বেড়াতে এসে নানির হাত ধরে রাস্তায় বেরিয়েছিল তাকওয়া সুমাইয়া নূর। পাশের দোকান থেকে ললিপপ কিনে নানিদের বাড়ি ফিরছিল তারা। হঠাৎ দাবন হয়ে এসে তাকওয়াকে ধাক্কা দেয় বেপরোয়া চালকের এক ব্যাটারির রিকশা। সেখান থেকে তুলে তার মা ও নানিরা রুদ্ধশ্বাসে ছুটে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ততক্ষণে প্রাণটা উড়ে গেছে তাকওয়ার।
রাজধানীর কদমতলির রায়েরবাগ মাজার গলির সামনে ললিপপ কিনে রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মাত্র আট বছর বয়সি তাকওয়াকে ধাক্কা দেন উড়ে চলা গতিতে রিকশা নিয়ে আসা ‘উন্মাদ’ চালক। এতটুকু মেয়েটি রাস্তায় পড়ে আর উঠতে পারেনি, সেখানেই জ্ঞান হারায় সে। সে আর কথা বলেনি। আদরের মেয়েটির প্রাণপাখি উড়ে গেছে সবাইকে রেখে।
বুধবার (৬ মে) সন্ধ্যায় কদমতলি থেকে সুমাইয়া নূরকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে আনতে আনতে রাত ৮টা বেজে যায়। তখন শুধু বাকি ছিল চিৎসকের ঘোষণা। তাকওয়া সুমাইয়া নূরের ‘জীবনের নূর’ উড়ে গেছে অনন্তলোকে। তখন তার মায়ের সে যে কি কান্না, ছোট্ট মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কী যে বুকফাটা চিৎকার, তা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায় জরুরি বিভাগের আশপাশের মানুষ।
তাকওয়াদের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাঠানটুলি নতুন আইলপাড়া মহল্লায়। তার বাবার নাম নূর আলম খান, মা কান্তা বেগম। তাকওয়া স্থানীয় একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত।
শোকে স্তব্ধ তাকওয়ার নানি বাড়ির কয়েকজনকে দেখা যায় ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের সামনে। তাদের সবার চোখে পানি। চোখ মুছতে মুছতে তাকওয়ার মামি তানজিলা আকতার বলেন, “আমার ভাগ্নি তাকওয়া সুমাইয়া আজ (বুধবার) সকালে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। সন্ধ্যার দিকে তার নানি মর্জিনা বেগমের সঙ্গে হাঁটতে যায়। তখন তাকওয়া নানিকে বলে ললিপপ খাবে।”
“পাশের দোকান থেকে ললিপপ কিনে নানির হাত ধরে রাস্তায় হাঁটার সময় একটি বেপরোয়া গতিতে আসা ব্যাটারির রিকশা ওকে ধাক্কা দেয়। এতে গুরুতর আহত হয় তাকওয়া। পরে আমরা দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে এলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।”
তিন বোনের মধ্যে তাকওয়া ছিল দ্বিতীয়।
ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মোহাম্মদ ফারুক বলেন, “তাকওয়ার মরদেহ মর্গে রাখা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে জানানো হয়েছে।”
কদমতলির স্থানীয় লোকজন ব্যাটারিচালিত রিকশার ঘাতক চালককে ধরেছে। রিকশাটিও হেফাজতে রয়েছে।
ঢাকার রাস্তায় চলাচলকারী লোকজনের একটি বিষয় অজানা নয়। বেপরোয়া গতির ব্যাটারির রিকশায় দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ব্রেকহীন, লুকিং গ্লাসহীন এই অনিয়ন্ত্রিক ব্যাটারির রিকশাগুলো ঢাকার রাস্তায় বাসের চেয়েও বেশি গতিতে চালাতে দেখা যায়। তিন চালকার রিকশায় ব্যাটারির জোরে পাগলের মতো গতি ছুটিয়ে রিকশা চালান চালকরা। কথা বললে উল্টে তেড়ে আসেন। এই বিশৃঙ্খলার শিকার হচ্ছেন নিরীহ মানুষ, দিতে হচ্ছে জীবন।
বুধবারই চার ঘণ্টার ব্যবধানে কামরাঙ্গীরচর ও কদমতলীতে এই ‘উন্মাদ’ চালকদের রিকশার ধাক্কায় নিভে গেল দুটি সম্ভাবনাময়ী কন্যা শিশুর প্রাণপ্রদীপ।
কামরাঙ্গীরচরে ব্যাটারির রিকশার ধাক্কায় ৫ বছরের শিশু নিহত রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে বুধবার বেলা ৩টার দিকে বাড়ির পাশে রাস্তায় খেলা করার সময় ব্যাটারির অটো রিকশা দিয়ে পাঁচ বছর বয়সি জান্নাতি নামে কন্যা শিশুকে ধাক্কা দেন চালক। তাকেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে এলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
জান্নাতিকে ঢামেকে নিয়ে আসা প্রতিবেশী আব্দুস সালাম জানান, কামরাঙ্গীরচর সিলেটি বাজারের ৭ নম্বর গলির রাস্তায় খেলা করছিল মেয়েটি। তখন বেপরোয়া গতিতে চালিয়ে আসা ব্যাটারির রিকশা তার ওপর তুলে দেন চালক। সেখান থেকে তাকে তুলে জরুরি বিভাগে আনা হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।