সাতসতেরো

হারিয়ে গেছে চন্দ্রকুমার দে’র স্মৃতি-নিদর্শন

সঞ্জয় সরকার : চন্দ্রকুমার দে। বিশ্বখ্যাত ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র সংগ্রাহক। তার সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের এই অমূল্য কীর্তি। পল্লীর সাধারণ মানুষ রচিত এই গীতিকা বাংলা সাহিত্যে গৌরব বয়ে এনেছিল। কিন্তু বলা বাহুল্য, চন্দ্রকুমার দে’র নিজ গ্রামে আজ তার কোন স্মৃতি-চিহ্ন নেই। বেহাত হয়ে গেছে তার পৈত্রিক বাস্তভিটা। সংগ্রহ ও সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে তার অনেক রচনা-নিদর্শনও। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার একটি গ্রাম আইথর। এই গ্রামে ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন চন্দ্রকুমার দে। বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি। বাবা রামকুমার দে ছিলেন দরিদ্র গৃহস্থ। অভাব-অনটনের মধ্যেও ছেলেকে লেখাপড়া করাতে চেয়েছিলেন তিনি। ভর্তি করিয়েছিলেন পাঠশালায়। কিন্তু নানা বাস্তবতায় চন্দ্রকুমারের লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই তাকে গ্রামের এক মুদি দোকানে এক টাকা মাইনের চাকরি নিতে হয়। কিন্তু দোকানের খাতায় হিসাব-নিকাশের বদলে ছড়া-কবিতা লিখে রাখায় মালিক বিরক্ত হন। এ কারণে কাজটি হারান তিনি। এরপর থেকেই পল্লী গাঁয়ের গানের আসরে তার উপস্থিতি প্রায় নিয়মিত হয়ে পড়ে। বিষয়টির প্রতি তিনি ভীষণ আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে রাতভর গান শোনা এবং গানের কাহিনি লিখে রাখাটাই হয় তার প্রধান কাজ।১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে কেদারনাথ মজুমদার সম্পাদিত ময়মনসিংহের ‘সৌরভ’ পত্রিকায় ‘মহিলা কবি চন্দ্রাবতী’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এটি লিখেছিলেন চন্দ্রকুমার দে। এরপর থেকেই কেদারনাথ মজুমদারের উৎসাহে ওই পত্রিকায় নিয়মিত লিখতে থাকেন তিনি। কেদারনাথ মজুমদারের সহযোগিতাতেই গৌরীপুরের কালীপুর এস্টেটের জমিদার বিজয় কান্ত লাহিড়ীর অধীনে মাসিক আট টাকা বেতনে তহশিলদারের চাকরি হয় তার। চাকরির সুযোগে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ আরও বেড়ে যায় তার। কিন্তু গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে তহশিলের বদলে তিনি লিখে আনতে লাগলেন পল্লীর গায়েনদের গাওয়া উপাখ্যান। ফলে এই চাকরিটিও তাকে হারাতে হয়। ততদিনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দীনেশচন্দ্র সেন তার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তিনি ‘সৌরভ’ পত্রিকায় চন্দ্রকুমার দে’র লেখা নিয়মিত পড়তেন। ড. দীনেশচন্দ্র সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে মাসিক ৭০ টাকা বেতনে পালাগান সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত করেন। এতে তার আর্থিক অনটন যেমন দূর হয়, তেমনি মনের মতো কাজ পেয়ে খুশিও হন।

চন্দ্রকুমার দে ৫৭ বছর বেঁচে ছিলেন। এ সময় তিনি শুধু মৈমনসিংহ গীতিকার গানই নয়, পূর্ববঙ্গ গীতিকার চার খণ্ডে যে ৫৪টি পালা মূদ্রিত হয়েছে সেগুলোর অন্তত ২৫টির সংগ্রাহক ছিলেন। তার সংগৃহীত পালা গীতসমূহের মধ্যে রয়েছে মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতী, কমলা, দেওয়ান ভাবনা, দস্যু কেনারাম, রূপবতী, কঙ্ক ও লীলা, দেওয়ান মদিনা, ধোপার পাট, মইষাল বন্ধু, ভেলুয়া, কমলা রানীর গান, দেওয়ান ঈশাখাঁ, ফিরোজ খাঁ দেওয়ান, আয়না বিবি, শ্যামা রায়ের পালা, শিলাদেবী, আন্ধা বন্ধু, রতন ঠাকুরের পালা, পীর বাতাসী, জিরালনি, সোনারায়ের জন্ম ও ভারাইয়া রাজার কাহিনি। এ ছাড়াও অসংখ্য কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন তিনি। সংগ্রহ করেছিলেন গ্রাম-বাংলায় ছড়িয়ে থাকা লোকসাহিত্যের আরও নানা নিদর্শন। যার অনেকগুলোই সংগ্রহ ও সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে। নিজ গ্রাম থেকে ‘মহাভারতী’ নামে একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন চন্দ্রকুমার। গ্রাম-বাংলার সন্তান চন্দ্রকুমার শহরের সুধীজনদের ঘনিষ্ট সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। তবু তিনি ছিলেন নিতান্তই গ্রামের মানুষ। গ্রামই ছিল তার সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্র। গ্রামে থেকেই ভয়াবহ দারিদ্র্য ও প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু আজ আর সেই গ্রামে তার কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। চন্দ্রকুমার নিঃসন্তান ছিলেন। বিনয় কুমার ও জ্যোৎস্না রানী নামে দুই ছেলেমেয়েকে দত্তক নিয়েছিলেন। ’৪৭ এর দেশ ভাগের পর তারা ভারত চলে যান। ৭৩ শতাংশ জমিসহ আইথর গ্রামের বাড়িটি বিক্রি করে দিয়ে যান সোনাফর, মনফর ও হাসিম উদ্দিনের কাছে। যে ভিটাতে চন্দ্রকুমারের ঘর ছিল, সেখানেই ঘর তুলেছিলেন সোনাফর। উত্তরাধিকার সূত্রে এখন সে ভিটায় থাকেন সোনাফরের মেয়ে জোবেদ খাতুন। জোবেদা জানান, বাড়ি কেনার পর তারা চন্দ্রকুমারের রেখে যাওয়া বেশ কিছু কাগজপত্র পেয়েছিলেন। কিন্তু গুরুত্ব না বোঝার কারণে  সেগুলো ফেলে দেন। তিনি জানান, কয়েক বছর আগে বিশিষ্ট জনেরা এসে চন্দ্রকুমারের স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশে বাড়ির সামনে স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য জায়গা দিতে রাজি হয়েছিলেন তারা। কিন্তু পরবর্তীতে আর কেউ সেখানে যাননি।শেষ জীবনে ময়মনসিংহ শহরের নওমহল চকে বাড়ি কিনেছিলেন চন্দ্রকুমার। ওই বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুর পর সে বাড়িটিও বিক্রি করে দেয়া হয়। চন্দ্রকুমারকে দাহ করা হয়েছিল ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে কেওয়াটখালি শশ্মানঘাটে। পরিবার থেকে সেখানে ছাতাকৃতির একটি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পাকিস্তানি সেনারা স্তম্ভটিও ভেঙে দেয়। এভাবেই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যান চন্দ্রকুমার দে। এখন নিজ গ্রামের মানুষের কাছেই তিনি অচেনা একটি নাম।রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৯ মে ২০১৫/তাপস রায়