বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমান সরকারকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
তিনি বলেন, “বিদ্যমান এসব চুক্তি ও পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তের কারণে সরকার এখন বড় ধরনের আর্থিক ও নীতিগত চাপে রয়েছে। কাঠামোগত এসব চুক্তি এমনভাবে করা হয়েছে যে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বেশি সুরক্ষিত হয়েছে, ফলে সরকারের জন্য সেগুলো পুনর্বিবেচনা করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, “বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে গ্যারান্টির ভিত্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জ চালু করা হয়েছিল। এর ফলে প্রকল্পগুলো ব্যাংকযোগ্য হয়েছে এবং দেশে বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। তবে বর্তমানে এই ব্যবস্থার কারণে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।”
তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন। কিন্তু বিদ্যমান চুক্তিগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যে সেগুলো থেকে বিনিয়োগকারীদের একতরফা সুবিধা তুলে নেওয়া সহজ নয়। আলোচনায় গেলেও অনেক বিনিয়োগকারী ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়তে রাজি হন না।
তিনি আরো বলেন, “চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করা হলে ব্যাংক ঋণ পরিশোধে সমস্যা হবে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে এসব কেন্দ্র বন্ধ করলে দেশে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিতে পারে।”
মন্ত্রী অভিযোগ করেন,“দীর্ঘদিন সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। ফলে সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং অধিকাংশ বিদ্যুৎ বেসরকারি খাত থেকে কিনতে হচ্ছে। এতে করে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া সৃষ্টি হয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিদ্যুৎ খাতে অনিয়মের দুটি উদাহরণও তুলে ধরেন। প্রথমটি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের একটি প্রকল্প, যেখানে পাঁচ লাখ ডিজিটাল মিটারের অর্ডার দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে আড়াই লাখ মিটার দেশে আনা হলেও তিন বছরে মাত্র ৬৫টি মিটার সংযোগ দেওয়া হয়। পরে বাকি আড়াই লাখ মিটার জাহাজীকরণের নির্দেশও দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “এ ধরনের সিদ্ধান্তের কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থ বাইরে চলে গেছে।”
দ্বিতীয় উদাহরণ হিসেবে তিনি ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) একটি উন্নয়ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন। সেখানে আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল ও সাবস্টেশন নির্মাণের পাশাপাশি স্কাডা ভবন ও টুইন টাওয়ার নির্মাণের মতো অতিরিক্ত কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রকল্পটি ২০৪০ সাল পর্যন্ত উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৮টি সাবস্টেশন নির্মিত হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, “প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ এখনো ৩০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এসব প্রকল্প একবার বন্ধ করলে ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া অর্থ অপচয় হবে, আবার চালিয়ে গেলে বাড়তি চাপ তৈরি হবে। এ কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তিনি বলেন, “লুটপাট করে চলে যাওয়ার পর যে প্যাকেজগুলো আমাদের দিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেগুলো এখন আমাদের সামাল দিতে হচ্ছে। আমরা মাত্র তিন-চার মাস হলো সরকারে এসেছি। এসব সমস্যা সমাধানে সময় প্রয়োজন।”