জাতীয়

লেগুনার পাদানিতে সোহাগের শৈশব

ফজরের আজান শেষ হতেই রায়েরবাগের টিনের ঘর থেকে বের হয় সোহাগ। বয়স ১২ বছর ৩ মাস। পরনে ময়লা গেঞ্জি, পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল, কাঁধে গামছা নিয়ে রওনা হয় সে। গন্তব্য রাজধানীর যাত্রাড়ী বাসস্ট্যান্ড। সেখানে থাকা লেগুনার পাদানি তার কর্মস্থল। সারাদিন ঝুলে যাত্রী তোলে, নামানো, ভাড়া আদায় এই কাজই করে সে। রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে সন্ধ্যায় মায়ের হাতে তুলে দেয় ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা। 

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) যাত্রাড়ী বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় সোহাগের সঙ্গে। মা ও বোন নিয়ে তার পরিবার। চার বছর আগে আরেকটা বিয়ে করে চলে গেছেন বাবা। তারপর থেকে সোহাগের স্কুলের খাতায় পড়েছে ইতি। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল। এখন তার বর্ণমালা লেগুনার নম্বর প্লেট, অঙ্কের হিসাবে যাত্রীর ভাড়া। 

চলন্ত লেগুনার রড ধরে ঝুলে থাকা সোহাগ বলে, ‍“মায়ে কাম করে বাসাবাড়িত। একলার কামাইয়ে হয় না। পেট তো মানে না। তাই আমিও কামে নামছি।” মালিক বলেছে, “আজ যাত্রী বেশি হইব, আইজ কামাই বেশি।” 

রাজধানীজুড়ে হাজারো সোহাগ  সোহাগ একা নয়। যাত্রাবাড়ী-চট্টগ্রাম রুটে ১১ বছরের সবুজ, গুলিস্তান-খিলগাঁও রুটে ১৩ বছরের সবুজ, মিরপুর-১০ থেকে আগারগাঁও রুটে ১২ বছরের গাফফার কাজ করে। ঢাকার প্রতিটি সড়কে এমন শত শত শিশু লেগুনা, টেম্পুর হেলপার হিসেবে  কাজ করছে। কেউ ওয়ার্কশপে পোড়া মবিলের গন্ধে দিন কাটায়, কেউ হোটেলে প্লেট ধোয়, কেউ লেদ মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে হাত-পা হারানোর ঝুঁকি নেয়।

গাফফারের বাড়ি রংপুর। নদী ভাঙনে ভিটেমাটি সব হারিয়ে দুই বছর আগে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঢাকায় এসেছে। এখন থাকে রায়েরবাজার বস্তিতে। 

গাফফার বলে, “বাপে রিকশা চালায়, মায়ে বাসায় কাম করে। দুই ভাই-বোন। আমি বড়। আমি কাম না করলে ছোট বইনটারে খাওয়ামু কী দিয়া?” সে জানায়, দিনে ৩০০ টাকা আয় তার। এর মধ্যে মালিককে দিতে হয় ৫০ টাকা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ বলছে, দেশে এখন ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৭ জন শিশুশ্রমিক রয়েছে। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ৩৬৯। অর্থাৎ ১০ বছরে শিশুশ্রমিক বেড়েছে প্রায় ৮৬ হাজার ৫৫৮ জন। এর মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু করছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তবে, আশার কথা, ১০ বছরে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা দুই লাখের মতো।

শ্রম আইন ২০১৮ অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুকে কোনো পেশায় নিয়োগ দেওয়া যাবে না। ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ‘কিশোর’ হিসেবে হালকা কাজে দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি নয়, সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে নয় এমন বিধান আছে। নিয়োগের আগে জন্মনিবন্ধন সনদ, স্কুল সার্টিফিকেট বা রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র লাগবে।

সোহাগ-গাফফারদের বয়স কেউ জিজ্ঞেস করে না। সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করে তারা। সাপ্তাহিক ছুটি নেই, অসুস্থতায় বেতন কাটা যায়। 

লেগুনার মালিক বোরহান মিয়া বলেন, “পোলাপান কম টাকায় খাটে। বড় মানুষ নিলে ৮০০ টাকা রোজ দেওন লাগে। ওগো ২৫০ দিলেই হয়। পুলিশ ধরলে ১০০ টাকা দিয়া ম্যানেজ করি।”

জরিপ বলছে, ২০ লাখ ৯০ হাজার শিশু গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে। এর মধ্যে ২০ লাখ ১০ হাজার কোনো পারিশ্রমিকই পায় না। যারা পায়, তাদের গড় আয় মাসে ৬ হাজার ৬৭৫ টাকা। কৃষিতে ১ লাখ ৭০ হাজার, শিল্পে ১১ লাখ ৯০ হাজার এবং সেবায় ১২ লাখ ৭০ হাজার শিশু কাজ করছে।

ঝুঁকিপূর্ণ ৪৩ খাত, জরিপ হয়েছে মাত্র ৫টিতে সরকার ৪৩টি খাতকে শিশুশ্রমের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে পাঁচটি খাতে জরিপ করেছে বিবিএস। শুঁটকি উৎপাদন, পাদুকা তৈরি, ওয়েল্ডিং, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ ও টেইলারিং এই পাঁচ খাতের ৪০ হাজার ৫২৫টি কারখানায় কাজ করে ৩৮ হাজার ৮ জন শিশু। এর ৯৭ দশমিক ৭ শতাংশ ছেলে, ২ দশমিক ৩ শতাংশ মেয়ে। শুধু অটোমোবাইল ওয়ার্কশপেই কাজ করে ২৪ হাজার ৯২৩ জন শিশু।  পাদুকা কারখানায় কাজ করে ৫ হাজার ২৮১ জন শিশু। 

হাজারীবাগের একটি কারখানায় ১৩ বছরের শাহিনের সঙ্গে দেখা। সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত আঠা লাগায় জুতায়। “গন্ধে মাথা ঘুরায়। চোখ জ্বলে। তয় অভ্যাস হইয়া গেছ “, বলে শাহিন। মাসে সে পায় ৭ হাজার টাকা।

আইন দিয়ে হবে না, পেটের দায় বড় বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আব্দুস শহীদ মাহমুদ বলেন, “পরিবহন খাত শিশুদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। সড়ক দুর্ঘটনা, যৌন হয়রানি, মাদকসহ বকিছুর শিকার হয় ওরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাইলে এক মাসে শিশুশ্রম বন্ধ করতে পারে। কিন্তু হঠাৎ বন্ধ করলে ২০-৩০ হাজার শিশু রাস্তায় নামবে। খাবে কী? থাকবে কোথায়? তাই পুনর্বাসন ছাড়া শুধু আইন দিয়ে হবে না।”

তিনি বলেন, “সরকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নির্মূলের অঙ্গীকার করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম বন্ধ করতে চায়। কিন্তু বাজেটে শিশুশ্রম নিরসনে বরাদ্দ কত?  পুনর্বাসন প্রকল্প কোথায়? শুধু দিবস পালন করে হবে না।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক তৈয়েবুর রহমান বলেন, “দারিদ্রতা শিশুশ্রমের মূল কারণ। বাবা-মায়ের আয় না বাড়লে শিশুকে কাজে পাঠানো বন্ধ হবে না। সমাজকল্যাণ, নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দরিদ্র পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। শিশুদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে ১৮ বছর পর কাজে ঢোকাতে হবে।”

সাবেক  শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন  বলেন, “শিশুদের কাজে নেওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের শাস্তি কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। শিশুশ্রমের সংজ্ঞাও বদলানো হয়েছে। জোর করে শিশুকে কাজে পাঠানো দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে, স্কুল শেষে স্বেচ্ছায় কোনো কাজ করলে সেটা অন্যভাবে দেখব। বিদ্যমান আইনে শিশুশ্রমের জন্য পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা রয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যেই শ্রম আইন সংশোধন হবে। সেখানে জরিমানা ও কারাদণ্ড দুটোই বাড়বে।”

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী  আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, “শিশুশ্রম প্রতিরোধে আইনের শাস্তি কয়েকগুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে জরিমানা ও কারাদণ্ড আরো কঠোর করা হচ্ছে। পাশাপাশি কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত তদারকি জোরদার করে শিশু শ্রম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নির্মূলের লক্ষ্যে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (এনপিএ) ২০২৬–২০৩০ প্রণয়নের কাজ চলছে। সরকারের লক্ষ্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অবৈধভাবে শিশুশ্রমিক নিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা করা।” 

জরিমানা ও কারাদণ্ড বাড়বে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার দেশ থেকে শিশু শ্রম নির্মূলে সম্ভাব্য সব উপায়ে কাজ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে শিশুশ্রম নির্মূল হবে।

সাবেক শ্রমসচিব  এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, “২০৩০ সালের আগেই শিশু শ্রম মুক্ত বাংলাদেশ গঠন করতে পারব। এর জন্য শ্রম আইন সংশোধন, নিয়মিত অভিযান, সচেতনতা বৃদ্ধি সবই চলছে।”

আন্তর্জাতিক চাপ ও বাস্তবতা আইএলও ও ইউনিসেফের গত বছরের ১২ জুন প্রকাশিত যৌথ প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালে বিশ্বে ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু শ্রমে যুক্ত, যার মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। বাংলাদেশে ২০১৩ সালে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের হার ছিল ৩.২ শতাংশ, ২০২২ সালে কমে ২.৭ শতাংশ হয়েছে। তবে ৫-১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে শ্রমে যুক্ত থাকার হার ৮.৭ থেকে বেড়ে ৮.৯ শতাংশ হয়েছে। ক্ষতিকর কাজে যুক্ত শিশুশ্রমের হারও ৪.৩ থেকে বেড়ে ৪.৪ শতাংশ হয়েছে।

ইউনিসেফ বলছে, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বাড়ায় কিছুটা উন্নতি হলেও ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যে পৌঁছানোর গতিতে নেই বাংলাদেশ। বেশির ভাগ শিশু অনানুষ্ঠানিক খাতে দীর্ঘ সময় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে।

আইএলও বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গুঞ্জন ডালাকোটি শিশুশ্রম নিরসনে অগ্রগতির স্থবিরতায় উদ্বেগ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন ১৩৮ ও ১৮২ অনুসমর্থন করেছে। অঙ্গীকার অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নির্মূল করতে হবে। সময় খুব কম।”