‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ আব্দুল গাফফার চৌধুরীর কালজয়ী এই গানের সুরে তাল মিলিয়ে শিশুদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ মিনারে আসছেন অভিভাবকরা। ১৯৫২ সালের সেই রক্তঝরা রাজপথ থেকে জন্ম নেওয়া অবিনাশী চেতনা এখন আর কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং সেই স্পৃহা আগামী প্রজন্মের ধমনিতে প্রবাহিত করতে একুশের প্রভাতে বাবার হাত ধরে কিংবা মায়ের কোলে চড়ে হাজারো শিশু এসেছে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে দেখা যায়, শিশুরা মা-বাবার সঙ্গে ফুল দিতে শহীদ মিনারে আসছে। এক হাতে ফুল অন্য হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে ছোট ছোট পায়ে হেঁটে এসে মিনারের বেদীতে ফুল দিচ্ছে।
বেসরকারি চাকরিজীবী ইয়াসিন আহমেদ। তিনি তার দুই সন্তান মাগফিরা জাফরিন ও আবরার জায়িম নিয়ে এসেছেন শহীদ মিনারের বেদীতে ফুল দিতে। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে যখন বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাবে দেশীয় ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার পথে তখন সন্তানদের শিকড়ের সন্ধান দিতে এখানে নিয়ে এসেছি। আমরা যে ভাষায় কথা সেই ভাষার জন্য আমাদের বীর যোদ্ধারা জীবন দিয়েছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে শুধুমাত্র ভাষায় জন্য জীবন দিয়েছে আমাদের ভাইয়েরা। তাদের সেই উজ্জ্বল ত্যাগ সন্তানদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে আজকে ওদের নিয়ে আসছি।”
ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে এসেছে ইয়য়ুনা মারমা। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “একুশের চেতনা কেবল বইয়ের পাতায় নয়, ছড়িয়ে পড়ুক আমাদের উত্তরসূরিদের রক্তে। তাই আজ শহীদ মিনারে আমার সন্তানকে নিয়ে আসছি। বাঙালির অস্তিত্ব আর বর্ণমালার অহংকার কোনোদিন মুছে যাবে না। জয় হোক আমাদের প্রাণের ভাষার। আমাদের আগামীর প্রজন্মের মধ্যে একুশে চেতনা ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে।”
মো. মোস্তফা ও মো. আব্দুল্লাহ্ নামের দুই সন্তানকে নিয়ে এসেছেন সরকারি চাকরিজীবী মশিউর রহমান। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “শহীদ মিনারের আঙিনা থেকে আগামী দিনের কাণ্ডারিদের মধ্যে দেশপ্রেম ও মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধ জাগ্রত করার জন্য এই নিরন্তর প্রচেষ্টা। যখন শহীদ মিনারে শিশুরা ছোট ছোট পায়ে বেদীতে ফুল রাখে তখন মনে হয় তারা আমাদের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার গ্রহণ করছে। আমাদের আগামীর প্রজন্মের মাঝে ভাষার গুরুত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই তাদেরকে নিয়ে এসেছি।”
এদিকে শহীদ মিনার চত্বর সর্বস্তরের মানুষের জন্য খুলে দেয়ার পর থেকেই মানুষের ঢল নামে। সকালে শহীদ মিনারে গিয়ে দেখা যায়, খালি পায়ে প্রভাত ফেরিতে দলে দলে মানুষকে অংশ নিতে। হাতে জাতীয় পতাকা, ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাজার হাজার মানুষ সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে শহীদ বেদিতে ফুল দিচ্ছেন। পুরো এলাকা এখন দেশপ্রেম আর একুশের চেতনায় উদ্বেলিত।