জাতীয়

ভোটের মাঠে বামদের ‘মহাধস’, ১৪৭ আসনের সবকটিতেই জামানত বাজেয়াপ্ত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বামপন্থি চার দলের জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট কোনো আসনেই মুখ রক্ষা করতে পারেনি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এই জোটের প্রার্থীদের মধ্যে একজনও জামানত টিকাতে ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ, যে আসনে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, সেখানে মোট ভোটের আট ভাগের এক ভাগও তারা পাননি।

নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপি ২১২ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে, জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসনে বিজয়ী হয়েছে এবং জাতীয় গণঅভ্যুত্থানের সংগঠকরা ৬ আসনে জিতেছেন। এছাড়া অন্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মিলিয়ে পেয়েছে ১১টি আসন।

জানা গেছে, নির্বাচনের আগে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ নামে বামপন্থি দলগুলো একত্রিত হয়। গত বছরের ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় কনভেনশন থেকে এই জোট গঠিত হয়, যেখানে বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাংলাদেশ জাসদ মিলিতভাবে অংশ নেন। এই জোটে মোট ৮টি বামপন্থি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন সংযুক্ত হয়।

এর মধ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিবন্ধিত চারটি রাজনৈতিক দল হলো- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ জাসদ। জোটভুক্ত দলগুলো মিলিতভাবে ৯৭টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এছাড়া, প্রতিটি দলের নিজস্ব প্রার্থীও যুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে মোট প্রার্থী সংখ্যা ১৪৭। সিপিবির ৬৫টি আসনে প্রার্থী ছিল, বাসদের ৩৭টি আসনে, বাসদ (মার্কসবাদী) ৩৩টি আসনে এবং বাংলাদেশ জাসদের ১৫টি আসনে প্রার্থী ছিল।

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী ছিলেন বাসদের মণীষা চক্রবর্তী। তিনি বরিশাল-৫ আসনে ২২ হাজার ৪৮৬ ভোট পান। তবে অধিকাংশ প্রার্থী এক হাজার ভোটের নিচে পেয়েছেন। ঢাকা-৮ এ বাসদ (মার্কসবাদী) এএইচএম রফিকুজ্জামান আকন্দ পেয়েছেন ৯৬ ভোট, ঢাকা-৭ এ বাংলাদেশ জাসদ এএফএম ইসমাইল চৌধুরী ৫৬ ভোট, সিলেট-১ এ বাসদের প্রণব জ্যোতি পাল মই ১ হাজার ১৩৪ ভোট, খুলনা-১ এ সিপিবি কিশোর রায় ৪ হাজার ৮৪২ ভোট, নেত্রকোনা-১ এ সিপিবি আলকাছ উদ্দিন মীর ৪ হাজার ৪২৯ ভোট পেয়েছেন। জোটের অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশ জাসদ এর সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান পঞ্চগড়-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ৩১০ ভোট পেয়েছেন।

জানা যায়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, একটি আসনে জয়ী বা জামানত রক্ষা করতে হলে প্রার্থীর পাবে মোট ভোটের আট ভাগের এক ভাগ বা তার বেশি ভোট। এই শর্ত পূরণ করতে না পারায়, ১৪৭টি আসনের সব প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন।

বাসদের সাধারণ সম্পাদক ও জোট সমন্বয়ক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, ভোটের শেষ মুহূর্তে ভোটারদের দ্বিদলীয় হিসাবের কারণে আমাদের প্রার্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিফলিত হয়নি। কিছু প্রার্থী জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও শেষ ভোটের হিসাব তাদের সুবিধা দেয়নি।

সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ভোটে দ্বিদলীয় হিসাব প্রাধান্য পেয়েছে। আমাদের দুর্বলতাগুলো পরবর্তীতে বিশ্লেষণ করা হবে।

বাম জোটের অন্তত চারজন প্রার্থী বলেছেন, ফলাফল রাজনীতিতে জনমত তুলে ধরার ব্যর্থতা নয় বরং নির্বাচন ব্যবস্থায় বড় দলগুলোর আধিপত্যের প্রতিফলন। জোটের সাবেক নেতারা মনে করেন, ভবিষ্যতে অন্তর্ভুক্ত দলগুলোকে শক্তিশালী করে আরো কার্যকরীভাবে নির্বাচন পর্বে অংশ নেওয়া সম্ভব। এটি  রাজনৈতিক পরিসরে একটি বড় সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গঠনের প্রয়াস এবং প্রার্থীদের গণসংযোগের সীমাবদ্ধতা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে।

বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কর্মী ছানোয়ার হোসেন বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীরা প্রতিটি আসনে পরাজিত হয়েছেন, জামানত হারিয়েছেন এবং কোনো আসনও জয় করতে পারেননি। এটি বাংলাদেশের বামপন্থি রাজনীতির জন্য একটি বড় আঘাত। ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, ছোট দল ও নতুন জোটগুলো বড় দলগুলোর ছত্রছায়ায় টিকে থাকতে পারছে না। আগামী দিনে এদের পুনর্গঠন ও কৌশলগত সমন্বয় ছাড়া রাজনীতিতে দৃশ্যমান ভূমিকা রাখা কঠিন হবে।