যে, মতিঝিলে ১০টি, বাড্ডায় ১২টি, মিরপুরে ১৫৫টি, পল্লবীতে ১২টি, ধানমন্ডিতে ৪টি, মোহাম্মদপুরে ৫৪টিসহ মোট ৮৫৩টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে আগে থেকেই রেকি শুরু করেছে পুলিশ। এই সব ভোট কেন্দ্রগুলোতে কারা প্রভাব বিস্তার করতে পারে তার একটা ধারণা নিয়েছে পুলিশ। এলাকাগুলোতে দুর্বৃত্তদের আনাগোনা ঠেকাতে মাঠে অপারেশন চালাচ্ছে পুলিশ। এছাড়াও ভোটের দিন কী-ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া হবে ঝুঁকিপূর্ণ ভোট কেন্দ্রগুলোতে সেই পরিকল্পনা তৈরি করেছে পুলিশ। নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশের দেড় লাখ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া  হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের  বডি ওর্ন ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে ।

অন্যদিকে গুজব রোধে মাঠে কাজ করছে পুলিশ। স্যোশাল মিডিয়ায় যাতে কেউ গুজব তৈরি করতে না পারে সেই দিকে নজর রাখছে পুলিশ। এজন্য সাইবার টিমকে সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে ডিএমপির সাইবার টিম মাঠে কাজ করছে। এছাড়াও গুজব রোধে এলাকাভিত্তিক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে পুলিশ। নির্বাচনের দিন কেউ যদি হঠাৎ গুজব তৈরি করে তখন সাইবার টিম দেশীয় বিভিন্ন মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাল্টা সঠিক তথ্য দেওয়ার জন্য তারা বক্তব্য দেবে।

পুলিশ জানিয়েছে, ভোটের মাঠে কোন কোন এলাকায় প্রার্থীদের সঙ্গে বিপরীত প্রার্থীদের মধ্যে হট্টগোল হতে পারে এমন এলাকাগুলো ছক তৈরি করেছে পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কুষ্টিয়া, ঢাকার বাড্ডা ও মিরপুর, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, খুলনাসহ একাধিক জেলার তথ্য উঠে এসেছে। এই সব জেলাগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। সুষ্ঠু ভোটের জন্য প্রার্থীদের সঙ্গে জেলা পুলিশের এসপিদের হট লাইন চালু আছে। কোনো ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা হলে প্রার্থীদের সমার্থকরা যেন পুলিশকে সহযোগিতা করে সেজন্য পুলিশ তাৎক্ষণিক প্রার্থীদের ফোন দিবে। 

আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, “সারাদেশে নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। তবে কেউ আইনের ব্যত্যয় ঘটালে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ঘিরে বরাবর যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুলিশের থাকে সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিয়েছে পুলিশ।”

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এখনও ১ হাজার ৩৪০টি খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে, চায়না রাইফেল ১১৩টি, ৭.৬২টি বোরের রাইফেল ১টি, এসএমজি ১৩টি, এলএমজি ৩টি, পিস্তল ২০৭টি, নয়বোরের পিস্তল ৪৫৫টি, শটগান ৩৯২টি, গ্যাস গান ১২৯টি, টিয়ার গ্যাস লাঞ্চার ৭টি ও সিগন্যাল পিস্তল ২টি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

এদিকে নির্বাচন ও গণভোটে নিরাপত্তার অংশ হিসেবে সারাদেশে ৩৭ হাজারের বেশি বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।  ভোটাররা যেন নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্য সামনে রেখেই এই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার সীমান্ত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত আছে। দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৪৮৯টি উপজেলায় বিজিবি নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী ৬১টি উপজেলায় বিজিবি এককভাবে নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবে।

বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়, সারাদেশে নির্বাচনে আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় এক লাখ তিন হাজার সেনাবাহিনী, সাড়ে ৩ হাজার বিমান বাহিনী এবং দেশের পাঁচটি জেলায় ১৭টি আসনে নৌ বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য মোতায়েন থাকবে।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সদস্যের পাশাপাশি নির্বাচনের মাঠে আরো ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৬৫৭ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন  সারাদেশে।

আনসার সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রায় ৬ লাখ সদস্য সারাদেশের নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন করা হয়েছে। তারা পুলিশসহ সরকারের অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে  সমন্বয় করে ভোটগ্রহণ, গণনা এমনকি ব্যালট বাক্স পাহাড়াসহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) ও অতিরিক্ত আইজিপি একেএম শহিদুর রহমান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট উপলক্ষ্যে সমগ্র দেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি র‌্যাবও সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের জারিকৃত নিদের্শনা মেনে র‌্যাব কাজ করছে।