জাতীয়

‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ কী 

শেষ হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীদের অনেকে অভিযোগ তুলছেন, তাদের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে পরাজিত করা হয়েছে। “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” আসলে কী এ প্রশ্ন এখন অনেকের মনে।

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে সাধারণ অর্থে নির্বাচনের ফলাফল বা পুরো প্রক্রিয়াকে কৌশলে প্রভাবিত করাকে বোঝায়, যাতে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দল সুবিধা পায়। এটি আইনগত বা প্রশাসনিক নানা পদ্ধতি ব্যবহার করে ভোটের আগে, চলাকালে বা পরে ফলাফলকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে এটি কোনো স্বীকৃত আইনি পরিভাষা নয়; বরং রাজনৈতিক ভাষায় ব্যবহৃত একটি অভিযোগভিত্তিক শব্দ।

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কখন ও কীভাবে হতে পারে

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শুধু নির্বাচনের দিনেই ঘটে—এমন নয়। অনেকের মতে, এটি নির্বাচনের আগেই শুরু হতে পারে।

নির্বাচনের আগে যেভাবে হয়—

নির্বাচনি সীমানা পুনর্নির্ধারণে (ডেলিমিটেশন) পক্ষপাত: নির্বাচনি এলাকা এমনভাবে ভাগ করা যাতে কোনো দল সুবিধা পায়। একে অনেকে “জেরিম্যান্ডারিং” বলেন।

প্রশাসনিক প্রভাব: ভোটকেন্দ্র স্থাপন আইনশৃঙ্খলা বা স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। প্রার্থী বাতিল বা গ্রহণে বৈষম্য: মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ।

নির্বাচনের দিন যেসব হয়—

ভোটগ্রহণ বা গণনায় অনিয়ম: ভোট কারচুপি, ফলাফল বদল, বা গণনায় স্বচ্ছতার অভাব। ভোটার উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ: ভয়ভীতি, কেন্দ্র দখল বা ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া।

যেসময় “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” অভিযোগ বেশি সামনে আসে— জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলে এবং অল্প ব্যবধানে ফল নির্ধারিত হলে।  স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলে—যদি পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যম বা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা পুরো প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে না পারেন। রাজনৈতিক অবিশ্বাস থাকলে—দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা ফলাফল মেনে নিতে অনীহা তৈরি করে। পূর্বের অভিজ্ঞতা—আগের নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে পরবর্তী নির্বাচনেও একই অভিযোগ জোরালো হয়।

দেশে শব্দটির প্রচলন

মূলত ২০০০ সালের পর বাংলাদেশের নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ শব্দটি বেশি শোনা গেলেও নানা নামে বা ভিন্ন ভিন্ন ফরম্যাটে এর অভিযোগ আগের নির্বাচনগুলোতেও ছিল। বাংলাদেশের এ শব্দটি শোনা যায় বিশেষ করে তখনই, যখন নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, প্রশাসনের ভূমিকা, ভোটগ্রহণ ও গণনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে কারচুপি, কেন্দ্র দখল, ফলাফল প্রভাবিত করা কিংবা সরকারি প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। কখনও বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করেছে, কখনও ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। এসব বিতর্কের প্রেক্ষাপটে ‘কারচুপি’, ‘ভোট ডাকাতি’, ‘প্রভাবিত নির্বাচন’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হলেও ২০০০ সালের পর রাজনৈতিক আলোচনায় “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” পরিভাষাটি বেশি প্রচলিত হয়।

বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা, প্রার্থিতা বাতিল বা গ্রহণ এবং ভোট গণনা প্রক্রিয়া নিয়ে যে বিতর্কগুলো তৈরি হয়—সেগুলোর প্রেক্ষাপটে শব্দটি আরো বেশি উচ্চারিত হতে থাকে।

বাস্তবতা কী?

“ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” মূলত একটি রাজনৈতিক অভিযোগভিত্তিক পরিভাষা। সব ক্ষেত্রে অভিযোগ প্রমাণিত হয় না; আবার কিছু ক্ষেত্রে তদন্তে অনিয়ম ধরা পড়ার নজিরও আছে। কোনো নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা নির্ভর করে তদন্ত, আদালতের রায়, নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা এবং দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনের ওপর।

ফলে শব্দটি রাজনৈতিক বিতর্কে বহুল ব্যবহৃত হলেও প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা আলাদাভাবে মূল্যায়নযোগ্য।