জাতীয়

সচিবালয়ে এআই প্রহরা

প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি ঢেলে সাজাচ্ছে সরকার। কেবল সিসিটিভি নয়, এবার যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ড্রোন, আরএফআইডি, বায়োমেট্রিক ও ডিজিটাল পাস। নতুন এই স্মার্ট প্রহরা সচিবালয়ে আসা ব্যক্তিদের মুখ চিনবে, গাড়ি স্ক্যান করবে ও সন্দেহজনক গতিবিধি ধরিয়ে দেবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে বসানো হবে ৬২৪টি ক্যামেরা। এর মধ্যে ৪৩টি ফেস ডিটেকশন ক্যামেরা মুখ শনাক্ত করবে, ২০টি বুলেট ক্যামেরা দূর থেকে নজর রাখবে, চারটি পিটিজেড ক্যামেরা ঘুরে ঘুরে পুরো এলাকার ছবি নেবে। আকাশপথে নজরদারিতে থাকবে সাতটি ড্রোন ক্যামেরা।

পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ৯৯টি পয়েন্টে বসবে এআইভিত্তিক অত্যাধুনিক ক্যামেরা। এসব ক্যামেরা শুধু ভিডিও করবে না চেহারা শনাক্ত, গাড়ির নম্বর চিহ্নিত ও সন্দেহজনক আচরণ বিশ্লেষণ করবে। অজানা মুখ বা অনুমোদনহীন গাড়ি ঢুকতে চাইলেই মনিটরিং রুমে বেজে উঠবে অ্যালার্ম। সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছবি সরাসরি কেন্দ্রীয় সার্ভারে জমা হবে। পরে একই ধরনের গতিবিধি দেখলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিক নজরদারিতে নেবে।

২০২৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাত ৩টায় সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুন লাগার ঘটনা প্রশাসনকে বড় ধাক্কা দেয়। তদন্তে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্যামেরা বিকল, ব্যাগেজ স্ক্যানার অকেজো। এরপরই নিরাপত্তা আধুনিকীকরণে তোড়জোড় শুরু হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ পেলেই ক্যামেরা কেনা শুরু হবে। প্রকল্পটি সচিবালয় নিরাপত্তা আধুনিকীকরণ নামে কাজ করবে। ভবিষ্যতে বায়োমেট্রিক এক্সেস কন্ট্রোল, ভিজিটর ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ফায়ার অ্যালার্ম ইন্টিগ্রেশন ও স্বয়ংক্রিয় প্রবেশগেট যুক্ত করার পরিকল্পনাও আছে। এআই ক্যামেরা ও ডেটা অ্যানালাইসিসে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই ধরা যাবে। তবে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

গাড়িতে আরএফআইডি নিরাপত্তা জোরদারে সচিবালয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সচিবালয়ের চারটি গেটে এআইভিত্তিক ব্যাগেজ স্ক্যানার ও আর্চওয়ে স্থাপন করা হচ্ছে। এসব যন্ত্র দ্রুত ব্যাগ ও ব্যক্তিকে স্ক্যান করতে সক্ষম হবে এবং মাদক, ছোট অস্ত্রসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ বস্তু শনাক্ত করতে পারবে। ফলে প্রবেশপথেই সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি চিহ্নিত করা সহজ হবে।

যানবাহন প্রবেশপথেও বসানো হচ্ছে অত্যাধুনিক ভেহিক্যাল স্ক্যানার। কোনো গাড়ির ভেতরে সন্দেহজনক বস্তু বা ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান শনাক্ত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম বেজে উঠবে এবং সংশ্লিষ্ট গাড়ির প্রবেশ বন্ধ হয়ে যাবে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এই স্ক্যানার বর্তমানে ৫০০ মিলিলিটার বা তার বেশি পরিমাণ মাদক শনাক্ত করতে পারে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির সক্ষমতা আরো বাড়িয়ে ১০ গ্রাম পর্যন্ত মাদক শনাক্ত করার ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

সচিবালয়ের যানবাহন ব্যবস্থাপনায়ও যুক্ত হচ্ছে আরএফআইডি (রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন) প্রযুক্তি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত গাড়িগুলোতে বিশেষ আরএফআইডি স্টিকার লাগানো হবে। গেটে স্থাপিত লং-রেঞ্জ রিডার স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্টিকারের তথ্য শনাক্ত করবে এবং অনুমোদিত গাড়ির জন্য গেট খুলে যাবে। এতে প্রবেশ প্রক্রিয়া দ্রুত ও নিরাপদ হবে, পাশাপাশি অননুমোদিত যানবাহন প্রবেশের ঝুঁকিও কমবে।

নতুন প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- গাড়িতে থাকা যাত্রীদের সংখ্যা শনাক্ত করার সক্ষমতা। এর মাধ্যমে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর পাস ব্যবহার করে অতিরিক্ত ব্যক্তিদের সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় আরো কঠোরতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে।

এ ছাড়া সচিবালয়ে বিভিন্ন সামগ্রী বহনের ক্ষেত্রেও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্লাস্টিকের বোতল, পণ্য বা অন্যান্য বহনযোগ্য সামগ্রীর ওপর কড়াকড়ি আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করছে, আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তি, আরএফআইডিভিত্তিক যানবাহন ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে কার্যকর হলে সচিবালয়ের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হবে। এতে অননুমোদিত প্রবেশ, নিষিদ্ধ বস্তু বহন এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

পাস ও সময় বেঁধে প্রবেশ দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনাকেও সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় সচিবালয়ে প্রবেশের জন্য অনলাইন নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হবে। নিবন্ধনের সময় আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) যাচাই করা হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বায়োমেট্রিক তথ্যের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। যাচাই শেষে দর্শনার্থীদের জন্য কিউআর কোডসংবলিত অস্থায়ী ডিজিটাল পাস ইস্যু করা হবে, যা নির্ধারিত সময় ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে ব্যবহার করা যাবে।

এই আধুনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কে, কখন, কতবার এবং কোন উদ্দেশ্যে সচিবালয়ে প্রবেশ করেছেন, তার সম্পূর্ণ তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত থাকবে। কোনো ব্যক্তি অস্বাভাবিকভাবে ঘন ঘন প্রবেশ করলে বা তার চলাচলের ধরনে সন্দেহজনক কোনো বিষয় দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বয়ংক্রিয় নোটিফিকেশন পাবে। একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও প্রস্থানের সময়ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে।

‘টাইম-বেসড এন্ট্রি অ্যান্ড এক্সিট’ ব্যবস্থা চালু হলে একজন কর্মকর্তা নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য দর্শনার্থী পাস ইস্যু করতে পারবেন। প্রয়োজনে মাত্র এক ঘণ্টা বা তারও কম সময়ের জন্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়া সম্ভব হবে। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই দর্শনার্থীর মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় বার্তা পাঠানো হবে, যাতে তিনি সময়সীমা সম্পর্কে অবগত থাকতে পারেন। সময় অতিক্রম করলে পাসটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে এবং প্রয়োজন হলে পুনরায় অনুমোদন নিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা সচিবালয়ের নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনাকে আরো স্বচ্ছ, নিয়ন্ত্রিত ও কার্যকর করে তুলবে। একই সঙ্গে অননুমোদিত প্রবেশ, পরিচয় গোপন করে প্রবেশের চেষ্টা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইয়েদ মাহমুদ উল্লা বলেন, ‍“ইনফ্রারেড সেন্সরযুক্ত ক্যামেরা এখন সবচেয়ে কার্যকর। অন্ধকারে কাজ করে, শরীরের তাপমাত্রা ধরে, ছোট প্রাণীও শনাক্ত করে। ঠিকমতো বসালে ও রক্ষণাবেক্ষণ করলে ৮-১০ বছর নিশ্চিন্তে চলবে।”

সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, “নিরাপত্তা শুধু যন্ত্রের বিষয় না, এটা কৌশলগত সংস্কৃতি। পরিকল্পনায় যত গুরুত্ব, বাস্তবায়নে ততটা থাকে না। এটাই দুর্বলতা। সচিবালয়ের মতো জায়গায় এই দুর্বলতা মানায় না।”

সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অনেকেই সচিবালয়ে ঢুকে পড়ে। অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। এগুলো হুমকি, তবে পরিকল্পিত নাশকতা মনে হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এখানে নিয়মিত অফিস করেন, তাই ভিআইপি নিরাপত্তা যৌক্তিক। কিন্তু সচিবালয় পাবলিক অফিস। মানুষ কাজে আসবেই। প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত হতে পারে, বন্ধ নয়।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “সচিবালয়ের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. জসিম উদ্দীন বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কার্যক্রম সচিবালয়কেন্দ্রিক হওয়ায় নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী করা হচ্ছে। পুরোনো যন্ত্রপাতি বদলে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি বসছে। এতে প্রতিটি প্রবেশপথ ও চলাচল সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকবে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আগে কোটি টাকা খরচ করেও নিম্নমানের স্ক্যানার-ক্যামেরা বসানো হয়েছে। সিসিটিভি আছে, ফুটেজ নেই।এমন অবস্থা থেকে বের হতে হবে। নতুন ব্যবস্থায় গাড়িতে অস্ত্র বা মাদক থাকলে সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়বে।

সচিবালয়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, উন্নত বিদেশি প্রযুক্তি এবং প্রশাসনের আন্তরিক উদ্যোগ একসঙ্গে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে সচিবালয়ে বাস্তবায়িত এই মডেল দেশের অন্যান্য সরকারি ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও একটি অনুসরণযোগ্য টেমপ্লেট হয়ে উঠতে পারে।