শাহাদৎ রুমন
দ্বৈতাদ্বৈত ও ফিউশন তত্ত্বের প্রবর্তক সেলিম আল দীন ঔপনিবেশিক নাট্য অনুকৃতির বিপরীতে বাঙালির স্বতন্ত্র নাট্যের অস্তিত্ব প্রমাণে স্বীয় প্রজ্ঞায় বাংলা নাটকের বিষয় ও আঙ্গিক নির্মাণ করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নাট্যরীতিই মূলত ‘আধুনিক বাংলা বর্ণনাত্মক’ নাটক হিসেবে পরিচিত। তাঁর নাটকের অন্যতম উপাদানরূপে বঙ্গ-ভূমির সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন এবং জীবিকা উঠে এসেছে। প্রকাশিত হয়েছে বহুমাত্রিক পেশাজীবী মানুষের কর্ম এবং মনস্তত্ত্ব। এক কথায়, তিনি বঙ্গীয় সংস্কৃতিকে নব দার্শনিকতায় উপস্থাপন করেছেন নাটকের মধ্যে। সেলিম আল দীনের নাটকে ঐতিহ্যের প্রেরণায় উৎসারিত নারী-পুরুষ চরিত্র-সংস্কৃতি, সমকালের ছায়ায় হয়ে উঠেছে নবকালের। পৌরাণিক ও সমকালের সংমিশ্রণে তাঁর সৃজিত চরিত্রের বিকাশ এবং পরিণতির দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, সময়-ভূগোল প্রেক্ষাপটের ভিন্নতায় তারা হয়ে ওঠে আধুনিক কালের মানুষ, আধুনিক মানুষের জীবন যন্ত্রণার প্রতিভূ।সেলিম আল দীনের দ্বিতীয় পর্বের (শকুন্তলা থেকে) নাটকগুলিতে করণকৌশলের সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রসমূহের রূপও পরিবর্তিত হয়ে যায়। চরিত্র হিসেবে স্থান করে নেয় সমাজের সেই সকল মানুষ যারা সামাজিকভাবে নীচু বা সাধারণ স্তরের মানুষ কিংবা খেটে-খাওয়া সম্প্রদায়। একইসঙ্গে খেটে-খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ চিত্রণ করার প্রয়োজনে সেলিম আল দীন বাংলাদেশ ও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পরম্পরা রূপকে তুলে ধরেন। কেননা, শ্রমজীবী মানুষের সংস্কৃতিতে পরম্পরা তথা ঐতিহ্যিক প্রবহমানতা বিদ্যমান। এ কথা সকলেই অবগত যে, বাংলাদেশে বসবাসকৃত বিভিন্ন আদিবাসী ও কৌম সম্প্রদায়গুলো ভাষার ভিত্তিতে নিজেদের বাঙালি হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয়। ফলে নাট্যকার সেলিম আল দীনও নাটকে বিভিন্ন আদিবাসী এবং কৌম সম্প্রদায়ের স্বাজাত্যবোধকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে রূপমণ্ডিত করেছেন। তাঁর নাটকসমূহে মানুষের প্রতি মানুষের কল্যাণ ও মানবতাবোধের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে।সমাজ বিকাশের ধারায় সামাজিক যে প্রবৃত্তি ত্যাগ করতে, কারো সহমর্মী হতে প্রেরণা দেয় তাই মনুষ্যত্ব। আর মনুষ্যত্বের অভ্যন্তরেই সক্রিয় মানবিক-বোধ। এই মানবিক-বোধ পরিক্রমায় মানুষ সংকীর্ণ চেতনাকে পেছনে ফেলে বৃহত্তর চেতনায় জাগ্রত হয়ে ওঠে। সে হয়ে ওঠে ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর মানুষ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়: ‘মানুষ আপন উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিসীমাকে পেরিয়ে বৃহৎ মানুষ হয়ে উঠছে, তার সমস্ত শ্রেষ্ঠ সাধনা এই বৃহৎ মানুষের সাধনা। এই বৃহৎ মানুষ অন্তরের মানুষ। বাইরে আছে নানা দেশের নানা সমাজের নানা জাত, অন্তরে আছে এক মানব।’মানুষ হিসেবে এই বিশ্বমানবে তথা বৃহৎমানবে উন্নীত হওয়ার প্রয়াস চিরকালীন মানুষের ধর্ম। সমাজস্থ শিল্পী-সাহিত্যিকদের শিল্পকর্মেও এই বৃহৎমানবের সাধনা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এই ধারাবাহিকতা সেলিম আল দীনের অন্যতম শিল্পদার্শনিক অভিপ্রায়। তবে, সেলিম আল দীনের রচনার মূলে যে দার্শনিক অভিপ্রায়- তা হলো সামষ্টিক চিন্তা-চেতনার জাগরণ। সামষ্টিক চিন্তা-চেতনার রূপটি তাঁর আতর আলীদের নীলাভ পাট, কিত্তনখোলা, হাত হদাই, বনপাংশুল, যৈবতী কন্যার মন, কেরামতমঙ্গল, স্বর্ণবোয়াল, ধাবমান প্রভৃতি নাট্যকাহিনির আধারে প্রতিফলিত। ‘আতর আলীদের নীলাভ পাট’ নাটকে দেখা যায়, পাট কাটতে গিয়ে আঙুল কেটে ফেলা আতর আলীর যন্ত্রণায় সহমর্মী হয়ে ওঠে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রৌঢ়, এবং বৃদ্ধ দুই মানুষ। তারা সারাক্ষণ আতর আলীর খোঁজ-খবর নেয়, তার বাড়িতে অবস্থান করে, কবিরাজ, মৌলানা, চিকিৎসকের কাছে ওষুধ আনতে যায়। তাদের মধ্যে দুই বৃদ্ধ আতর আলীর গরু দুটির জন্য নতুন দড়ি পাকিয়ে দেয়। এর প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় দ্বিতীয় বৃদ্ধের কথায় ‘আল্লা আল্লা কর। গুনা খাত্তার মাপ চা। আমরা আসতিছি। [এগিয়ে যায়] দড়ি পাকায় দিলাম, গলায় বাঁধতি বাকি; গরু দুইটার হাড্ডি দেখা যায়। বউরে ক গলায় বাঁধতি।’অর্থাৎ অসুস্থ আতর আলীর গরুর দড়ি পাকিয়ে দিয়ে এবং গরুর হাড্ডিসার দেহ ও আতর আলীর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে।‘কিত্তনখোলা’ নাটকে দিনমজুর সোনাই, কলু বছির, লাউয়া রুস্তম, যাত্রাশিল্পী রবিদাশ, ছায়ারঞ্জন, বনশ্রীবালা একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়ে ওঠে। এমনকি লাউয়া যুবক রুস্তম, খুনের ফেরার সোনাইয়ের পালানোর সহযাত্রী হয় গোত্র-সম্প্রদায় ত্যাগ করে। যাত্রাশিল্পী রবিদাশকে দেখা যায়, বনশ্রীবালা এবং ছায়ারঞ্জনের সমব্যথী হয়ে যাত্রাদলের কর্ণধার সুবল ঘোষের সঙ্গে ঝগড়া করে। কারণ, একদিন থানাপাড়া থেকে বনশ্রীবালাকে যাত্রাদলে নিয়ে এসেছিল রবিদাশ। তাই স্বাভাবিকভাবেই রবিদাশের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাতের আঁধারে ইদু কন্ট্রাক্টরের ভোগ্যপণ্য হয়ে ওঠা বনশ্রীবালা কিংবা ছায়ারঞ্জনের নেশার আসক্তি। অন্যদিকে ‘কেরামতমঙ্গল’ নাটকের নামচরিত্র কেরামত মানব ভ্রুণের প্রতি সহমর্মী। সে মানব ভ্রুণের নাশ মেনে নিতে পারে না। সে বিশ্বাস করে যে, মানব জন্মের কোনো দোষ নেই। প্রতিটি ভ্রুণই তার জন্মগত অধিকার সংরক্ষণ করে এবং স্বাভাবিক মানুষের মতো বেড়ে ওঠার অধিকার তারও আছে- এমন বিশ্বাসের প্রতিফলনই কেরামতের মানবভ্রুণের প্রতি ব্যক্ত আর্তনাদের মূল। সম্পূর্ণ নাটকে, কেরামত প্রথমে খালাতো বোন নওশাদীর ভ্রুণের প্রতি, পরে মুক্তিযোদ্ধা (বীরাঙ্গনা) নূরহাজাহানের ভ্রুণের প্রতি সহমর্মী এবং শমলার গর্ভের ভ্রুণ রক্ষার নিমিত্ত কেরামত উগ্রবাদীদের হাতে লাঞ্ছিত ও রক্তাক্ত হয়। ভ্রুণ আর মানুষের প্রতি কেরামতের এই মানবিকতায় মুচি দশরথ বলে: ‘বেবাকতে আমাগরে থুক থুক করছে। তুমি কর নাই কুনোদিন। আধ্বেক পিঁপরাতে খাওয়া ভুরুন কত না যতন কইরা মাটিতে গারলা। কত না মায়াগো তোমার পরাণের মধ্যে।’এ ছাড়াও কেরামতের অভ্যন্তরে ধর্মীয় সম্প্রীতি তথা মানুষের প্রতি মানুষের যে স্বাভাবিক মমত্ববোধ- তার স্ফুরণ লক্ষ করা যায় উচ্ছেদের ভয়ে ভীত অধরচন্দ্রকে বলা ‘কান্দ ক্যা অধর দাদা। তোমারে আমাগো ঘরের মাচানের উপরে ছাপায়া রাখুম’- এই কথায়। আবার নাটকের ‘হিজড়া’ খণ্ডে কেরামত হিজড়া তথা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ মদিনার কষ্ট-বেদনায় সহমর্মী। ‘হাজং’ খণ্ডে জমিদারের অত্যাচার তথা টঙ্ক প্রথার নামে নির্যাতনের প্রতিবাদস্বরূপ কেরামত সমতলবাসী বাঙালি ও জমিদারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। এরূপ সমগ্র নাটকে কেরামতের নানাবিধ মানবিক গুণসম্মত বৈশিষ্ট্যে বিদ্যমান। একপর্যায়ে, কেরামত উগ্রবাদীদের আক্রমণে রক্তাক্ত, আঘাতে আঘাতে তার দুই চোখ নষ্ট হয়ে যায়। তবু সে মানুষের কল্যাণ কামনা করে ঈশ্বরের কাছে। অর্থাৎ দুঃখময় জীবন পরিক্রমাই মহৎ কিংবা বৃহৎমানুষ হিসেবে কেরামতকে বিচার-বিশ্লেষণের অন্যতম মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। সে সমালোচক অরুণ সেনের ভাষায় হয়ে ওঠে ‘নব্যকালের যিশু’। সেলিম আল দীনের ‘হাত হদাই’ নাটকে মানুষের প্রতি মানুষের সহৃদয়তার নানারূপ বিদ্যমান আছে। নাটকের প্রধান চরিত্র জীবনপ্রেমী আনার ভাণ্ডারিকে ঘিরে এই সহৃদয়তা বিকশিত হয়েছে। সমগ্র নাটকে আনার ভাণ্ডারি মোদু, চুক্কুনী, বৃদ্ধ লোক টুপাস, আঙ্কুরী প্রমুখের দুঃখে যেমন সমব্যথী তেমনি সকলের সুখ-দুঃখের সঙ্গীও। তাঁর ‘চাকা’ নাটকে শ্রমজীবী মানুষের ভিন্ন এক মানবিক-বোধের চিত্র আছে। এ নাটকে অনামা এক লাশের প্রতি শ্রমজীবী ক্ষেতমজুরদের হৃদয়ে জাগ্রত মমত্ববোধের বিকাশ ঘটেছে। এমনকি ভুল ঠিকানার উদ্দেশ্যে অনামা লাশ বহন করতে করতে একসময় ক্ষেতমজুর শুকুর চাঁন, পৌঢ়, ডোম ধরমরাজ ও বাহের গাড়োয়ান লাশটিকে নিজেদের সঙ্গীও ভেবে নেয়। সেইসঙ্গে নয়ানপুর গ্রামের বৃদ্ধ সোনাফরের মায়ের প্রতিও তাদের অন্তরে জাগে পরম দরদ।
এ ছাড়াও লাশের প্রতি শ্রমজীবী মানুষের দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায় বাহের গাড়োয়ানের কথায়। সে লাশ ঘিরে সারবদ্ধ পিঁপড়া দূর করতে করতে বলে, ‘মানষের নজ্জা মানষে লিবে পিঁপড়েরে লিতে দেমো ক্যা?’ অর্থাৎ রাষ্ট্র তথা সরকারের প্রতিনিধিরূপে কোনো না কোনো একজন মানুষই লাশটির সঠিক ঠিকানা নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়। আর ভুল ঠিকানায় চলতে চলতে একসময় সারবদ্ধ পিঁপড়া লাশ-ভক্ষণে মত্ত হয়; যা মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া কষ্টকর। তাই সরকারের প্রতিনিধিরূপে ঠিকানা নির্ণয়ে ব্যর্থতার লজ্জা মানুষেরই- বাহের গাড়োয়ানের কথায় তারই প্রতিধ্বনি। আবার লাশের প্রতি কিংবা অপিরিচিত ও প্রাণহীন মানুষের প্রতি জীবিতের মমত্ববোধের প্রতিচ্ছবিও এখানে অনুধাবন করা যায়।সেলিম আল দীনের ‘যৈবতী কন্যার মন’ নাটকেও ক্ষুদ্র মানুষ বৃহৎমানুষে পরিণত হয়ে যায়। নাটকে দেখা যায়, কৈবর্ত পাড়ায় ধর্মনিরপেক্ষ পালা পরিবেশন করতে যাওয়া কালিন্দী ও আলাল তিনদিনের মাথায় সামন্তরূপী চাকলাদারের বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত এবং গ্রেফতার হয়। তখন আলালের দলের বাদ্যযন্ত্রী শুক্কুর লাঠি নিয়ে এগিয়ে যায় কালিন্দীকে রক্ষা করতে। কিন্তু শুক্কুর ব্যর্থ হয়। সে চাকলাদারের রক্ষীবাহিনীর তলোয়ারের আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হয়ে লুটিয়ে পড়ে নদীর বুকে। শুক্কুর কালিন্দী এবং আলালের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনও উৎসর্গ করতে পিছপা হয়নি। শুক্কুরের এই জীবনদানের মধ্যে ‘কেরামতমঙ্গল’ নাটকের কেরামতের অন্তিম আর্তনাদের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ কেরামত যেমন শমলার গর্ভের ভ্রুণ রক্ষায় উগ্রবাদী জনতার হাতে লাঞ্ছিত ও রক্তাক্ত হয়, তেমনি শুক্কুর কালিন্দী ও আলালের জীবন বাঁচাতেই নিজ জীবন উৎসর্গ করে। অর্থাৎ তারা উভয়েই মানুষের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে দ্বিধা করে না। আবার ‘বনপাংশুল’ নাটকে মান্দাই নৃগোষ্ঠীর প্রতি সমতলবাসী বাঙালির অত্যাচারের নানা দৃশ্য যেমন অবলোকন করা যায়, তেমনি তাদের প্রতি বাঙালি লুৎফর মাস্টারের সহমর্মিতা, সহযাত্রীর ভূমিকাও বিদ্যমান। নাটকের মধ্যে মান্দাই নৃগোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্কের নানা চিত্র ফুটে ওঠেছে। দেখা যায়, স্বজনহারা সোনামুখিকে কেন্দ্র করে সম্প্রদায়গত বিরোধে সমাজ ভাগ হয়ে যায়। তবুও সুকি সোনামুখিকে তাড়িয়ে দিতে পারে না, কিংবা অন্যের হাতে হত্যার উদ্দেশ্যেও তুলে দেয় না। অপরদিকে ‘স্বর্ণবোয়াল’ নাটকে কালিবাউস মাছের আঘাতে অসুস্থ খলিশা মাঝির জন্যে নায়েবালিসহ জেলেদের সহমর্মিতা এবং সাঁঝমালার জন্য তিরমনের, তিসির জন্যে তিরমনের মানবিক-বোধের পাশাপাশি প্রেমার্ত বিষয়ের ঐক্যতান ঘটেছে।সেলিম আল দীন অধিকাংশ নাটকে চিত্রিত করার প্রয়াস পেয়েছেন মানুষের পাশে মানুষের উপস্থিতি। কেননা তাঁর শিল্প অভিপ্রায়ে নিহিত আছে- ‘মানুষ মানুষের জন্য কাজ করবে, মানুষের দুঃখ ঘুচাবে, মানুষের জন্য ভালোবাসা উজাড় করে দেবে।’ তাই তাঁর নাটকে প্রথাগত অর্থে ‘খলনায়ক’ বা ‘এন্টাগোনিস্ট’ চরিত্রের আধিক্য দেখা যায় না। বরং মানবসমাজের বিকাশে অন্তরায় হিসেবে সামন্তবাদী সংস্কৃতি এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিপরীতে মানুষের অসহায়ত্ব ও অসহায় মানুষই বিশাল হৃদয়ের মানবিক-বোধ তাড়িত চরিত্রসমূহের আকাশমুখা-রূপ প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর নাটকে।কারণ সেলিম আল দীন সমাজের অবক্ষয়িত রূপ ও মানব বিনষ্টি আর মানুষের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র নাট্যকাহিনি হিসেবে নির্বাচন করেন বাস্তবিক মানুষের মঙ্গল কামনায়। ফলে তাঁর প্রায় প্রতিটি নাটকেই অত্যাচারিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষ বেঁচে থাকার প্রয়োজনে প্রত্যয়ী মনোভাবসম্পন্ন ও জীবনপ্রেমী মানুষ। এক কথায়, নাটকের কাহিনিতে মানবজীবনের অপরিসীম দুঃখ-বেদনা-যন্ত্রণাকে আবহ করেও শেষাবধি সেলিম আল দীন মানুষের জীবনে অমিত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনে প্রয়াসী। তাই তো সেলিম আল দীন কাহিনি পরিক্রমায় শ্রমজীবী, প্রান্তীয়, নিরন্ন, অসহায়, নিকৃত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও বেদনা-যন্ত্রণার চিত্র উপস্থাপনপূর্বক দর্শক-শ্রোতা-পাঠককে আহ্বান জানান জীবনের টানে সম্মুখ পানে। তিনি নাটকের মাধ্যমে আহ্বান জানান, এই পৃথিবী হোক ধর্ম-বর্ণ-বিত্ত নির্বিশেষে সকল মানুষের বাসযোগ্য।সেলিম আল দীন গবেষণার মাধ্যমে বাংলা নাটকের উৎপত্তি ও ইতিহাস সম্পর্কে বিরাজমান ভ্রান্তি দূর করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন যে, বাংলা নাটকের উৎপত্তি রাশিয়ান নাট্যব্যক্তিত্ব লেবেদেভ-এর মাধ্যমে ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে হয়নি। বরং বাংলা নাটকের উদ্ভব হয়েছিল হাজার বছর পূর্বে কৃত্যের অভ্যন্তর দিয়ে। বাংলা নাটকের প্রকৃত ইতিহাস উদ্ঘাটনে তাঁর গবেষিত আঁকর গ্রন্থ হলো ‘মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য’। বাংলা নাটক সম্পর্কিত তাঁর প্রণীত আরও একটি গ্রন্থ হলো ‘বাঙলা নাট্যকোষ’। এ ছাড়াও তিনি বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করেন।স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায় স্বদেশজাত সংস্কৃতি অন্বেষণে গঠিত ‘ঢাকা থিয়েটার’ এবং ‘গ্রাম থিয়েটার’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সেলিম আল দীন। তিনি সবর্দা বাঙালি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য বিশ্বদরবারে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ফলে তিনি মধ্যযুগের ধর্ম-দর্শন শ্রীচৈতন্য দেবের ‘অচিন্তদ্বৈতাদ্বৈত’বাদের প্রেরণায় বাংলায় প্রথম ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্পতত্ত্বের সৃজন করেন। লক্ষণীয় যে, সেলিম আল দীনই বাংলা সাহিত্যে একমাত্র লেখক যিনি একাধারে শিল্পতত্ত্বের প্রর্বতকও। এমনকি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে নিজস্ব ধারার সৃজন ও সেই ধারায় অনুসারী সৃষ্টিতে সেলিম আল দীনই ব্যতিক্রম। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বর্ণনাত্মক ধারায় তরুণ নাট্যকারগণ বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। যা সাধারণত আধুনিক বাংলা সাহিত্যে লক্ষ করা যায় না। বাংলা নাটকের প্রকৃত ইতিহাস প্রতিষ্ঠা ও বাঙালির নিজস্ব নাট্যধারা সৃজনের জন্য সেলিম আল দীনকে ‘আধুনিক বাংলা নাটকের জনক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে- যা ভ্রান্ত নয়। কেননা, সেলিম আল দীনই ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের আধুনিক রূপ-রীতির পূর্ণাঙ্গ বিনির্মাণকারী নাট্যকার। এমনকি তাঁর প্রবর্তিত শিল্পমত বর্তমান বাংলাদেশে চর্চিত নাট্যধারায় বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। ফলে সমকালীন সময়ে পাশ্চাত্যের অনুসৃত নাট্যরীতির পাশপাশি স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে চলেছে ‘বাংলা বর্ণনাত্মক’ নাটকের ধারা। বাংলা নাটক ও সাহিত্যে অবদানের জন্য সেলিম আল দীন ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’, ‘একুশে পদক’সহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন। বাংলা নাটকের প্রবাদ পুরুষ সেলিম আল দীনের ৬৬তম জন্মদিনে জানাই পরম শ্রদ্ধা।লেখক : নিবন্ধকার
রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৮ আগস্ট ২০১৫/তাপস রায়