রাজধানী ঢাকা শহর অনেকটাই ফাঁকা। সর্বত্রই ছুটির আমেজ। অধিকাংশ দোকান পাট বন্ধ। যানজট নেই, নেই চিরচেনা ঢাকার সেই কোলাহল। ঈদের গ্রামে বাড়িতে চলে যাওয়ায় লোকসমাগমও কম। গণপরিবহন, প্রাইভেট গাড়িও কম তাই গাড়ির ধোঁয়া ও শব্দ দূষণও কম। সকাল থেকে প্রচণ্ড গরম পড়লেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে নগরবাসী। তবে ফাঁকা রাজধানীতে কোরবানির রক্ত, বর্জ্যের দুর্গন্ধ আর গলাকাটা ভাড়ায় ঈদের আমেজে ভাটা ফেলছে।
ঈদের ছুটিতে দ্বিতীয় দিন শুক্রবার (২৯ মে) রাজধানী ঢাকার চিত্র এটি।
রাজধানীর পল্টন, কাকরাইল, ফকিরাপুল, শাহবাগ, নিউ মার্কেট, ফার্মগেট, পুরান ঢাকা, ধানমন্ডি, খিলগাঁও, রামপুরা, বাড্ডা, মহাখালী, গুলশান, বনানী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, যাত্রবাড়ী, খিলক্ষেত, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঈদের দ্বিতীয় দিনও বিভিন্ন অলিগলিতে, রাস্তাঘাটে পশু কোরবানি দেন নগরবাসী।
ঈদের দিন যারা কোরবানি দিতে পারে নাই মূলত তারাই দ্বিতীয় দিন কোরবানি দিয়ে থাকেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানি শেষে পশুর রক্ত, বর্জ্য পানি ছিটিয়ে ভালো করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করেনি। অনেক জায়গায় ব্লিচিং পাউডারও ছিটায়নি। রাস্তায় অলিগলিতে পড়ে আছে রক্তসহ পশুর বর্জ্য। ঈদের দিন থেকেই ঢাকায় বৃষ্টি না হওয়ায় পশুর রক্ত, বর্জ্যে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নাক চেপে যেতে হচ্ছে পথচারীদের। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা। বিশেষ করে বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের কষ্ট বেশি হচ্ছে।
ফার্মগেট তেজতুরি বাজারের বাসিন্দা ব্যাংকার আনোয়ারুল আজম জানান, ঝড় বৃষ্টি নেই, প্রচণ্ড রোদ। ঈদের দ্বিতীয় দিনে বাসার সামনে পথে-ঘাটে কোরবানি দিয়ে বর্জ্য ভালো করে পরিস্কার করা হচ্ছে না। ফলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে রোগাক্রান্ত হতে পারে পথচারীরা।
ঈদের দ্বিতীয় দিনে কোরবানির বর্জ্য পরিস্কার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “বাসা বাড়ির সামনে রাস্তা ঘাটে যারা কোরবানি করে নিজ নিজ জায়গা পরিস্কার করেননি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ব্যবস্থা নাই বলে ইচ্ছামত কোরবানি করে যে কেউ পশুর রক্ত বর্জ্য রাস্তাঘাটে ফেলে চলে যাচ্ছেন। জরিমানা করা হলে নিজেরা আরো সচেতন হবে।”
তিনি আরো বলেন, “ঈদের দ্বিতীয় দিন কোরবানির পশুর বর্জ্য পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে দুই সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা। ভোর থেকেই তারা কাজ করছেন। তাদের আক্ষেপ, ঢাকা শহর পরিস্কার রাখতে আমরা রাতদিন কাজ করছি। কিন্তু যারা কোরবানি দেন তাদেরও তো বিবেক থাকা উচিত যে পশু জবাই শেষে পানি দিয়ে জায়গাটা কিছুটা পরিস্কার করে যাওয়া। তারা পানি তো দেয় না, বরং পশুর বর্জ্য সব এলোমেলো রাস্তাঘাটে রেখে ফেলে চলে যাচ্ছে। এতে আমাদের কষ্টও বেশি হচ্ছে।”
দুপুরে পল্টন মোড় থেকে বিজয়নগর এলাকায় পরিচ্ছন্ন অভিযান চালাচ্ছিলেন ডিএসসিসির একদল পরিচ্ছন্নতা কর্মী। তাদের একজন মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, “ভোর থেকে কাজ করছি। যতক্ষণ পর্যন্ত বর্জ্য পরিস্কার না হবে ততক্ষণ আমরা কাজ চালিয়ে যাব।”
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, “ঈদুল আজহার প্রথম দিনের মতো দ্বিতীয় দিনেও কোরবানি পশুর বর্জ্য অপসারণের কাজ জোরালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ঈদের দ্বিতীয় দিনে বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হযেছে ১১ হাজার ৭৮৬ টন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পরিবহনকর্মী ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমরা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করব। নগরবাসীর স্বস্তি নিশ্চিত করতে দ্রুত সময়ের মধ্যে সব বর্জ্য অপসারণে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিনে ঢাকার চিত্র।
এদিকে, ঈদের ছুটিতে দ্বিতীয় দিনে ফাঁকা রাজধানীতে গণপরিবহন চলাচল কম হওয়ার সুযোগ নিয়েছে কিছু গণপরিবহন, সিএনজি, অটোরিকশা। অধিকাংশ পরিবহনের ট্রিপ কমে গেছে। এই সুযোগ তাদের কিছু বাস চলাচল করছে রাস্তায়। ভাড়া নিচ্ছে দশ টাকা বেশি। যে যেখান থেকে উঠছে তাকে দশ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। ঈদের অজুহাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এতে যাত্রী সাধারণেরও উচ্চবাচ্চ্য নেই।
এভাবে সিএনজি, অটোরিকশার ভাড়াও বেশি। বেশি ভাড়া নিচ্ছে অটোরিকশা। গণপরিবহন কম হওয়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে রাস্তাঘাটে বের হলেও গলাকাটা ভাড়া দিতে হচ্ছে যাত্রী সাধারণকে।
দুপুরে রাজধানী শংকর বাস স্ট্যান্ড থেকে ধানমন্ডি ২৭ আসতে দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হয়েছে সংবাদকর্মী মোহাম্মদ রিয়াদের। এই জায়গার অটোরিকশার ভাড়া ৩০ টাকা। ভাড়া চায়, ৬০ টাকা। কিন্তু রিকশাচালক ৫০ টাকার কম যাবে না। পরে বাধ্য হয়ে দ্বিগুন ভাড়ায় তাকে আসতে হয়েছে। এমন চিত্র ঢাকা শহরের সর্বত্র।
বর্জ্য পরিস্কার করছেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের কর্মীরা।
তবে প্যাডেল চালিত রিকশার ভাড়া এই ঈদেও তেমন বাড়েনি বলে জানিয়েছেন রিকশাচালক মোহাম্মদ মহসিন। পল্টন মোড়ে শুক্রবার দুপুরে মহসিন বলেন, “ঈদের কিছু টাকা পয়সা রোজগারের জন্য বাড়ি গেলাম না। কিন্তু মানুষজন নাই, ভাড়াও নাই। ঈদের এই সময়ে চারশ টাকা তুলতে কষ্ট হচ্ছে। জমা টাকা দিয়ে খাওনের টাকাও বাঁচে না। এরকম হলে ঢাকায় থাকতাম না, পরিবার নিয়ে বাড়িতে চলে যেতাম।”