ভ্রমণ

তনু হত্যা ও কিছু কথা

মাহমুদা রিদিয়া রশ্নি : স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। স্বাধীনতার যে মর্যাদা তা আমাদের দেশে বলতে গেলে অনেকখানি মলিন। এ কথার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গেলে উঠে আসে বর্তমান সময়ে আলোচিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যার ঘটনা।

 

তনুর ঘটনা আরো একবার আমাদের আঙুলি নির্দেশ করে বলে দেয় যে, স্বাধীনতার প্রায় তিন যুগেরও বেশি সময় পরে দেশের নারীরা স্বাধীন বা নিরাপদ নয়। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সংবিধান নারীদের স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও একটি নির্দিষ্ট ধাপে পুরুষ শাসিত সমাজে ধর্ষণ, এসিড সন্ত্রাস, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় নারীদের।

 

দেশে নারী শিক্ষার হার বাড়ছে। পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রচলিত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নারীরা বিভিন্ন সামাজিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রগতিশীল শিক্ষিত জাতি গড়ে তোলার পাশাপাশি শিশুর বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে নারীরা সম্মান, সুযোগ ও নিরাপত্তা এবং অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার মত মৌলিক অধিকার পাপ্য হলেও এই স্বাধীন রাষ্ট্র শতভাগ পূরণ করতে আজো সক্ষম হয়নি।

 

মার্চ মাস স্বাধীনতার মাস, নারী দিবসের মাস। নারী করবে বিশ্বজয়, নারীর চোখে বিশ্বকে দেখ, প্রগতিশীল নারী, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে নারীর এগিয়ে যাওয়া। নারী দিবসের এই স্লোগানগুলো নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণা যোগায়। এগুলো বাস্তবায়নের জন্য অগ্রসরমান নারীদের বিরুদ্ধে প্রায়শঃই বাধা হয়ে দাঁড়ায় এক শ্রেণির পুরুষ। এর ফলে অনেক নারীকেই হারাতে হয় ইজ্জত এমনকি প্রাণ।

 

একদিকে রাষ্ট্র নারীদের প্রগতিশীল হওয়ার  লক্ষ্যে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে। প্রগতিশীল হতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ভিকটিম হচ্ছে নারী। এর কারণ হিসেবে দোষ দেওয়া হচ্ছে সংক্ষিপ্ত বসনকে, পশ্চিমা সংস্কৃতির চর্চাকে। নারীরা পাচ্ছে না সঠিক মূল্য ও বিচার। তাই অপরাধীরাও দিন দুপুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরবর্তী টার্গেট পূরণের জন্য নতুন করে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।

 

এই যদি হয় অবস্থা তবে আমাদের মা, বোন ও কন্যাদের চোখের সামনে আশার আলো জ্বালানোর জন্য গলাবাজি করে বক্তৃতা দিয়ে নারী দিবস পালন করার দরকার কী? যথেষ্ট নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধা পেলে নারীরা এমনিতেই পারবে শিক্ষিত এবং প্রগতিশীল জাতি উপহার দিতে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

 

বর্তমানে বাংলাদেশের সরকার প্রধান ও স্পিকার নারী। এছাড়া জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এবং এমনকি প্রধান বিরোধী দলের চেয়ারপারসনও নারী। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশের বেশিরভাগ নারী এখনও নিরপত্তাহীন। পাচার, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের পরিবারকে হুমকির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

 

নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং অভিভাবক হিসেবে পরিবারের পরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থান। জনগণের বন্ধু হিসেবে যে কোনো বিপদে জনগণকে সাহায্য করা, অপরাধীকে শনাক্ত করা ও গ্রেফতার করা এবং জনগণকে নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু বর্ষবরণ উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণে নারীদের ওপর যে যৌন হয়রানি হয়েছে তার প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করেছে পুলিশ।

 

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে পুলিশের একজন সাব ইন্সপেক্টর রতন সম্প্রতি আশা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থীকে দেহ তল্লাশির নামে যৌন নির্যাতন করেছেন বলে অভিযোগ আছে। একটি সংরক্ষিত এলাকায় তনুর মৃতদেহ পাওয়া গেলো কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন আজো হলো না। এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্বে অবহেলা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরার বিষয়টি সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও নিম্ন-মধ্যম আয়ের এই দেশটিতে তনুরা কি মুক্ত বাতাস নিয়ে বেঁচে থাকতে পেরেছে? যেখানে তনুরা নিরাপদ না, সেখানে ‘বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’ এই কথা কীভাবে প্রযোজ্য হবে বাংলাদেশের জন্য।

 

পুরুষের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং নিরাপদ থাকার জন্য নাট্যকর্মী তনু রুচিশীল, ভদ্র, শালীন পোশাক ও হিজাব পরতেন। কিন্তু তনুর মৃত্যু এ কথাই বলে দেয় যে, ভদ্র ও শালীন পোশাক পরেও নারীরা নিরাপদ থাকতে পারছেন না।

 

গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, তনুর প্রথম ময়নাতদন্তের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভিসেরা পরীক্ষায় ‘বিষক্রিয়া পাওয়া যায়নি এবং ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি’। আদালত তার দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে লাশ উত্তোলনের আদেশ দেন। সে অনুযায়ী লাশ উত্তোলন ও ময়না তদন্তও হয়েছে। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে তাতে হতাশ হয়েছেন সাধারণ মানুষ।

 

প্রথম ময়নাতদন্তে ধর্ষণের আলামত না পাওয়ায় হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে- এই ভেবে সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ ও হতাশা সৃষ্টি হয়। তনুর ঘটনার রেশ না কাটতেই মধুপুরে চলন্ত বাসে একজন নারী যাত্রী এবং নারায়ণগঞ্জে এক তরুণী গণধর্ষণের শিকার হন।

 

তনু হত্যাকাণ্ডের পর দুই সপ্তাহ পার হলেও অপরাধী শনাক্ত হয়নি। গণমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে, পুলিশ হত্যারহস্য উদঘাটনে তৎপর।

 

হিউম্যান রাইটস ডকুমেন্টে (Human Rights Documents) (১) নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ ১৯৭৯ (Convention on the Elimination of all forms of Discrimination Against Women- CEDAW-১৯৭৯) এবং (২) নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর অমানবিক অথবা মর্যাদাহানিকর আচরণ অথবা শাস্তির বিরুদ্ধে সনদে-১৯৮৪ (Convention against Torture and Other Cruel, Inhuman or Degrading Treatment or Punishment –CAT-১৯৮৪) উল্লেখিত নারীদের নিরাপত্তাজনিত নির্দেশনাগুলো বাংলাদেশ এই সনদ দুটির কমিটি মেম্বার এবং অনুসমর্থক (Ratifier) দেশ হিসেবে ভালোভাবে পালন করতে সক্ষম হয়নি। দৈহিক নিরাপত্তার অভাবে তনুর এই পরিণতি হয়েছে বলা যেতে পারে।

 

ধর্ষণ এবং ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাকাণ্ড জঘন্যতম অপরাধ। অপরাধ সংঘটনের কয়েকটি তত্ত্ব যা অপরাধ বিজ্ঞানের গবেষণা ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তনু হত্যাকাণ্ডের ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

 

১।  জীবনধারা তত্ত্ব  (Life Style Theory): উচ্ছৃঙ্খল বা অবাধ জীবনাচরণ যা দৃষ্টিকটু, যেটির জন্য যে কেউ অপরাধীর চোখে টার্গেট হয়। সময়, পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে অপরাধীরা টার্গেট ব্যক্তির উপর আক্রমণ চালিয়ে শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক ক্ষতি করে এমনকি হত্যাকা- সংঘটিত করে যা এই তত্ত্বের মূল বিষয়। কিন্তু সমাজের একশ্রেণির পুরুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকার জন্য শালীন পোশাক পড়ে সাধারণ জীবনযাপন করতেন তনু যাতে টার্গেট হতে না হয়, ভিকটিম হতে না হয়। তবুও কেন তাকে প্রাণ দিতে হল?

 

২। নিষিদ্ধ বা খারাপ অঞ্চল তত্ত্ব (Deviant Place Theory) : যেখানে মানুষের চলাচল কম বা চরাঞ্চল সেখানে অপরাধ বেশি সংঘটিত হয় যা অপরাধবিজ্ঞানের অন্যতম তত্ত্ব ‘নিষিদ্ধ বা খারাপ অঞ্চল তত্ত্বের’ মূল বিষয়। কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টিত ও সেনাবাহিনীর সমাগম সমৃদ্ধ সেনানিবাসে তনুকে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখা হয়েছিল। এই তত্ত্ব অনুযায়ী খারাপ অঞ্চলে অপরাধ সংঘটিত হয়, নিরাপত্তাবেষ্টিত অঞ্চলে নয়। কিন্তু সেনানিবাস নিরাপত্তাবেষ্টিত অঞ্চল এবং সেখানে তনুর লাশ ফেলে রাখা হয়েছিল। তাহলে নিরাপত্তাবেষ্টিত সেনানিবাসেও কি আমরা নিরাপদ না?

 

৩। নিত্য কর্ম তত্ত্ব (Routine Activity Theory): টার্গেট নির্ধারণ করা থাকলে, সক্ষম অভিভাবক অনুপস্থিত থাকলে এবং অপরাধী টার্গেট ব্যক্তির কাছাকাছি থাকলে অপরাধ অবশ্যই সংঘটিত হবে। যেমন- অপরাধীরা (Motivated Offender) কোনো স্থানে কোনো একজনকে টার্গেট (Suitable Target)  করল ক্ষতি করার জন্য এবং সেখানে পুলিশ, দারোয়ান, সিসি টিভি (Absence of Capable Guardian) না থাকার জন্য টার্গেটব্যক্তি শিকার হল এবং অপরাধ সংঘটিত হল। অর্থাৎ, অপরাধ সংঘটনের জন্য Suitable Target, Absence of Capable guardian, Motivated Offender, সূচক তিনটি এই তত্ত্বের মূলবিষয়। কিন্তু যথেষ্ট নিরাপত্তাবেষ্টিত সেনানিবাসে সেনাবাহিনী, সিসিটিভি (Present Capable Guardian) থাকা সত্ত্বেও এমনকি বহিরাগতদের (Motivated Offender) প্রবেশ নিষেধ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তনু হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হয়?

 

‘পূর্বশত্রুতা, কুপ্রস্তাব বা যৌন লালসার জন্য একশ্রেণির লোকের অনুসরণ’ তনু হত্যাকা-ের মূল কারণ হিসেবে ধারণা করা যেতে পারে। তনু হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দেয়ার প্রবণতা তাতে বাংলাদেশ ও বিভিন্ন দেশের নারীসমাজ নিরাপত্তাহীনতা, হতাশা ও ভয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং নারীদের সামাজিক ও কর্মজীবনে এই ভয়ের সংস্কৃতির বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

 

মূলত শনাক্তকরণ, গ্রেফতার ও উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে নজিরবিহীন উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে যেন এ ধরনের অপরাধ করার সাহস আর কেউ না পায়।

 

রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে পুরুষ সমাজকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। ‘নারীদের অবস্থান সেখানেই যেখানে নারীরা পৌঁছাতে পারে’ মিশেল ওবামার এই কথাটির সঙ্গে একমত হয়ে বলতে চাই, এটি বাংলাদেশে তখনই সম্ভব যখন যথেষ্ট নিরাপত্তাসহ সমান সুযোগ নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে নারীরা প্রগতিশীল চেতনায় শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অগ্রসর হতে পারবে।

 

আদর্শ নেত্রী, আদর্শ সন্তান, আদর্শ স্ত্রী, আদর্শ মা হিসেবে একজন নারী পৃথিবীতে তাঁর অবস্থান তৈরি করে নিতে পারবে এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

     

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ এপ্রিল ২০১৬/শাহনেওয়াজ