কৃষি

চীনের আকাশে বাংলার ঘুড়ি

|| শান্তা মারিয়া ||

 

(চকবাজার টু চায়না- দশম কিস্তি) : বড় হয়েছি পুরনো ঢাকায়। ঘুড়ির প্রতি বিশেষ ভালো লাগা তো থাকবেই। তবে শৈশবের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘুড়ির খেলাও শেষ হয়ে গেছে বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া শৈশবের আনন্দ নতুনভাবে ফিরে পেলাম চীনে গিয়ে। বেইজিংয়ে থাকার সময় দেখেছি পার্কে ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন বয়স্ক মানুষরা। এইসব ঘুড়ির সঙ্গে যন্ত্র লাগানো থাকে। সেগুলো খেলনা বিমানের মতো ওড়ে। আবার যন্ত্র লাগানো ছাড়া ঘুড়িও দেখেছি অনেক। চীনের যেকোনো পার্কের সামনে ঘুড়ি বিক্রি হয় দেদার। বিশাল আকৃতির ঘুড়ি ওড়াতেও দেখেছি বাড়ির কাছের পাচিয়াও পার্ক এবং স্কালপচার পার্কে। ঘুড়ি উৎসব হয় এমনটাও আগেই শুনেছিলাম কিন্তু চীনে চাকরি করার সময় সেই উৎসব দেখার সুযোগ হয়নি।

 

২০১৩ সালে বাংলাদেশ ঘুড়ি ফেডারেশনের দলের সদস্য হয়ে আবার চীন গিয়ে সুযোগ মিলল ঘুড়ি উৎসবে অংশ নেওয়ার। এই উৎসবে গিয়ে বুঝলাম ঘুড়ি নিছক ‘ছেলেখেলা’ নয়। কেবল ‘ছেলেদের’ খেলাও নয়, ঘুড়ি উৎসবে অংশ নেওয়া নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রচুর সংখ্যক মানুষ এই মনোমুগ্ধকর খেলাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন।

 

বিশ্বে ঘুড়ির জন্মস্থান চীন দেশ এবং বিশেষভাবে ওয়েইফাং শহর। শান তুং প্রদেশের ওয়েইফাং শহরে প্রতিবছরই ২০ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে পাঁচদিন ধরে চলে ঘুড়ি উৎসব। ২০১৩ সালে সেই উৎসবে অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশসহ প্রায় ৪০টি দেশের ঘুড়িপ্রেমীরা।

 

প্রথমে শোনাই এই উৎসবে আমার অভিজ্ঞতার গল্প। সে বছর হঠাৎ করেই দারুণ শীত পড়ল এপ্রিলের ১৯ তারিখে। অকালে তুষারপাত শুরু হলো। বেইজিং থেকে যখন শানতুংয়ের দিকে ট্রেন যাচ্ছে তখনি চারপাশে তুষারের চিহ্ন দেখে অবাক হয়েছি। কারণ এপ্রিলে কখনও চীনে তুষার দেখিনি। যাই হোক ২০ এপ্রিল সকালবেলা পৌঁছালাম উৎসব ভেন্যুতে। ওয়েইফাং শহরের প্রান্তে ফু-ইয়ান-শান আন্তর্জাতিক ঘুড়ি উড্ডয়ন মাঠে এই উৎসবের আয়োজন করে চীনের রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের সহযোগিতায় ওয়েইফাং ইন্টারন্যাশনাল কাইট ফেডারেশন।

 

২০ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকেই বিস্তৃত প্রান্তরে ঘুড়িপ্রেমীকরা জমায়েত হতে থাকেন। ওয়েইফাংসহ চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে এর আগের দিন বিকেল থেকেই অপ্রত্যাশিতভাবে শুরু হওয়া তুষারপাত তখনও চলছিল। পুরো মাঠ ও আশপাশের এলাকায় তুষারের আচ্ছাদন। মেঘলাআকাশ ও তুমুল তুষারপাত উপেক্ষা করে ওয়েইফাংয়ের আকাশে ওড়ে শত শত বিচিত্র বর্ণের ও আকৃতির ঘুড়ি। বরফ ঢাকা মাঠে বিভিন্ন বয়সের শত শত ঘুড়িয়ালের পদচারণা। রঙিন মেঘ উড়িয়ে ঘোষিত হলো উৎসবের উদ্বোধন। বরফ ঢাকা মাঠে, মেঘলা আকাশে সেই বহু বর্ণের মেঘ সৃষ্টি করল চোখ জুড়ানো দৃশ্যের।

 

সকাল সাড়ে দশটায় উৎসবের উদ্বোধন হয়। চীনের ঐতিহ্যবাহী বেইজিং অপেরা শিল্পীদের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সূচনা ঘটে উদ্বোধনী সাংস্কৃতিক উৎসবের। পর পর পরিবেশিত হলো ড্রাগন নৃত্য, উশু এবং চীনের ঐতিহ্যবাহী অন্যান্য নৃত্য। শিল্পীদের বর্ণিল পরিবেশনা ও মেঘলা আকাশে অসংখ্য বর্ণিল ঘুড়ির উপস্থিতি পরিবেশকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তোলে। ঘুড়ির জন্মভূমি চীনের ওয়েইফাংয়ে। এই উৎসবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ির উড্ডয়ন চলছিল সেদিন।

 

বাংলাদেশ ঘুড়ি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মৃধা বেনুর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের বাংলাদেশ দলে ছিলেন মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ আবদুস সামাদ, মাহমুদ হোসেন তওফিক বাবর, চীন আন্তর্জাতিক বেতারের সাংবাদিক শিহাবুর রহমান ও আমি। উৎসবের দ্বিতীয়  দিন ২১ এপ্রিল বাংলাদেশ দলের সদস্য মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ও মোহাম্মদ আবদুস সামাদ ঘুড়ি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় দিন ছিল প্রথম দিনের সম্পূর্ণ বিপরীত। ঝকঝকে রোদ। তুষারের চিহ্নমাত্র নেই কোথাও। চারদিকে ফাল্গুনের বাতাস বইছে। চীনের খামখেয়ালি আবহাওয়ার সঙ্গে পরিচয় থাকায় আমি, শিহাব, বাবর ভাই এবং বেনু ভাই অবাক হইনি। কিন্তু ভীষণ অবাক হয়েছেন দলের দুই ঘুড়িয়াল। আগের দিন তারা পরে ছিলেন সাধারণ ফুলহাতা শার্ট। সঙ্গে কোনো সোয়েটারও তারা আনেননি। ভেবেছিলেন গ্রীষ্মকালে আবার সোয়েটারের দরকার কি? বরফের মধ্যে সারাটা সকাল তারা ঠকঠক করে শীতে কেঁপেছেন। শীতের ঘটা দেখে বিকেলে অনেক টাকা ব্যয় করে গরম জ্যাকেট কিনেছেন। আজ সেই গরম কাপড় পরে চৈত্রের রোদে তারা রীতিমতো ঘামছেন| সহানুভূতি জানানো ছাড়া আর কি করার আছে আমাদের।

 

সকাল ৮টা থেকেই মাঠে উড়ছে বৈচিত্র্যময় ঘুড়ি। রয়েছে প্রজাপতি, পাখি, অক্টোপাস, ড্রাগন, স্টিংরে, পুতুলসহ বিভিন্ন রকম ত্রিমাত্রিক ঘুড়ি।

 

ঘুড়ি উৎসবে বাংলাদেশ দল

 

২৩ তারিখে সকালে আমাদের সবাইকে বাসে করে নিয়ে যাওয়া হলো শহর থেকে দূরে বিনহাইতে। এটা হলো নদীর তীরের শিল্পাঞ্চল। সেখানে বিশাল উন্মুক্ত প্রান্তরে উৎসবের সমাপনী শুরু হলো। প্রথমেই সংগীতের আয়োজন। একের পর এক প্রখ্যাত শিল্পীরা উঠলেন। শুধু গান নয়, দলগত নাচও হলো। দারুণ পরিবেশনা তাদের। রীতিমতো চোখ ধাঁধানো, মন ভোলানো আয়োজন। তারপর এলো পুরস্কার বিতরণীর পালা। বিভিন্ন দল পুরস্কার পেল একক ও দলীয় কৃতিত্বের জন্য। বাংলাদেশ দলের জন্যও ছিল বিশেষ পুরস্কার। লড়াকু মনোভাব ও সাহসী ভূমিকার জন্য বাংলাদেশ দলকে পুরস্কৃত করা হলো। আমরা সবাই মঞ্চে উঠে একসঙ্গে পুরস্কার গ্রহণ করলাম।

 

ওয়েইফাং শহরটা দারুণ সুন্দর! এক বিকেলে বেড়াতে বের হলাম আমি ও শিহাব। একটি ছোট্ট নদীর দুই তীর ধরে হাঁটার পথ। মাঝে মাঝে ছোট ছোট সেতু রয়েছে যা দিয়ে এক তীর থেকে অন্য তীরে যাওয়া যায়। অসাধারণ সুন্দর বাতাস বইছে। নদীর দুই তীরেই চমৎকার সব ভাস্কর্য। দোকানপাটও রয়েছে। ফুটপাথেও বিক্রি হচ্ছে নানা রকম জিনিস। পোষার জন্য কুকুর ছানা, খরগোশ, পাখি বিক্রি হচ্ছে খাঁচায়। দেখতে ভীষণ মিষ্টি এগুলো।

 

ওয়েইফাং শহরে রয়েছে ঘুড়ির জাদুঘর। এটিও দেখার মতো জায়গা। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত মানুষ যত প্রয়োজনে যত রকম ঘুড়ি ব্যবহার করেছে তার সব নমুনা রয়েছে এখানে। পুরো শহরটি সুন্দর করে সাজানো গোছানো এবং অধিবাসীরাও বেশ হাসিখুশি। মনে হয়, সম্ভব হলে এখানেই থেকে যাই।

 

এক বিকেলে ওয়েইফাংয়ের একটি পার্কে বেড়াতে গেলাম আমরা সবাই। এটি আয়োজকদের কর্মসূচির মধ্যে। বিভিন্ন দেশের ঘুড়িপ্রেমীদের সঙ্গে জমল আলাপ। সেই সঙ্গে বেড়ানো। অপূর্ব সুন্দর বিশাল পার্ক। রুমানিয়ার এক ঘুড়িপ্রেমীর সঙ্গে ভালো আলাপ হলো। তিনি প্রতিবছরই এ উৎসবে আসেন। ২৪ এপ্রিল সকালে এলো ওয়েইফাং থেকে বিদায়ের পালা। বিভিন্ন দেশের ঘুড়িপ্রেমীরা ফিরে যাবেন যার যার দেশে। আগামীতে আবার দেখা করার প্রতিশ্রুতি জানিয়ে বিদায় নিলেন তারা। যেন ঘুড়িপ্রেমের বিনা সুতোয় বাঁধা আছেন এরা।

 

ফু-ইয়ান-শান পাহাড়ি উদ্যানজুড়ে বিভিন্ন গাছে সবুজ পাতা মেলেছে। যেদিকে চোখ রাখি শুধু দেখা যায় চেরি ফুলের সমারোহ। এর মধ্যে ওয়েইফাং শহরের আকাশে ঘুড়ির মেলা। নীল আকাশে অসংখ্য ঘুড়ির ওড়াউড়ি। শত ঘুড়ির ভিড়ে চীনের আকাশে উড়ছে বাংলার লাল-সবুজ ঘুড়ি। মনে পড়ল ছোটবেলায় কবিতা পড়েছিলাম ‘ঘুড়িরা উড়িছে আকাশে ঐ’।

     

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ জানুয়ারি ২০১৬/তারা