উচ্চ সুদ হার, ভঙ্গুর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও চাঁদাবাজি, জ্বালানির অনিশ্চিয়তা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা অর্থনীতির জন্য আত্নঘাতী বলে জানিয়েছেন ঢাকা চেম্বার সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) অডিটোরিয়ামে বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় নবগঠিত সরকারের নিকট প্রত্যাশা শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘‘অপরিবর্তিত পলিসি রেটের কারণে ব্যবসায়ীদের ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ হারে ব্যাংক ঋণ নিতে হচ্ছে। সেই সাথে খেলাপী ঋণের উচ্চ হার এবং ঋণ শ্রেণিকরণের সীমা ৯ মাস হতে ৩ মাসে নামিয়ে আনার কারণে সৃষ্ট আর্থিক খাতে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি শিল্পখাতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। শিল্প-কারখানায় চাহিদামাফিক গ্যাস সরবরাহ না থাকার পাশাপাশি গ্যাসের দাম নতুন শিল্প ও ক্যাপটিভের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে যথাক্রমে ৪০ টাকা ও ৪২ টাকা বৃদ্ধির কারণে আমাদের পণ্য উৎপাদান মারাত্নকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা স্থানীয় চাহিদা ও রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে সামগ্রিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’’
এছাড়াও শিল্প বিষয়ক নীতিমালার ধারাবাহিকতার অনুপস্থিতি, ভঙ্গুর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশেষ করে অসহনীয় চাঁদাবাজির বিষয়টি স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনায় আস্থাহীনতা তৈরি করেছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
দেশের সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অটোমেটেড না হওয়ায় রাজস্ব প্রদানে ব্যক্তিশ্রেণির পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রেই অহেতুক হয়রানির শিকার হচ্ছে, অনেকে করজালের বাইরে থাকায় সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেই সাথে সরকারের রাজস্ব আহরণের গতি স্লথ হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘‘দেশের লজিস্টিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, জমি অধিগ্রহণের দীর্ঘসূত্রিতা ও জমির উচ্চমূল্য, চট্টগ্রামবন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিভিন্ন সেবার হার গড়ে ৪১ শতাংশ বাড়ানো, আভ্যন্তরীণ নদীপথের কার্যকর ব্যবহার না থাকার কারণে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় কয়েকগুন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে পণ্য উৎপাদান ও বিতরণ ব্যয় বাড়ছে, যেটি মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।’’
এলডিসি উত্তরণ বিষয়ে তিনি বলেন, আঙ্কটার্ডের হিসাব অনুযায়ী এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি ৫.৫-৭ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে, যার পরিমাণ প্রায় ২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও স্থানীয় অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা বিবেচনায় রপ্তানিখাতে বড় ধরনের নেতিবাচক অগ্রগতি কাম্য নয় বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে তিনি বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ কমপক্ষে তিন বছর পিছিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিষয়ে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘‘এর ফলে তৈরি পোষাক খাতে শুল্ক মুক্ত প্রবেশাধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত হবে না। এ ছাড়াও এলএনজিসহ অন্যান্য পণ্য আমদানিতে শর্তারোপের কারণে আমাদের ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হবে।’’
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সঙ্গে পুনঃআলোচনার মাধ্যমে চুক্তির শর্তাবলী সংশোধনের জন্য নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নোত্তরে তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘‘দেশের প্রায় ২০ লক্ষাধিক শিক্ষিত তরুণ বেকার, কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকেরই অবৈধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। বিষয়টি মোকাবেলায় তরুণদের শুধু চাকরির উপর নির্ভরশীল না থেকে দক্ষতা উন্নয়ন ও ব্যবসায়ী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে হবে।’’
এ জন্য শর্তাবলী সহজীকরণে সরকারকে আরও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘স্টার্ট-আপ ব্যবসাকে সহজতর করতে বিশেষ করে তরুণদের সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।’’