জাতীয়

পাম্পে দীর্ঘ সারি, তেল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ অবস্থায় ঢাকার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে এখনও দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে যানবাহনের মালিক ও চালকদের। অনেক পাম্পে সরবরাহ সীমিত থাকায় তেল পাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

বুধবার (১১ মার্চ) পুরান ঢাকা, গুলিস্তান, মতিঝিল, রমনা, হাইকোর্ট ও ফার্মগেটসহ বিভিন্ন এলাকার পেট্রোল পাম্প ঘুরে এবং তেল নিতে আসা চালকদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র দেখা গেছে। বেশ কয়েকটি পাম্প আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় যে কয়েকটি পাম্প খোলা রয়েছে, সেগুলোতে তীব্র ভিড় তৈরি হয়েছে।

পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় তেল নিতে আসা মোটরসাইকেলচালক আজমল হোসেন বলেন, “সকালে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে দেখি মোটরসাইকেলে পর্যাপ্ত তেল নেই।”

ধোলাইপাড়ের একটি পাম্পে তেল না পেয়ে তিনি এখানে এসেছেন। তাঁর অভিযোগ, অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল নিয়ে মজুত করছেন। এতে জরুরি প্রয়োজন থাকা মানুষ বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।

রমনা এলাকার একটি পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাইড শেয়ারিং চালক আবদুল ওয়াহাব। তিনি বলেন, “সরকার প্রথমে মোটরসাইকেলের জন্য দুই লিটারের বেশি তেল না দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল। পরে তা পাঁচ লিটার করা হয়েছে। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই অনেক সময় চলে যায়।” একদিন তেল না পাওয়ায় তিনি রাইড শেয়ারিং করতে পারেননি বলেও জানান।

শাহবাগ এলাকায় প্রাইভেটকারে তেল নিতে আসা মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ জানান, বনশ্রীর একটি পাম্পে তেল না পেয়ে তিনি এত দূর এসেছেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু এখনও তেল পাননি।শেষ পর্যন্ত আজ তেল পাবেন কিনা এ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পেট্রোল পাম্প মালিকেরাও। পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “তেলের সরবরাহ নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় তারাও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। মানুষ পাম্পে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, কিন্তু পাম্প মালিকদের হাতে কিছু করার নেই। ডিপো থেকে যতটুকু তেল পাওয়া যাচ্ছে, সবটুকু বিক্রি করা হচ্ছে।”

এদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। নির্দেশনা অনুযায়ী মোটরসাইকেলে প্রতিদিন সর্বোচ্চ পাঁচ লিটার এবং প্রাইভেটকারে ১০ লিটার পর্যন্ত অকটেন বা পেট্রোল দেওয়া যাবে। এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার, পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও কন্টেইনার ট্রাকে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল সরবরাহের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া, ফিলিং স্টেশনগুলোকে তেল বিক্রির সময় তেলের ধরন, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে রসিদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবার তেল কেনার সময় আগের রসিদ দেখানোর কথাও বলা হয়েছে।

সরকারি এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করা যাবে না। অতিরিক্ত মূল্য আদায় আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। মানুষের উদ্বেগের কারণ থাকলেও সরবরাহ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।” মার্চ মাসে সরবরাহে কোনো সংকট নেই বলে তিনি জানান।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ফিলিং স্টেশনগুলোতে মূলত পেট্রোল ও অকটেনের জন্য ভিড় দেখা যাচ্ছে। অথচ পেট্রোল পুরোপুরি দেশে উৎপাদিত হয় এবং অকটেনের বড় অংশও দেশে উৎপাদন করা হয়।” পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি আরো জানান, “এপ্রিল ও মে মাসের সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনায় সরকার আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিকল্প উৎস হিসেবে আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল আমদানির বিষয়েও কাজ চলছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে তেলের সরবরাহ বাড়াতে ভারত সরকারের কাছেও অনানুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।”