জাতীয়

ভুয়া খবর ও এআই অপব্যবহার ঠেকাতে আইনি লাগাম চান ডিসিরা

তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অপসাংবাদিকতা। নিবন্ধন ছাড়াই গজিয়ে ওঠা অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে ছড়ানো ভিত্তিহীন সংবাদ সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। এর সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি নকল ছবি, ভিডিও ও ভয়েস ক্লিপ মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে ভয়াবহ হয়রানি ডেকে আনছে।  

এই পরিস্থিতিতে অপসাংবাদিকতা ঠেকাতে কঠোর আইনি কাঠামোর দাবি তুলেছেন মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এবারের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে অন্তত তিনটি জেলার ডিসি সরাসরি অনলাইন মিডিয়ার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা এবং ভুয়া কনটেন্টের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন।  

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র জানায়, মাঠ পর্যায় থেকে আসা শত শত প্রস্তাব যাচাই-বাছাই শেষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সাতটি প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে। বুধবার (৬ মে) ডিসি সম্মেলনের শেষ দিনে এসব প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানরা অধিবেশনে উপস্থিত থাকবেন।  

নিবন্ধন ছাড়া মিডিয়া নয় নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক তার লিখিত প্রস্তাবে বলেছেন, ‍গত দুই বছরে জেলায় অন্তত ২৭টি নামসর্বস্ব অনলাইন পোর্টাল ও ৪০টির বেশি ফেসবুক পেজ চালু হয়েছে, যাদের কোনো নিবন্ধন নেই। এসব প্ল্যাটফর্মে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষকে নিয়ে মনগড়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে।  

ডিসির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে নেত্রকোণায় এআই দিয়ে তৈরি করা এক কলেজছাত্রীর আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হয়। পরে পুলিশি তদন্তে দেখা যায়, ভিডিওটি সম্পূর্ণ বানোয়াট। ততক্ষণে মেয়েটির পরিবার সামাজিকভাবে হেয় হয়েছে। এমন ঘটনা এখন নিয়মিত।  

এ কারণে তিনি দুটি সুপারিশ করেছেন। প্রথমত, দেশের সব অনলাইন নিউজ পোর্টাল, আইপি টিভি ও নিউজভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া পেজকে তথ্য অধিদপ্তরের নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে।  দ্বিতীয়ত, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ ও ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ সংশোধন করে অপসাংবাদিকতার জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রাখতে হবে। পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে মনিটরিং সেল গঠন করে ডিসিদের নেতৃত্বে ভুয়া কনটেন্ট চিহ্নিত করে দ্রুত অপসারণের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন তিনি।  

ডিসির যুক্তি, নীতিমালার মধ্যে মিডিয়া পরিচালিত হলে প্রকৃত সাংবাদিকরা উৎসাহ পাবেন। একই সঙ্গে হলুদ সাংবাদিকতা ও ব্ল্যাকমেইলিং কমবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই প্রস্তাবের বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছে। বিভাগের সুপারিশে বলা হয়েছে, অনলাইন মিডিয়ার নিবন্ধন ব্যবস্থা জোরদার এবং অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা যেতে পারে। প্রয়োজনে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।  

তথ্য অবকাঠামো ডিসি সম্মেলনে শুধু আইনি পদক্ষেপ নয়, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়েও একাধিক প্রস্তাব এসেছে। রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক বলেছেন, জেলা পর্যায়ে একটি সমন্বিত ও আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। সেখানে তথ্য অফিস, গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের ইউনিট, সাংবাদিকদের জন্য প্রেস ব্রিফিং রুম, আর্কাইভ ও মিনি স্টুডিও থাকবে।  

তিনি যুক্তি দিয়েছেন, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সামাজিক সচেতনতার বার্তা ও দুর্যোগের আগাম সতর্কতা দ্রুত জনগণের কাছে পৌঁছাতে একটি ‘জেলা ইনফরমেশন হাব’ দরকার। বর্তমানে তথ্য অফিসগুলো জরাজীর্ণ ভবনে, অপ্রতুল জনবল নিয়ে কাজ করছে। ফলে সরকারের সঙ্গে গণমাধ্যম ও জনগণের সেতুবন্ধন দুর্বল হচ্ছে।  

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, জেলা পর্যায়ে আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়) শীর্ষক একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে প্রক্রিয়াধীন। রাজবাড়ীর প্রস্তাবটি ওই প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।  

চার প্রস্তাব তথ্য অবকাঠামো নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রস্তাব এসেছে রাজশাহীর ডিসির কাছ থেকে। তিনি চারটি আলাদা সুপারিশ করেছেন।  

প্রথমত, বিভাগীয় পর্যায়ে স্বতন্ত্র বিভাগীয় তথ্য অফিস স্থাপন। বর্তমানে রাজশাহী বিভাগীয় তথ্য অফিস জেলা তথ্য অফিসের একটি কক্ষে কার্যক্রম চালায়। এতে আট জেলার সমন্বয়, ভিআইপি কভারেজ ও মনিটরিং ব্যাহত হয়। স্বতন্ত্র অফিস হলে তথ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যক্রম গতি পাবে।  

দ্বিতীয়ত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সরকারের বার্তা পৌঁছাতে ‘আলোকচিত্রের স্ট্যান্ড ভ্যান-সংবলিত আধুনিক সিনেমা ভ্যান’ সরবরাহ। ডিসির ভাষ্য, ইউনিয়ন পর্যায়ে সচেতনতামূলক চলচ্চিত্র, ডকুমেন্টারি ও টিভিসি প্রদর্শনের জন্য এটি জরুরি। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, বাল্যবিবাহ ও গুজব প্রতিরোধে ভিডিও কনটেন্ট গ্রামে-গঞ্জে দেখানো গেলে মানুষের আচরণগত পরিবর্তন আনা সহজ হবে।  

তৃতীয়ত, সড়ক প্রচারের জন্য ‘মোবাইল প্রচার গাড়ি’ সংযোজন। চলন্ত গাড়ি থেকে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও ডিজিটাল স্ক্রিনে বার্তা প্রচার করা গেলে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা মহামারির মতো জরুরি সময়ে কম সময়ে বেশি মানুষকে সতর্ক করা যাবে।  

চতুর্থত, বাংলাদেশ বেতার রাজশাহী কেন্দ্রের জন্য বহুতলবিশিষ্ট আধুনিক সম্প্রচার ভবন নির্মাণ। ১৯৬২ সালে নির্মিত একতলা ভবনটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পর্যায়ে আছে। ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, দেয়ালে ফাটল। স্টুডিও সংকটের কারণে নতুন অনুষ্ঠান রেকর্ড করা যায় না। শিল্পী, কলাকুশলী ও আমন্ত্রিত অতিথিদের বসার জায়গাও নেই। ফলে রাষ্ট্রীয় এই গণমাধ্যমটির সম্প্রচার সক্ষমতা দিন কমছে।  

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই চারটি প্রস্তাবই যৌক্তিক হিসেবে চিহ্নিত করে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বলছে, তথ্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ বেতারের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে এসব চাহিদা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

ঠাকুরগাঁও বেতারের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন  একই ধরনের সংকটে আছে ঠাকুরগাঁও বেতার কেন্দ্র। জেলার ডিসি জানিয়েছেন, ১৯৮৮ সালের আগে নির্মিত ভবনটি এখন যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে। রিলে কেন্দ্র থেকে পূর্ণাঙ্গ সম্প্রচার কেন্দ্রে উন্নীত হওয়ার পর এখানে জনবল তিনগুণ বেড়েছে। কিন্তু, অবকাঠামো সেই ৪০ বছর আগের। কর্মকর্তারা গাদাগাদি করে বসেন। যন্ত্রপাতি রাখার স্টোররুম নেই। নতুন স্টুডিও করার মতো জায়গাও অবশিষ্ট নেই।  

তিনি পাঁচতলা ভিত্তির ওপর অন্তত তিনতলা একটি নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করেছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বলেছে, বাংলাদেশ বেতারের একটি কেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ঠাকুরগাঁওকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম বলেন, “অনলাইন নিবন্ধন ও আইনি ব্যবস্থা অবশ্যই দরকার। শুধু আইন দিয়ে গুজব ঠেকানো যাবে না, মানুষের মিডিয়া লিটারেসি বাড়াতে হবে। কোনটা আসল খবর, কোনটা এআই দিয়ে বানানো সেটা বোঝার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে এটি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।”

তিনি বলেন, “ডিসিদের হাতে মনিটরিংয়ের ক্ষমতা দিলে তার অপব্যবহারের শঙ্কাও থাকে। তাই স্বচ্ছ গাইডলাইন ও আপিলের সুযোগ রেখে বিধি করতে হবে। নইলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে।”  

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ডিসিদের প্রস্তাবগুলো আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। অনলাইন নিবন্ধন নীতিমালা হালনাগাদ করার কাজ চলছে। এআই দিয়ে তৈরি ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্ত করতে তথ্য অধিদপ্তরে একটি ‘ফ্যাক্ট চেকিং ও এআই মনিটরিং সেল’ গঠনের প্রস্তাবও আমাদের আছে। সম্মেলনের সিদ্ধান্তের পর আমরা চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনা নেব।  অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরকার কোন পথে হাঁটবে শুধু আইনের লাঠি, নাকি প্রযুক্তি ও সচেতনতার সমন্বিত কৌশল।