জাতীয়

সরকারের ঘোষণার আগেই বাস ভাড়া বাড়ানোর পাঁয়তারা, বিপাকে যাত্রীরা

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব গণপরিবহনে সরাসরি পড়তে শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে গণপরিবহনের ভাড়া পুনর্নির্ধারণের কোনো ঘোষণা না আসলেও কিছু কিছু পরিবহন বাড়তি ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের এই ‘ভাড়া বাড়ানোর পাঁয়তারা’র মুখে সাধারণ যাত্রীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। একদিকে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, অন্যদিকে গণপরিবহনের বাড়তি ভাড়ার আশঙ্কা- সব মিলিয়ে নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষের।

মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাজধানীর বিভিন্ন রুটের বাসের যাত্রী ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

এখন পর্যন্ত সরকারে পক্ষ থেকে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি কোনো ঘোষণা না আসলেও কোনো কোনো রুটে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ করছে যাত্রীরা। বেসরকারি চাকরিজীবী আসাদুজ্জামান রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমার বাসা মোহাম্মদপুর, মতিঝিলে আমার অফিস। আমি এই রুটে প্রতিদিন যাতায়াত করি। গত দুদিন ধরে দেখছি কোনো কারণ ছাড়াই ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নিচ্ছে। প্রতিবাদ করলে বাসের হেল্পার বলে, ‘বাসে উঠলে এই ভাড়াই দিতে হবে, না হয় নেমে যান’। আমাদের আয় তো বাড়েনি, কিন্তু যাতায়াত খরচ বাড়লে মাসের শেষে ধার করা ছাড়া উপায় থাকে না। আমরা আসলে অসহায়।”

মোহাম্মদপুর থেকে দয়াগঞ্জ রুটে চলাচল করা মালঞ্চ পরিবহনের যাত্রী ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী সায়েম সিকদার বলেন, “শিক্ষার্থীদের জন্য বাসে হাফ পাস। কিন্তু তেলের দাম বাড়ার পর হেল্পাররা বাড়তি ভাড়া চাচ্ছে। না দিলে খারাপ ব্যবহার করে। কিছুক্ষণ আগে আমাদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে ঝামেলা করেছে। আমাদের তো কলেজে আসতে নির্ধারিত টাকা দেয়। ভাড়া বাড়লে আমাদের সমস্যা হবে।”

আজিমপুর থেকে মিরপুর রুটে চলাচল করা মিরপুর লিংক বাসের যাত্রী ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী কামরুল ইসলাম বলেন, “এখন শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ পাস বা অর্ধেক ভাড়া নিয়ে টালবাহানা করছে। নতুন করে ভাড়া বাড়ানোর কথা বলছে। আমাদের পকেট খরচ সীমিত। বাস মালিকরা যখন খুশি ভাড়া বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু বাসের সার্ভিসের মান তো বাড়ে না। আমরা সাধারণ মানুষ সবসময়ই এদের কাছে জিম্মি। কিছু বললেও কোনো কাজ হয়না। এর জন্য মাঝে মধ্যে বাসের হেল্পারদের সঙ্গে ঝামেলা হয় মানুষের।”

একই বাসের হেল্পার সাদ্দাম হোসেন বলেন, “এখন পর্যন্ত যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া বেশি নিইনি। তেলে দাম বৃদ্ধি ও লাইনে অনেক সময় অপেক্ষা করতে তেল নিতে হয় আমাদের। এখন গাড়ির খরচও বেড়েছে। ভাড়া না বাড়ালে আমাদের চলা কঠিন হবে। আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।”

মালঞ্চ পরিবহনের হেল্পার মো. রাকিব বলেন, “যাত্রীরা মিথ্যা অভিযোগ করছে। আমরা এখনো আগের ভাড়া নিচ্ছি। তবে আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। রাস্তায় জ্যামের কারণে ট্রিপ কমে গেছে। সারাদিন স্টিয়ারিং ধরে থেকেও যদি দিনশেষে হাতে ৫০০ টাকা না থাকে, তবে আমরা চলব কীভাবে? সরকারি নির্দেশনা আসলে তারপর আমরা সেই ভাড়া নির্ধারণ করা হবে সেটাই নিবো।

এদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে গত রবিবার (১৯ এপ্রিল) বাসভাড়া বাড়ানোর দাবিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে (বিআরটিএ) পরিবহন মালিক সমিতির বৈঠক হয়। তবে ওই বৈঠকে ভাড়া বৃদ্ধির কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। 

মালিক সমিতি সূত্র জানায়, ২০২২ সালের আগস্টে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২.২০ টাকা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২.৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এছাড়া সর্বনিম্ন ভাড়া বাসে ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে আমাদের গণপরিবহন ওপর সবচেয়ে বেশি সরাসরি প্রভাব পড়ছে। এছাড়া এখন পাম্পে দীর্ঘ লাইন দিয়ে তেল নিতে হয়। এখন ভাড়া না বাড়ালে আমাদের লোকসানে পড়তে হবে। এত লোকসান দিয়ে মালিকরা যাত্রী পরিবহন করতে পারবেন না।

এদিকে গতকাল সোমবার (২০ এপ্রিল) এক সংবাদ সম্মেলনে বাস ও লঞ্চের প্রভাবশালী মালিক সমিতির নেতৃত্বে একচেটিয়া ভাড়া বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পেলে আনুপাতিক হারে বাস, লঞ্চ ও অন্যান্য গণপরিবহনের ভাড়া বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্ত বাস ও লঞ্চ মালিক সমিতি সরকারের কিছু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে যাত্রী সাধারণের প্রতিনিধিত্ব বা দরকষাকষি বাদ দিয়ে একচেটিয়া ভাড়া নির্ধারণের পায়তারা চালাচ্ছে। জনস্বার্থের ভাড়া নির্ধারণে কেন লুকোচুরি করা হবে, কেন মিডিয়া থেকে গোপন করা হবে।

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, অতি সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্য তিন দফা কমার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি ১ টাকায় ১ পয়সা হারে বাস ভাড়া কমানো হয়েছে। একই সূত্র ধরে এবার প্রতিটি লিটার জ্বালানিতে ১৫ টাকা মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে সর্বোচ্চ ১৫ পয়সা বাড়ানো যেতে পারে। তার অন্যথা হলে যাত্রী কল্যাণ সমিতি কঠিন ও কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।