জাতীয়

ব্যয়বহুল ডায়ালাইসিসে দিশেহারা কিডনি রোগীরা

রাজধানীর জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের (কিডনি হাসপাতাল) বারান্দায় বসে ছিলেন মোহসীন আহমেদ। ষাটোর্ধ্ব মায়ের জন্য স্বল্প খরচে ডায়ালাইসিস করানোর আশায় বরিশাল থেকে ঢাকায় এসে সিরিয়াল নিতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে, হাসপাতালে এসে জানতে পারলেন এখানে নতুন করে আর কোনো রোগীকে ডায়ালাইসিসের জন্য সিরিয়াল দেওয়া হচ্ছে না। ফলে মায়ের চিকিৎসা কোথায় করাবেন, সেই চিন্তায়ই বিমর্ষ ছিলেন তিনি।

একই রকম ভোগান্তির কথা বললেন, রাজধানীর বাসিন্দা আতাউল গণি। চার মাস চেষ্টা করেও সরকারি হাসপাতালে সিরিয়াল না পেয়ে এখন বাধ্য হয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্ত্রীর ডায়ালাইসিস করাচ্ছেন তিনি।

আতাউল জানান, ‍চিকিৎসকরা জানান, তার স্ত্রীর দুটি কিডনিই প্রায় ৬৫ শতাংশ বিকল হয়ে গেছে। তখন তিনি সরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেন। কোথাও সিরিয়াল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। “সরকারি হাসপাতালে যে খরচ, বেসরকারিতে তার প্রায় পাঁচগুণ দিতে হচ্ছে। সংসার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে,” বলেন তিনি।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব কিডনি দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য- “সুস্থ কিডনি সবার তরে, মানুষের যত্নে বাঁচাও ধরণীকে।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও চিকিৎসা সেবার সুযোগ সে তুলনায় বাড়েনি।

দেশে কিডনি রোগী কত? বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। এই হিসাবে রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গত এক দশকে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

প্রতি বছর নতুন করে ৩০ থেকে ৪০ হাজার রোগীর কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা অনুযায়ী তাদের মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রোগীকে ডায়ালাইসিস, কিডনি প্রতিস্থাপন বা অন্যান্য চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছেন।

হাসপাতালে অপেক্ষমান কিডনি রোগীর স্বজনরা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৮৫ কোটির বেশি মানুষ কিডনি রোগে ভুগছেন। দুই দশক আগে মৃত্যুর কারণ হিসেবে কিডনি রোগের অবস্থান ছিল ২৭তম। বর্তমানে তা অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৪০ সালের মধ্যে এটি মৃত্যুর পঞ্চম প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে।

ডায়ালাইসিসের ব্যয়ে দিশেহারা: কিডনি রোগের চিকিৎসায় সাধারণত দুটি পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়- হেমোডায়ালাইসিস ও পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস। হেমোডায়ালাইসিসে রোগীর শরীর থেকে রক্ত বের করে ডায়ালাইজার নামে কৃত্রিম কিডনির মাধ্যমে তা পরিশোধন করা হয়। পরে পরিষ্কার রক্ত আবার শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টার এই প্রক্রিয়া সাধারণত সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার করতে হয়।

পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিসে পেটের ভেতরের আস্তরণ (পেরিটোনিয়াম) ব্যবহার করে বিশেষ ডায়ালাইসিস তরলের মাধ্যমে রক্ত পরিশোধন করা হয়। এটি কখনো মেশিনের মাধ্যমে, আবার কখনো হাতে করেও করা যায়।

কোনো রোগীর কিডনি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিকল হলে নিয়মিত ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়। কিন্তু রোগীর তুলনায় সরকারি হাসপাতালে এ সেবার সুযোগ খুবই সীমিত।

জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন প্রায় ১২০ থেকে ১৩০ জন রোগী ডায়ালাইসিস সেবা পান। এর মধ্যে প্রায় ৩০ জন সরকারি ব্যবস্থাপনায় কম খরচে সেবা পান। তাদের প্রতি সেশনে খরচ হয় ৬২১ টাকা। অন্যদিকে, একই হাসপাতালে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস করাতে খরচ হয় প্রায় ৩ হাজার ৩৯৭ টাকা। নতুন রোগীদের জন্য বর্তমানে সেখানে সিরিয়াল নেওয়া বন্ধ রয়েছে। ফলে পুরোনো রোগীরাই শুধু সেবা পাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাত্র ৩৫টি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা রয়েছে। রোগীর তুলনায় যা খুবই অপ্রতুল। ফলে অধিকাংশ রোগীকে আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। সেখানে প্রতি সেশনে ডায়ালাইসিস করাতে ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ডায়ালাইসিসের খরচ জোগাতে গিয়ে কিডনি রোগীদের ৯২ শতাংশ পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। এছাড়া, প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ রোগী প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেশনে ডায়ালাইসিস নিতে পারেন না।

কিডনি প্রতিস্থাপন আইনে স্বস্তি, ব্যয়ে অস্বস্তি: কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে গেলে শেষ ভরসা থাকে কিডনি প্রতিস্থাপন। এতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগীর শরীরে নতুন একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।

সম্প্রতি অঙ্গ প্রতিস্থাপন অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করে কিডনি দানের ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়ের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে নিকটাত্মীয়ের সংখ্যা ছিল ২২, নতুন আইনে তা বাড়িয়ে ৩০ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ‘ইমোশনাল ডোনার’ বা দীর্ঘদিনের পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকেও নির্দিষ্ট শর্তে অঙ্গ গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

বর্তমানে দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০০টি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট, কিডনি ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এই অস্ত্রোপচার হচ্ছে। ১৯৮২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশে প্রায় চার হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনে সাধারণত ৩ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা: বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, “দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা এখন প্রায় চার কোটির কাছাকাছি। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ কিডনি রোগ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।”

তিনি বলেন, “দেশে ডায়ালাইসিস সুবিধার প্রায় ৬৫ শতাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক। তাই জেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”

পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস তুলনামূলক ব্যয়বহুল উল্লেখ করে ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, “এর তরল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ভ্যাট ও কর কমানো গেলে রোগীদের জন্য ব্যয় কমানো সম্ভব হবে এবং সেবাও বিস্তৃত করা যাবে।”