শিল্প ও সাহিত্য

সমাজমনস্কতার রেখাচিত্রী আবুল ফজল

অলাত এহসানদেশবিভাগ উত্তর সময়ে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানকে প্রায় সবদিক দিয়ে সংকটের মুখোমুখি পড়তে হয়েছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই সংকট ছিল সবচেয়ে প্রকট। একদিকে আত্মপরিচয়ের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ও প্রাধান্যের প্রশ্ন, অন্যদিকে নতুন ভূ-খণ্ডে প্রাতিষ্ঠানিক ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক অবকাঠামো নির্মাণের সংগ্রাম। সেই সংকটময় মুহূর্তে যে ক’জন পণ্ডিত মনীষা বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে প্রতিরোধমন্ত্র ও আত্মপরিচয় স্পষ্ট করে তুলতে চেয়েছেন আবুল ফজল তাদের অন্যতম। পরিবারিক ও রাষ্ট্রীয় বৈরি পরিবেশের মধ্যেই তিনি তার চিন্তাকে বিকশিত করেছিলেন। তিনি একাধারে সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ, অধ্যাপক।সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভাজনের ফলে প্রাপ্ত ভূ-খণ্ডে সংখ্যাগুরু ধর্মাবলম্বী হিসেবে তাঁর খুবই সুযোগ ছিল রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা হাতিয়ে নেওয়া। এর বিপরীতে তিনি পাকিস্তানিদের শাসন ও তাদের চাপিয়ে দেওয়া ভাষা-সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করেছিলেন দেশপ্রেমের গভীর বোধ থেকে। বুদ্ধিবৃত্তিকতার মধ্য দিয়ে প্রতিরোধেও সক্রিয় ছিলেন। বিশ্বাস করতেন, বুদ্ধির মুক্তিতে। আমরা দেখি, এ কারণেই সামাজিক কুসংস্কার থেকে মানুষকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে তিনি ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন। পরে সম্পাদকও হন। প্রখ্যাত ‘শিখা’ পত্রিকা ছিল এদের মুখপত্র। এই মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও শিখা’র সঙ্গে জড়িতরাই পরবর্তীতে ‘শিখাগোষ্ঠী’নামে ঢাকায় মুক্তবুদ্ধির আন্দোলন শুরু করে। ‘সাহিত্যের সংকট’ প্রবন্ধে তাঁর দূরদর্শিতার সম্যক পরিচয় মেলে। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির বেশ কিছুকাল আগে মাসিক ‘সমকাল’ পত্রিকায় তিনি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রবন্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তঃসার শূন্যতা তুলে ধরেন তিনি। সামরিক শাসন জারির পর ওই সংখ্যাটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। এ ছাড়া ১৯৬৭ সালে রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তিনি। এমনকি বিরোধীতার মুখে বাংলায় লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে তিনি নামের প্রথম থেকে ‘মোহাম্মদ’ শব্দটি বাদ দিয়েছিলেন।সে সময় সমাজসচেতন লেখক হিসেবেও আবুল ফজল সুপরিচিত ছিলেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, ভ্রমণকাহিনি, আত্মকথা, ধর্মসহ নানান বিষয়ে লিখেছেন। তার সমাজমনস্ক এবং চিন্তাশীল লেখায় উঠে এসেছে স্বদেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবোধ। শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি বরাবরই বিকাশধর্মীতার প্রতি উৎসাহী ছিলেন। ‘চিত্র-কলা’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লিখেন : ‘স্বদেশের নবজাগ্রত চিত্র-কলার প্রতি দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের এই যে অবহেলা ও অনাদর, এর মূলে, আমার মনে হয়, আমাদের কলা-শিল্প-জ্ঞানের অভাব ও অজ্ঞতাই দায়ী।...কর্তৃপক্ষ যদি প্রত্যেক স্কুল-কলেজে ছোটখাট এক-একটি চিত্রশালা (স্কুল লাইব্রেরী বা কমনরুমেও তা হতে পারে) প্রতিষ্ঠার আদেশ ও সেই বাবদ কিছু কিছু অর্থসাহায্যের ব্যবস্থা করেন তা হলে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজ থেকেই শিল্প-শিক্ষা আরম্ভ হতে পারে।’ তাঁর সেই কথা আজও প্রাসঙ্গিক।১৯০৩ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় বত্রিশ মাইল দক্ষিণ কেঁওচিয়া নামক অখ্যাত পাড়াগাঁ’য় তাঁর জন্ম। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, বাঙালি সংস্কৃতি এবং বাঙালি জাতির প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ ও মমত্ববোধ। যে কারণে পরিবারিক ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের গোঁড়ামি ও বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। গ্রামীণ আবহে বেড়ে ওঠা আবুল ফজল ছোট বেলা খানিকটা ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন। অর্থনৈতিক সংকটের জন্য স্কুলবেলায় মানুষের বাড়ি ‘জায়গির’ থাকতে হয়েছে। তবে তিনি ছিলেন অদম্য মেধাবী। তিনি বুঝেছিলেন, পারিবারিক গড়িমসির বাইরে আসার জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে ভালো করতে হবে। তাই মাদ্রাসা দিয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হলেও দ্রুতই তিনি মূলধারার শিক্ষায় যুক্ত হতে পেরেছিলেন। পরিবারের অমতে আইন পড়ার জন্য জেদ করে সামান্য খরচ নিয়ে কলকাতায় গিয়েছিলেন তিনি। পরে বাবার ইচ্ছা অনুযায়ী শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নির্ধারণ করেন।দীর্ঘ শিক্ষক জীবনে আবুল ফজল বিভিন্ন সময় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। চট্টগ্রাম কলেজে যোগ দেন ১৯৪৩ সালে। ১৯৫৯ সালে অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেওয়ার আগে তিনি এখানেই ছিলেন।স্বাধীনতা উত্তর সময়ে ১৯৭৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে যোগ দেন।১৯৭৫ সালের নভেম্বরে তিনি বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন। ১৯৭৭ সালের ২৩শে জুন তিনি এখান থেকে পদত্যাগ করেন। তবে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে হত্যার পরবর্তীতে গঠিত স্বৈরাচারী সরকারে তিনি কেন অংশগ্রহণ করেছিলেন এ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।‘রাঙ্গা প্রভাত’ উপন্যাসের জন্য ’৬০-র দশকে তাঁকে পাকিস্তানবিরোধী ও ইসলামবিরোধী তকমা দেওয়া হয়। কিন্তু আহমদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু’ বই পড়লে বোঝা যায়, দীর্ঘ দিনের উদার চেতা আবুল ফজল এই সময় ধর্মাশ্রয়ী জীবনযাপন শুরু করেন। বলা হয়, অনুশোচনা বোধ থেকেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আবুল ফজল রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ স্কুল কলেজে পাঠ্য হয়। ১৯৪৮-৪৯ সালে তাঁর সংকলিত ‘সাহিত্য চয়নিকা’ বইটি সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির পাঠ্য হয়েছিল। ‘রাঙ্গা প্রভাত’ উপন্যাসটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শ্রেণিতে পাঠ্য ছিল। বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে জসীমউদদীন ছাড়া আর কারো ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেনি। তাঁর রচিত ‘চৌচির’, ‘মাটির পৃথিবী’, ‘বিচিত্র কথা’ বই তিনটি ১৯৪০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকট পাঠানো হয়। অসুস্থ সত্বেও কবিগুরু তাঁকে দীর্ঘ পত্র লিখে শুভকামনা জানিয়েছিলেন।তাঁর রচিত ‘সাহিত্য সংস্কৃতি ও জীবন’, ‘সমাজ সাহিত্য রাষ্ট্র’, ‘শুভবুদ্ধি’ ও ‘সমকালীন চিন্তা’ শীর্ষক প্রবন্ধগ্রন্থগুলো তখন জাতিকে সঠিক দিশা পেতে সাহায্য করেছে। এসব রচনায় তাঁর গভীর ও স্বচ্ছ দৃষ্টিসম্পন্ন মনোভাব স্পষ্ট। তাঁর ‘সফরনামা’ বাংলাসাহিত্যের সূচনাপর্বে অন্যতম ভ্রমণকাহিনি হিসেবে খ্যাত হয়ে আছে। তাঁর অন্যান্য বইয়ের মধ্যে আছে ‘জীবনপথের যাত্রী’, ‘আয়েশা’, ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’।বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন আবুল ফজল। বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদকসহ বিবিধ পদকে ভূষিত হন তিনি। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০১২ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। । ১৯৮৩ সালের ৪ মে বাংলাদেশের প্রখ্যাত এই সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ চট্টগ্রামে মৃত্যুবরণ করেন। ‘রেখাচিত্র’ ও ‘দুর্দিনের দিনলিপি’ তাঁর দুটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। গ্রন্থদ্বয় সে সময়কার আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। বোঝা যায়, জীবন ও সাহিত্য দিয়ে যথার্থ অর্থেই তিনি সমাজমনস্কতার রেখাচিত্র এঁকেছেন।অলাত এহসান : গল্পকার ও সাংবাদিকরাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ মে ২০১৫/তাপস রায়